জাতীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা বা এনটিএ-র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়া বহুস্তরীয়। প্রথমে বিপুল প্রশ্নভান্ডার তৈরি, তার পরে যাচাই, অনুবাদ, পুনরানুবাদ, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রশ্ন নির্বাচন এবং শেষ পর্যন্ত একাধিক সেট ছাপিয়ে সিলবন্দি করে রাখা—গোটা ব্যবস্থাটিই এমন ভাবে সাজানো, যাতে কোনও এক ব্যক্তি চূড়ান্ত প্রশ্নপত্রের সম্পূর্ণ চেহারা জানতে না পারেন। কিন্তু ইউজিসি-নেটের ইংরেজি, বাণিজ্য ও সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষায় অসংখ্য ভুল ধরা পড়ার পরে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জুনের ২২ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে ওই তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা হয়েছিল। অভিযোগ যাচাই করে এনটিএ স্বীকার করে, প্রশ্নপত্রের ত্রুটি এতটাই ব্যাপক যে আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়া শেষে কয়েকটি প্রশ্ন বাদ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ন্যায্য ও ত্রুটিমুক্ত পরীক্ষার যে মান রক্ষা করা প্রয়োজন, প্রশ্নপত্রগুলি সেই মানেও পৌঁছয়নি। তাই তিনটি পরীক্ষা নতুন করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইংরেজি ও বাণিজ্যের পুনঃপরীক্ষা হবে ৯ সেপ্টেম্বর—সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ইংরেজি এবং বিকেল ৩টে থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাণিজ্য।

প্রশ্নপত্র তৈরির প্রথম ধাপটির নাম ‘আইটেম রাইটিং’। নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়-বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প্রশ্ন এবং তার সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করানো হয়। তাঁরা যে প্রশ্নগুলি লিখছেন, সেগুলির কোনওটি শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত হবে কি না, তা তাঁদের জানানো হয় না। গত ৪ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, একটি পরীক্ষার জন্য যত প্রশ্ন প্রয়োজন, প্রশ্নভান্ডারে রাখা হয় তার অন্তত পাঁচ গুণ প্রশ্ন।

এর পরে প্রশ্ন যায় অন্য একদল বিশেষজ্ঞের কাছে। তাঁরা প্রশ্নগুলির মান নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধনের দায়িত্বে থাকেন। পাঠ্যক্রমের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে কি না, উত্তর সঠিক কি না এবং বিভিন্ন সেটের কঠিনতার মাত্রা মোটামুটি সমান কি না—সবই তাঁরা পরীক্ষা করেন। ওই প্রশ্নভান্ডার থেকে একাধিক সম্ভাব্য সেটের জন্য প্রশ্ন বাছাই করা হয়। গোটা ব্যবস্থার মূল নীতি হল, একজনের হাতে যেন কখনও সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র না থাকে।

পরবর্তী ধাপ স্বাধীন যাচাই। যাচাইকারীরা নির্বাচিত প্রশ্নগুলি নিজেরা সমাধান করেন। তাঁদের উত্তর মডারেটরদের নির্ধারিত উত্তরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। কোনও অমিল ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার অধিকর্তা মডারেটর ও যাচাইকারীদের বৈঠক ডেকে বিষয়টির নিষ্পত্তি করেন। আদর্শ ব্যবস্থায় প্রশ্ন লেখা, সংশোধন এবং স্বাধীন যাচাইয়ের প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা বিশেষজ্ঞ থাকার কথা। একাধিক প্রশ্নপত্রের সেটও সম্পূর্ণ পৃথক ভাবে তৈরি করা হয়; প্রশ্ন বা বিশেষজ্ঞ—কোনও ক্ষেত্রেই পারস্পরিক মিল রাখার কথা নয়।

