অঙ্গদানে এবার ‘ডিজিটাল বিপ্লব’

যা জানা জরুরি
- জাতীয় অপেক্ষমাণ তালিকা ও আধার-সংযুক্ত পোর্টাল—অঙ্গ বণ্টনে স্বচ্ছতা, গতি ও সমন্বয়ের নতুন উদ্যোগ একটি অঙ্গের জন্য অপেক্ষা কখনও কখনও জীবন-মৃত্যুর অপেক্ষা।
- কিডনি, লিভার কিংবা হৃদ্পিণ্ড—প্রতিস্থাপনের তালিকায় থাকা রোগীর কাছে প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ।
- কিন্তু এতদিন ভারতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থায় ছিল বিচ্ছিন্নতা, তথ্যের ঘাটতি এবং সমন্বয়ের সমস্যা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
জাতীয় অপেক্ষমাণ তালিকা ও আধার-সংযুক্ত পোর্টাল—অঙ্গ বণ্টনে স্বচ্ছতা, গতি ও সমন্বয়ের নতুন উদ্যোগ
একটি অঙ্গের জন্য অপেক্ষা কখনও কখনও জীবন-মৃত্যুর অপেক্ষা। কিডনি, লিভার কিংবা হৃদ্পিণ্ড—প্রতিস্থাপনের তালিকায় থাকা রোগীর কাছে প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এতদিন ভারতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থায় ছিল বিচ্ছিন্নতা, তথ্যের ঘাটতি এবং সমন্বয়ের সমস্যা। কোন রোগী কতদিন ধরে অপেক্ষা করছেন, কোথায় কোন অঙ্গ পাওয়া গেল, কোথায় সবচেয়ে জরুরি রোগী রয়েছেন—সব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যেত না।
এবার সেই ছবিটাই বদলানোর উদ্যোগ।
দেশে চালু হয়েছে নতুন রিয়েল-টাইম জাতীয় ডিজিটাল অঙ্গ প্রতিস্থাপন পোর্টাল, যেখানে এক ছাতার নিচে থাকবে অপেক্ষমাণ রোগীদের তথ্য, অঙ্গদাতাদের নিবন্ধন এবং প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ডেটা।
লক্ষ্য একটাই—অঙ্গ পাওয়ার পর যেন সময় নষ্ট না হয়, উপযুক্ত রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ে।
এবার এক তালিকায় দেশ
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি রোগীকে সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত হাসপাতালে নিবন্ধন করতে হবে। তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য, রোগের অবস্থা, রক্তের গ্রুপ, হাসপাতালের বিবরণ এবং কতদিন ধরে অপেক্ষা করছেন—সব তথ্য জাতীয় ডেটাবেসে যুক্ত হবে।
ফলে কোথাও একটি অঙ্গ পাওয়া গেলে সম্ভাব্য গ্রহীতাদের মধ্যে উপযুক্ত রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এতদিন বিভিন্ন রাজ্য ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অপেক্ষমাণ তালিকা থাকলেও একটি সমন্বিত জাতীয় তালিকার অভাব ছিল। তার ফলে একটি রাজ্যে অঙ্গ পাওয়া গেলেও অন্য রাজ্যে থাকা গুরুতর রোগী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
জাতীয় পোর্টাল সেই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে আন্তঃরাজ্য সমন্বয় আরও সহজ করার লক্ষ্যেই তৈরি।
আধারেই অঙ্গদানের অঙ্গীকার
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল আধার-সংযুক্ত অঙ্গদানের প্রতিশ্রুতি।
যাঁরা মৃত্যুর পর অঙ্গদান করতে চান, তাঁরা অনলাইনে নিজেদের ইচ্ছা নথিভুক্ত করতে পারবেন। আধারের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই হওয়ায় ভুয়ো পরিচয়ে নিবন্ধনের ঝুঁকিও কমবে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই ডিজিটাল pledge বা প্রতিশ্রুতি অঙ্গদানের ইচ্ছার নথি, নিজে থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অনুমতি নয়। মৃত্যুর পর অঙ্গদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, পরিবারের ভূমিকা এবং চিকিৎসাগত মূল্যায়নের প্রক্রিয়া বজায় থাকবে।
অর্থাৎ, প্রযুক্তি প্রক্রিয়াটিকে সহজ করবে, কিন্তু আইনি ও চিকিৎসাগত নিয়মকে সরিয়ে দেবে না।
অঙ্গ মিললেই দ্রুত রোগী
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে গতি।
একটি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত গ্রহীতা খুঁজে পেতে দেরি হলে মূল্যবান অঙ্গ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জাতীয় লাইভ ডেটাবেস থাকলে অঙ্গের ধরন, রক্তের গ্রুপ, রোগীর চিকিৎসাগত অবস্থা এবং অপেক্ষার সময়ের মতো তথ্য একসঙ্গে দেখা সম্ভব হবে। ফলে উপযুক্ত গ্রহীতা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া দ্রুত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও রাজ্যে উপযুক্ত গ্রহীতা না থাকলে অন্য রাজ্যে থাকা রোগীর সন্ধানও দ্রুত করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, এক রাজ্যে অঙ্গ, অন্য রাজ্যে রোগী—দু’জনকে মিলিয়ে দেওয়ার পথ আরও ছোট হতে পারে।
