ওবিসি রায় কার্যকর করতে প্রস্তুত ছিল কেন্দ্র, তবু সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ কেন?

যা জানা জরুরি
- অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ‘সচ্ছল স্তর’ নির্ধারণে বাবা-মায়ের আয়ই একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না—গত ১১ মার্চ এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এ কথা জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।
- কেন্দ্রীয় লোকসেবা কমিশনের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার এক প্রার্থীর আবেদনের শুনানিতে এই রায় দেওয়া হয়।
- কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমে রায়টি কার্যকর করার প্রস্তুতিও নিয়েছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ‘সচ্ছল স্তর’ নির্ধারণে বাবা-মায়ের আয়ই একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না—গত ১১ মার্চ এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এ কথা জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রীয় লোকসেবা কমিশনের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার এক প্রার্থীর আবেদনের শুনানিতে এই রায় দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমে রায়টি কার্যকর করার প্রস্তুতিও নিয়েছিল। কিন্তু এখন ২০২৫ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার শতাধিক অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত প্রার্থীর দাবি নিষ্পত্তির প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ব্যাখ্যা ও নির্দেশ চেয়েছে কেন্দ্র।
কেন্দ্রের বক্তব্য, ২০২৫ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পাঁচ দিন পরে ১১ মার্চের রায়টি দেওয়া হয়েছিল। ফলে ইতিমধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এই রায় পূর্ববর্তী সময় থেকে প্রয়োগ করা হলে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সরকারের আশঙ্কা, শ্রেণিভিত্তিক মেধাতালিকা এবং বিভিন্ন পরিষেবায় প্রার্থীদের বণ্টন চূড়ান্ত করতে দেরি হলে তার ধারাবাহিক প্রভাব পড়বে প্রশিক্ষণসূচি, প্রশিক্ষণার্থী দলের সদস্যসংখ্যা, পরিকাঠামোগত ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বর্ষপঞ্জিতে। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা ও ভারতীয় পুলিশ পরিষেবায় রাজ্য-ক্যাডার বণ্টন, নতুন আধিকারিকদের জ্যেষ্ঠতা এবং বেতন নির্ধারণও প্রভাবিত হতে পারে।
কেন্দ্র তার আবেদনে বলেছে, ১১ মার্চের রায়ের মূল নীতি যদি যান্ত্রিকভাবে অথবা কোনও শর্ত ছাড়াই ২০২৫ সালের ইতিমধ্যেই সম্পন্ন নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সময় থেকে প্রয়োগ করা হয়, তা হলে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যেই এক অস্বাভাবিক বৈষম্য তৈরি হতে পারে। যে পরীক্ষাচক্রের কিছু প্রার্থীকে রায়ের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তার মধ্যেই অন্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হতে পারেন।
কেন্দ্রের দাবি, তাদের আবেদনটি শুধুমাত্র ২০২৫ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাকে ঘিরে। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার আগেই এই পরীক্ষার নির্বাচনপ্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং বর্তমানে তা বিভিন্ন পরিষেবায় প্রার্থী বণ্টনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতরের আবেদনে পরবর্তী পরীক্ষাগুলির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রায় কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্র এই পদক্ষেপ করেছে। একই সময়ে দেশের কয়েকটি জায়গায় সংরক্ষণবিরোধী আন্দোলনও চলছে। ফলে বিষয়টির প্রশাসনিক তাৎপর্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়
এই মামলার সূত্রপাত কেন্দ্রীয় কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতরের ২০০৪ সালের ১৪ অক্টোবরের একটি চিঠি থেকে। ওই চিঠিতে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জারি করা একটি সরকারি নির্দেশিকার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৩ সালের নির্দেশিকায় অনগ্রসর শ্রেণির সচ্ছল স্তর নির্ধারণের সময় বেতন এবং কৃষি থেকে পাওয়া আয়কে আয় ও সম্পত্তির পরীক্ষার বাইরে রাখা হয়েছিল।
কিন্তু ২০০৪ সালের ব্যাখ্যায় বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতনও সচ্ছল স্তর নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হবে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থা সরকারি কর্মচারীদের সন্তান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের সন্তানদের মধ্যে অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক বিভাজন তৈরি করেছে।
