মাজমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নটি এখন আর কেবল আপত্তিকর বক্তব্য সরানো, ভুয়ো খবর আটকানো কিংবা শিশুদের ব্যবহারের বয়স বেঁধে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কারণ, সমস্যার শিকড় প্রযুক্তির চেয়ে অনেক গভীরে। সমাজমাধ্যম মানুষের মনোযোগ, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক আস্থা, রাজনৈতিক ভাষা এবং সত্য-মিথ্যা বিচারের ক্ষমতাকে যেভাবে বদলে দিচ্ছে, তার মোকাবিলায় শুধু আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি।

সমাজমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলি এমন এক ব্যবসায়িক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে, যেখানে ব্যবহারকারীর মনোযোগই প্রধান পণ্য। মানুষ যত বেশি সময় পর্দায় কাটাবে, যত বেশি প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং যত ঘন ঘন ফিরে আসবে, প্রতিষ্ঠানের আয় তত বাড়বে। তাই তাদের গণনাপদ্ধতি সাধারণত শান্ত, যুক্তিপূর্ণ কিংবা ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্যের বদলে ভয়, রাগ, বিদ্বেষ এবং চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী বিষয়কে সামনে আনে। সমাজে আগে থেকেই থাকা বিভাজন এর ফলে আরও প্রকট হয়।

আইন করে ক্ষতিকর বিষয় সরানো সম্ভব। কোনও প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে, অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে বা শিশুদের তথ্য সংগ্রহ না করতে বাধ্য করাও যায়। কিন্তু আইন মানুষের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষাকে বদলাতে পারে না। কেন মানুষ যাচাই না করেই কোনও খবর ছড়িয়ে দেয়, কেন অপমানকে রসিকতা বলে গ্রহণ করে, কেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর দণ্ডবিধিতে নেই।

সমাজমাধ্যমের সংকট তাই মূলত মানুষের আত্মসংযম, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক আচরণের সংকট। প্রযুক্তি সেই দুর্বলতাগুলিকে সৃষ্টি করেনি; সেগুলিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার বাসনা, নিজের মতের সমর্থন খোঁজার প্রবণতা এবং অন্যের দুর্দশা দেখেও উদাসীন থাকার অভ্যাসকে বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত করেছে সমাজমাধ্যম।

ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশে এর বিপদ আরও বেশি। এখানে ভাষা, ধর্ম, জাতপাত, অঞ্চল এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বহু স্তর রয়েছে। একটি বিকৃত ছবি, পুরনো দৃশ্যের সঙ্গে নতুন বর্ণনা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উত্তেজনা ছড়াতে পারে। বহু ভারতীয় ভাষায় যথেষ্ট সংখ্যক বিষয়-পরীক্ষক না থাকায় ক্ষতিকর প্রচার ইংরেজির তুলনায় অনেক বেশি সময় দৃশ্যমান থেকে যায়। ফলে নিয়ন্ত্রণের কাঠামোকেও ভাষাগত ও সামাজিক বৈচিত্র্যের কথা মাথায় রাখতে হবে।

তবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণেরও বিপদ রয়েছে। ‘ক্ষতিকর’, ‘আপত্তিকর’ বা ‘মিথ্যা’ বক্তব্যের সংজ্ঞা যদি অস্পষ্ট হয়, তবে সরকার তা সমালোচনা দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। রাষ্ট্রকে নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু সত্য নির্ধারণের একমাত্র অধিকার রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন স্বাধীন নজরদারি, বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং ব্যবহারকারীর আপিলের কার্যকর ব্যবস্থা।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও জরুরি। শুধু বয়স যাচাই বা অভিভাবকের সম্মতিকে যথেষ্ট মনে করলে ভুল হবে। পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজকেও বুঝতে হবে যে নিরন্তর তুলনা, বাহ্যিক স্বীকৃতির প্রত্যাশা ও ক্ষণস্থায়ী আনন্দের অভ্যাস একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে কী প্রভাব ফেলে। বিদ্যালয়ে গণিত বা ভাষার মতোই তথ্য যাচাই, মত ও তথ্যের পার্থক্য, গোপনীয়তা এবং সংযত প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা প্রয়োজন।

পরিবারের ভূমিকাও নিষেধাজ্ঞা জারিতে শেষ হয় না। বাবা-মা নিজেরাই যদি সারাক্ষণ মুঠোফোনে ডুবে থাকেন, তবে শিশুকে সংযম শেখানো সম্ভব নয়। একসঙ্গে খাওয়া, মুখোমুখি কথোপকথন, খেলাধুলা, বই পড়া এবং সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের মতো অভ্যাসকে ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়, প্রযুক্তির উপর মানুষের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

একই সঙ্গে সমাজমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের নকশার দায় নিতে হবে। অসীমভাবে বিষয় দেখানোর ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরের দৃশ্য চালু হওয়া, ঘন ঘন সতর্কবার্তা এবং জনপ্রিয়তার প্রকাশ্য সংখ্যার মতো কৌশল ব্যবহারকারীকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখে। এগুলিকে নিছক নিরপেক্ষ প্রযুক্তিগত সুবিধা বলা চলে না। মুনাফার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও নকশার মাপকাঠি করতে হবে।

ভারতীয় সভ্যতার বিভিন্ন ধারায় আত্মসংযম, সংলাপ, ভিন্নমতের সহাবস্থান এবং বাক্‌সংযমের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার অর্থ অতীতে ফিরে যাওয়া নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে মানবিক উদ্দেশ্যের অধীন করা। স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়, নিজের কথার সামাজিক পরিণতির দায়িত্ব নেওয়াও স্বাধীনতার অংশ।

অতএব, সমাজমাধ্যমের সংকটের কোনও একক আইনি সমাধান নেই। আইন, প্রযুক্তিগত দায়বদ্ধতা, শিক্ষা, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক নৈতিকতা—সব ক’টিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আমরা কী ধরনের প্রযুক্তি চাই, তা নয়; প্রশ্নটি হল, প্রযুক্তির যুগে আমরা কী ধরনের মানুষ ও সমাজ হয়ে উঠতে চাই। সমাজমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে সেই সভ্যতাগত নির্বাচনের মধ্য দিয়েই।