ছাত্র মামলায় স্বস্তি, খুলল এফআইআর প্রত্যাহারের দরজা

যা জানা জরুরি
- ‘গুরুতর অপরাধ’ না থাকলে মামলা বন্ধ করতে পারবে রাজ্য, স্পষ্ট করল সুপ্রিম কোর্ট ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় বড়সড় স্বস্তির…
- যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর বা জঘন্য অপরাধের অভিযোগ নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে আইন মেনে এফআইআর প্রত্যাহার বা মামলা বন্ধ করার পথে রাজ্য সরকারগুলি এগোতে পারবে।
- শীর্ষ আদালতের এই অবস্থান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার ভবিষ্যতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
‘গুরুতর অপরাধ’ না থাকলে মামলা বন্ধ করতে পারবে রাজ্য, স্পষ্ট করল সুপ্রিম কোর্ট
ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় বড়সড় স্বস্তির বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট। যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর বা জঘন্য অপরাধের অভিযোগ নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে আইন মেনে এফআইআর প্রত্যাহার বা মামলা বন্ধ করার পথে রাজ্য সরকারগুলি এগোতে পারবে। শীর্ষ আদালতের এই অবস্থান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার ভবিষ্যতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনের বেঞ্চ আগের অন্তর্বর্তী নির্দেশের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে, রাজ্যগুলিকে এফআইআর প্রত্যাহার বা তদন্ত বন্ধ করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা আদালতের উদ্দেশ্য ছিল না।
অর্থাৎ, কোনও মামলা প্রত্যাহারের যথেষ্ট আইনি কারণ রয়েছে বলে রাজ্য সরকার মনে করলে, আইন মেনেই সেই পথে এগোনো যাবে।
কোথায় তৈরি হয়েছিল বিভ্রান্তি?
এর আগে আদালত জানিয়েছিল, রাজ্যগুলি তদন্ত চালিয়ে যেতে পারবে। সেই নির্দেশের ব্যাখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছিল ধোঁয়াশা।
আন্দোলনকারীদের পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে জানান, কিছু রাজ্য এই নির্দেশ এমনভাবে ব্যাখ্যা করছে, যাতে মামলা প্রত্যাহারের পথ কার্যত কঠিন হয়ে পড়ছে। সেই কারণেই আদালতের কাছে স্পষ্টীকরণ চাওয়া হয়।
শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, আগের নির্দেশের উদ্দেশ্য ছিল না রাজ্যগুলির আইনি ক্ষমতা খর্ব করা।
‘ক্রিমিনাল অ্যান্টিসিডেন্ট’ মানে কী?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে শীর্ষ আদালত।
আগের নির্দেশে বলা হয়েছিল, যাঁদের কোনও ‘ক্রিমিনাল অ্যান্টিসিডেন্ট’ নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। এবার আদালত জানিয়েছে, এখানে ‘ক্রিমিনাল অ্যান্টিসিডেন্ট’ বলতে সাধারণ বা ছোটখাটো অপরাধ নয়, গুরুতর ও জঘন্য অপরাধের ইতিহাস বোঝানো হয়েছে।
ফলে ছোটখাটো অভিযোগ বা পুরনো কোনও সামান্য মামলাকে দেখিয়ে কোনও ছাত্রকে কঠোর আইনি পদক্ষেপের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়—আদালতের ব্যাখ্যায় সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
ছাত্রদের জন্য বড় স্বস্তি
আন্দোলনের পর বিভিন্ন রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ ছিল সরকারি কাজে বাধা, অবৈধ জমায়েত বা আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো ধারায়।
আদালতের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যার ফলে এই ধরনের অভিযোগকে সরাসরি খুন, সন্ত্রাস বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অর্থাৎ, আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং গুরুতর অপরাধে যুক্ত থাকার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখার বার্তা দিয়েছে আদালত।
নাবালকদের ক্ষেত্রেও নরম অবস্থান
ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত মামলায় নাবালকদের বিষয়েও সুপ্রিম কোর্ট আগে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছিল। তদন্ত চললেও তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
একই সঙ্গে আন্দোলন-সংক্রান্ত সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ, ড্রোন ভিডিও, বডি-ক্যামেরা রেকর্ডিং, ওয়্যারলেস লগ এবং পিসিআর রেকর্ড সংরক্ষণের নির্দেশও বহাল রয়েছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রমাণের ঘাটতি বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমবে।
‘সংসদ চলো’ নিয়েও নতুন আবেদন
এরই মধ্যে একই বিষয় ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে নতুন আবেদনও জমা পড়েছে।
সেখানে ২০ জুলাইয়ের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির আয়োজকদের বিরুদ্ধে হিংসা উসকে দেওয়ার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে সামাজিক মাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট করা নাবালকদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা না করে সমাজসেবামূলক কাজের মতো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
আন্দোলন-পরবর্তী এফআইআর ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সারা দেশে একটি অভিন্ন নীতি তৈরির দাবিও জানানো হয়েছে।
এনআইএ-র মামলা আলাদা
অন্যদিকে, জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএ সন্ত্রাসে অর্থ জোগানের একটি মামলায় মানবাধিকার কর্মী খুররম পারভেজ এবং এক আইপিএস আধিকারিক-সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
তবে এই মামলার সঙ্গে ছাত্র বিক্ষোভ সংক্রান্ত মামলাগুলির সরাসরি কোনও যোগ নেই।
প্রতিবাদ বনাম গুরুতর অপরাধ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের অবস্থানে দুটি বিষয় পাশাপাশি উঠে এসেছে।
প্রথমত, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে অযথা ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিবাদের আড়ালে যদি খুন, সন্ত্রাস, বিস্ফোরণ বা অন্য কোনও গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই মামলায় আইন নিজের গতিতেই চলবে। সেখানে কোনও সাধারণ ছাড়ের প্রশ্ন নেই।
অর্থাৎ, আদালতের অবস্থান ‘সব মামলা তুলে নাও’ নয়। বরং কোন অভিযোগ গুরুতর, আর কোনটি আন্দোলনে অংশগ্রহণ বা সামান্য আইনভঙ্গের মধ্যে পড়ে—প্রতিটি মামলাকে আলাদা করে দেখার বার্তা।
এবার রাজ্যগুলির পালা
সুপ্রিম কোর্টের এই ব্যাখ্যার পর বিভিন্ন রাজ্যকে এখন ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত মামলাগুলি পৃথকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
যেখানে অভিযোগ সীমাবদ্ধ আন্দোলনে অংশ নেওয়া, অবৈধ জমায়েত বা সামান্য আইনভঙ্গের মধ্যে, সেখানে আইন মেনে এফআইআর প্রত্যাহার বা মামলা বন্ধ করার পথ রয়েছে।
কিন্তু গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া যথারীতি চলবে।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের বার্তাটি স্পষ্ট—প্রতিবাদের অধিকারকে অপরাধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না, আবার গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রতিবাদের আড়ালেও আইনের হাত থামবে না।
নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার এবং আইনের শাসনের মধ্যে সেই ভারসাম্যই এবার আরও একবার সামনে এনে দিল শীর্ষ আদালতের এই ব্যাখ্যা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