এর পরে আসে অনুবাদ। এনটিএ-র অধিকাংশ পরীক্ষা ১৩টি ভাষায় নেওয়া হয়। প্রথমে বিষয়-বিশেষজ্ঞেরা ইংরেজি প্রশ্ন ভারতীয় ভাষাগুলিতে অনুবাদ করেন। তার পরে অন্য বিশেষজ্ঞেরা সেই অনুবাদ ফের ইংরেজিতে রূপান্তর করেন। মূল প্রশ্নের অর্থ বা প্রসঙ্গ অনুবাদে বদলে গিয়েছে কি না, তা এই ‘পুনরানুবাদ’-এর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।

এনটিএ সম্প্রতি ইন্টারনেট-বিচ্ছিন্ন কৃত্রিম মেধা-সহায়ক অনুবাদ ব্যবস্থাও তৈরি করেছে। সেখানে যন্ত্র প্রথম খসড়া অনুবাদ প্রস্তুত করে, কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষা করেন মানুষই। শুধু পরীক্ষায় ব্যবহারের জন্য নির্বাচিত প্রশ্ন নয়, গোটা প্রশ্নভান্ডারই ১২টি ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ফলে অনুবাদকদের হাতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি প্রশ্ন থাকে; কোনগুলি চূড়ান্ত প্রশ্নপত্রে আসবে, তা তাঁদের পক্ষে বোঝা কঠিন।

অনুবাদের কক্ষ সম্পূর্ণ ভাবে বাইরের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। সেখানে ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিন যন্ত্র, বহিরাগত তথ্য-সংরক্ষণ মাধ্যম কিংবা মেঘভিত্তিক সংযোগের অনুমতি নেই। একজন অনুবাদক কত ক্ষণ প্রশ্নগুলি দেখতে পারবেন, তারও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।

প্রশ্ন তৈরির জন্য প্রবীণ শিক্ষকদের পৃথক পৃথক দল প্রায় এক সপ্তাহের জন্য দিল্লিতে এনটিএ-র দফতরে আসে। প্রবেশের আগে তাঁদের মুঠোফোন ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন যন্ত্র জমা রাখতে হয়। প্রয়োজনীয় সহায়ক বইপত্র দফতরের ভিতরেই দেওয়া হয়। প্রতিটি দলে একজন আহ্বায়ক এবং চারজন বিষয়-বিশেষজ্ঞ থাকেন। একটি দল অন্য দলের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারে না। তাঁরা চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র নয়, মূলত বড় প্রশ্নভান্ডার তৈরি করেন। সেখান থেকে যান্ত্রিক ও দৈবচয়ন পদ্ধতিতে একাধিক চূড়ান্ত সেট গড়ে ওঠে।

তা সত্ত্বেও ভুল হচ্ছে কেন? প্রশ্ন তৈরির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের একাংশের মতে, আগের কোনও অব্যবহৃত সেটের প্রশ্ন নতুন প্রশ্নের সঙ্গে মেশানোর সময় একই প্রশ্ন দ্বিতীয় বার ঢুকে যেতে পারে। কোনও পুরনো সেট যে ইতিমধ্যেই নতুন ভাবে মিশিয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই তথ্য সংশ্লিষ্টদের অজানা থাকলেও পুনরাবৃত্তি ঘটে। বানান ও শব্দগত ভুল ঢুকে পড়তে পারে মুদ্রণ, প্রমাণ সংশোধন অথবা অনুবাদের স্তরে।

একাধিক প্রস্তুত সেটের মধ্যে কোনটি পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরীক্ষার দিন সকালেই। নির্বাচিত সেটটি ব্যবহার করা হয়; বাকিগুলি সিলবন্দিই থাকে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে প্রশ্নভান্ডার থেকে সুরক্ষিত মুদ্রণ ও সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই গোপনীয়তা এবং ভুল প্রতিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ত্রুটি দেখিয়ে দিয়েছে, ব্যবস্থা যতই বিস্তৃত হোক, প্রতিটি ধাপে দায়বদ্ধতা ও নিখুঁত তদারকি না থাকলে সিলবন্দি খামের ভিতরেও ভুল অক্ষত থেকে যেতে পারে।