স্বচ্ছতায় নজরদারি
অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে অতীতে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কার আগে অঙ্গ পাওয়ার কথা, কীভাবে রোগী বাছাই হচ্ছে, অপেক্ষার তালিকায় কার অবস্থান কোথায়—এসব নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় রোগীর নিবন্ধনের সময়, অপেক্ষার সময়, চিকিৎসাগত তথ্য এবং প্রতিস্থাপনের অগ্রগতি নথিভুক্ত থাকবে।
ফলে অঙ্গ বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়তে পারে। কোনও রোগীর অবস্থা বদলালে, প্রতিস্থাপন হয়ে গেলে কিংবা তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে সেই তথ্যও আপডেট করা যাবে।
এর ফলে অপেক্ষমাণ তালিকা শুধু একটি স্থির তালিকা থাকবে না—এটি হয়ে উঠবে সারাক্ষণের বদলে যাওয়া লাইভ ডেটাবেস।
হাসপাতালগুলির দায়িত্বও বাড়ছে
এই ব্যবস্থার সাফল্য অবশ্য শুধু পোর্টালের ওপর নির্ভর করবে না। হাসপাতালগুলিকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
অনুমোদিত প্রতিস্থাপন কেন্দ্রগুলিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রোগীর তথ্য আপলোড করতে হবে এবং নিয়মিত তা হালনাগাদ রাখতে হবে। রোগীর শারীরিক অবস্থা বদলালে বা প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হলে সেই তথ্যও দ্রুত পোর্টালে যুক্ত করতে হবে।
অর্থাৎ, ডেটাবেস যত বেশি নির্ভুল ও আপডেট থাকবে, অঙ্গ বরাদ্দের ব্যবস্থাও তত বেশি কার্যকর হবে।
জীবন বাঁচাতে পারে আন্তঃরাজ্য সমন্বয়
ভারতে অঙ্গদানের বড় সমস্যা শুধু অঙ্গের ঘাটতি নয়, অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত রোগীর কাছে অঙ্গ পৌঁছে দেওয়াও।
নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে আন্তঃরাজ্য অঙ্গ বিনিময় আরও দ্রুত হতে পারে। একটি রাজ্যে উপযুক্ত গ্রহীতা না থাকলে অন্য রাজ্যের অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে দ্রুত রোগী খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।
এর ফলে অঙ্গ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং একটি দানের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে।
অঙ্গদানে এখনও বড় ঘাটতি
প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, অঙ্গদাতাই যদি না বাড়েন, তাহলে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না।
ভারতে মৃতদেহ থেকে অঙ্গদানের হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম। সচেতনতার অভাব, সামাজিক ও পারিবারিক দ্বিধা এবং অঙ্গদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা—সবই এর পিছনে ভূমিকা রাখে।
অনলাইনে সহজে অঙ্গদানের ইচ্ছা নথিভুক্ত করার সুযোগ আরও বেশি মানুষকে এই সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তির সামনে বড় পরীক্ষা
তবে নতুন পোর্টাল চালু হলেই সব সমস্যা মিটে যাবে না।
প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে তথ্যের নিরাপত্তা। রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, দেশের সমস্ত অনুমোদিত হাসপাতালকে একইভাবে এবং নিয়মিত তথ্য আপডেট করতে হবে।
তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা, রাজ্য সরকার, হাসপাতাল, চিকিৎসক এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে প্রযুক্তির সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
প্রযুক্তি থেকে জীবনের দিকে
জাতীয় অপেক্ষমাণ তালিকা, আধার-সংযুক্ত অঙ্গদানের প্রতিশ্রুতি এবং রিয়েল-টাইম ডিজিটাল নজরদারি—তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে ভারতের অঙ্গ প্রতিস্থাপন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
ডেটা যদি সঠিক থাকে, হাসপাতালগুলি যদি সময়মতো তথ্য আপডেট করে, অঙ্গ বরাদ্দ যদি স্বচ্ছ হয় এবং আন্তঃরাজ্য সমন্বয় যদি দ্রুত হয়, তাহলে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা শুধু প্রশাসনিক সংস্কার হয়ে থাকবে না।
হয়তো কোনও অপেক্ষমাণ রোগীর কাছে এটি হয়ে উঠবে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে পাওয়া কয়েকটি অতিরিক্ত মূল্যবান ঘণ্টা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



