শ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার পরে ভোটার তালিকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিপুল সংখ্যক আপিলের চরিত্র দেখে বিস্ময় প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যের এসআইআর আপিল ট্রাইব্যুনালগুলিতে জমা পড়া প্রায় ৩৮ লক্ষ আপিলের মধ্যে ৩১ লক্ষই ভোটার তালিকায় কোনও ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করে দায়ের হয়েছে। অর্থাৎ, মোট আপিলের প্রায় ৮০ শতাংশের উদ্দেশ্য ভোটাধিকার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া। অন্যদিকে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা নিজেদের নাম ফেরানোর জন্য আপিল করেছেন মাত্র সাত লক্ষ।

মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চের সামনে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন। সাংসদ ইশা খান চৌধুরীর তথ্যের অধিকার আইনে করা আবেদনের জবাবে পাওয়া নথির ভিত্তিতে তিনি আদালতকে এই তথ্য জানান।

তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনেরই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই পরিসংখ্যান সর্বোচ্চ আদালতের কাছে পেশ করা উচিত ছিল। অথচ একজন সাংসদের তথ্যের অধিকার আইনে করা আবেদনের ফলে তা প্রকাশ্যে এসেছে। পরিস্থিতিকে “স্তম্ভিত হওয়ার মতো” বলে বর্ণনা করেন শঙ্করনারায়ণন।

বাদ পড়া ভোটারদের অধিকাংশই ফিরে পেয়েছেন নাম

শুনানিতে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে করা আপিলগুলির মধ্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮৩ হাজারটির নিষ্পত্তি হয়েছে। তার মধ্যে ৭৫ হাজার ৪৪৩টি আপিল মঞ্জুর হয়েছে এবং আবেদনকারীদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, নিষ্পত্তি হওয়া আপিলের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া যথাযথ ছিল না। শঙ্করনারায়ণনের দাবি, কোনও কোনও ক্ষেত্রে পুনর্ভুক্তির হার ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি।

এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হলে অন্তত ৭৫ হাজার ৪৪৩ জন নাগরিক ভোটাধিকার হারাতেন। জলপাইগুড়ির উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সেখানে আপিলের নিষ্পত্তির পরে ৬৬৫ জনের নাম ভোটার তালিকায় ফিরেছে; বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল থাকেনি একটির ক্ষেত্রেও।

বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও তথ্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, আপিলের অত্যন্ত বড় অংশ ভোটার তালিকায় ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের নামের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। শঙ্করনারায়ণন পাল্টা বলেন, যে নির্বাচন কমিশনের উপর আস্থা রাখতে বলা হচ্ছে, সেই কমিশনের কাছ থেকে এই তথ্য আদালত পায়নি—এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের।

বাদ পড়া সাত লক্ষ মানুষের আপিল আগে শোনার প্রস্তাব

শঙ্করনারায়ণনের যুক্তি, এসআইআর আপিল ট্রাইব্যুনালগুলি গঠন করা হয়েছিল মূলত ভোটার তালিকা থেকে অন্যায়ভাবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের দ্রুত প্রতিকার দেওয়ার জন্য। কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে দায়ের হওয়া ৩১ লক্ষ আপিলের চাপে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

তাই সাত লক্ষ বাদ পড়া ভোটারের আপিলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আবেদন জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা কোনও ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করছেন, তাঁদের সামনে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের অধীনে অন্য আইনি পথ খোলা রয়েছে। তাঁরা সেই ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের আপিলের জন্য বাদ পড়া নাগরিকদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের আবেদন অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা যায় না।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে কলকাতা ও হাওড়া পুরসভার নির্বাচন হওয়ার কথা উল্লেখ করে এই দুই এলাকার আপিলগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির প্রস্তাবও দেন শঙ্করনারায়ণন। কারণ, নির্বাচনের আগে আপিলের নিষ্পত্তি না হলে বৈধ ভোটারদের একটি অংশ ভোট দেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন।

নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত হলফনামা চাইল আদালত

বেঞ্চ জানিয়েছে, অন্য একটি মামলাতেও আপিল নিষ্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে শঙ্করনারায়ণনের বক্তব্য, বাদ পড়া ব্যক্তিদের আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে নতুন ট্রাইব্যুনাল তৈরির প্রয়োজন নাও হতে পারে।

শুনানির পরে নির্বাচন কমিশনকে বিস্তারিত হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালত মূলত চারটি বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য চেয়েছে—

১. ট্রাইব্যুনালগুলিতে বর্তমানে মোট কত আপিল বিচারাধীন রয়েছে।

২. তার মধ্যে কতগুলি আপিল ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের দায়ের করা এবং কতগুলি অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে কমিশন বা অন্য আপত্তিকারীদের দায়ের করা।

৩. এখনও পর্যন্ত কতগুলি আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং সেই আপিলগুলিতে কী ধরনের প্রতিকার চাওয়া হয়েছিল।

৪. কতগুলি আপিল মঞ্জুর হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি, অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন কি না এবং আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দ্রুত ও সুশৃঙ্খল করার জন্য কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনকে তা-ও জানাতে হবে। কমিশনের হয়ে প্রবীণ আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু জানান, সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠক হয়েছে। আদালতের চাওয়া সমস্ত তথ্য দেওয়া হবে। সাংসদকে পাঠানো তথ্যের অধিকার আইনের জবাব সম্পর্কেও কমিশনের বক্তব্য জানানো হবে।

বিচারপতি বাগচী বলেন, হলফনামায় পাওয়া শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে আদালত আপিলের অগ্রাধিকার নির্ধারণের নির্দেশ দিতে পারে। কারণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে কোনও নাগরিকের অধিকার সরাসরি এবং তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়।