২০০৪ সালের এই ব্যাখ্যা প্রথম দিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এর কঠোর প্রয়োগ দেখা যায়নি। সেই সময়ে ক্ষমতায় থাকা সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট সরকার অনগ্রসর শ্রেণির রাজনৈতিক সমর্থন সুসংহত করার চেষ্টা করছিল। পরে ২০১৫ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা—অর্থাৎ ২০১৬ সালের আধিকারিকদের দল—থেকে নিয়মটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা শুরু হয়।
তার পর থেকে প্রায় ১০০ জন প্রার্থী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া বৈধ জাতিগত শংসাপত্র থাকা এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সচ্ছল স্তরের যুক্তিতে কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতরের কাছে অনগ্রসর শ্রেণির স্বীকৃতি পাননি। তাঁদের অধিকাংশই বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট অথবা বিভিন্ন হাই কোর্টে চলা মামলার পক্ষ।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই প্রার্থীদের কয়েকজন কেন্দ্রীয় লোকসেবা কমিশন অথবা রাজ্যের নিয়োগ সংস্থার পরিচালিত অন্য পরীক্ষায় অনগ্রসর শ্রেণির সুবিধা পেয়েছেন। অথচ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় তাঁদের সেই দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট কী বলেছিল
চলতি বছরের ১১ মার্চ রোহিত নাথন নামে এক প্রার্থীর আবেদন শুনেছিল বিচারপতি পি এস নরসিমহা এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ। আদালত জানায়, অনগ্রসর শ্রেণির সচ্ছল স্তর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বাবা-মায়ের আয়কে ভিত্তি করা যাবে না।
আদালতের বক্তব্য ছিল, সচ্ছল স্তরকে সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য একই সামাজিক শ্রেণির সমপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা নয়। একই অবস্থানে থাকা অনগ্রসর শ্রেণির প্রার্থীদের সঙ্গে অসম আচরণ শুধু আইনগতভাবে ভুল নয়, সংবিধানের দৃষ্টিতেও তা অনুমোদনযোগ্য নয়।
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সন্তানের ক্ষেত্রে শুধু বেতনের পরিমাণ দেখে সংরক্ষণের সুবিধা অস্বীকার করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মী প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় না চতুর্থ শ্রেণির সমতুল পদে রয়েছেন, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। পদমর্যাদা বিবেচনা না করে কেবল বেতনের ভিত্তিতে তাঁদের সন্তানদের বাদ দেওয়া হলে সমপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে। তার ফলে সমান অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের অসমভাবে দেখা হবে, যা সংবিধানের ১৪, ১৫ এবং ১৬ অনুচ্ছেদের সাম্যের নীতির পরিপন্থী।
এই রায় কার্যকর করার জন্য কেন্দ্রকে ছয় মাস সময় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই সময়সীমা আগামী ১১ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
কার্যকর করার প্রস্তুতি নিয়েও পিছিয়ে গেল কেন্দ্র
কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, সরকার সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত সমস্ত প্রার্থীর নথি যাচাইয়ের কাজও ইতিমধ্যে শেষ করা হয়েছিল।
১১ মার্চের রায় সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হলে শুধু ভবিষ্যতের পরীক্ষার্থীরাই উপকৃত হবেন না; আগের পরীক্ষাগুলিতে যাঁদের অনগ্রসর শ্রেণির দাবি খারিজ হয়েছিল, তাঁরাও সুবিধা পেতে পারেন। এর ফলে কয়েকজন প্রার্থীর মেধাক্রম সংশোধন করতে হতে পারে। সেই পরিবর্তনের প্রভাব পরিষেবা বণ্টন, জ্যেষ্ঠতা এবং নিয়োগের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
এই কারণেই কেন্দ্র এখন সুপ্রিম কোর্টের কাছে রায়ের প্রয়োগের সীমা স্পষ্ট করার আবেদন জানিয়েছে। সরকারের আর্জি, রায়টি যেন পূর্ববর্তী সময় থেকে এমনভাবে প্রয়োগ করা না হয়, যার ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে সম্পন্ন ভর্তি, শেষ হয়ে যাওয়া শিক্ষাবর্ষ, প্রদান করা ডিগ্রি কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠিত অধিকার নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
অর্থাৎ, কেন্দ্র মূল রায়ের বিরোধিতা করছে না বলেই দাবি করেছে। তাদের আপত্তি মূলত ২০২৫ সালের প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া সিভিল সার্ভিস নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রায়টির পূর্ববর্তী সময় থেকে প্রয়োগ নিয়ে। এখন সুপ্রিম কোর্টকেই ঠিক করতে হবে—সাম্যের সাংবিধানিক নীতি বজায় রেখে পুরনো ও চলতি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এই রায় কত দূর পর্যন্ত কার্যকর হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



