শান্তিচুক্তির শর্ত মেনে অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিলেন তাঁরা। কিন্তু প্রায় দু’বছর পরেও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ তুলে এবার ত্রিপুরায় ৭২ ঘণ্টার বন্‌ধের ডাক দিলেন নিষিদ্ধ দুই জঙ্গি সংগঠন ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা বা এনএলএফটি এবং অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স বা এটিটিএফের আত্মসমর্পণকারী সদস্যেরা। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যজুড়ে এই বন্‌ধ পালনের ঘোষণা করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকার, ত্রিপুরা সরকার এবং দুই জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের পদস্থ আধিকারিকেরা সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। চুক্তির পর এনএলএফটি ও এটিটিএফের কয়েকশো সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসেন।

চুক্তি অনুসারে আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসন এবং ত্রিপুরার জনজাতি-অধ্যুষিত এলাকার উন্নয়নের জন্য কেন্দ্র ২৫০ কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছিল। জীবিকা অর্জনের সুযোগ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, মাসিক ভাতা, এককালীন আর্থিক সহায়তা এবং কৃষি, মৎস্যচাষ ও গ্রামীণ উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অগ্রাধিকারের মতো ব্যবস্থারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের অভিযোগ, চুক্তির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ধারাই এখনও কার্যকর হয়নি। ফলে অস্ত্র ছেড়ে ফেরা বহু পরিবার তীব্র আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

তাঁদের বক্তব্য, দাবি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, জনজাতি কল্যাণমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকদের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু কোনও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। পুনর্বাসনের আশ্বাসে আত্মসমর্পণ করলেও অধিকাংশ প্রাক্তন জঙ্গির সামনে এখনও নিয়মিত আয়ের পথ খোলেনি বলে তাঁদের দাবি।

এর আগেও একই অভিযোগে আন্দোলনে নেমেছিলেন আত্মসমর্পণকারীরা। গত জুনে অসম–আগরতলা জাতীয় সড়ক এবং রেলপথের বিভিন্ন অংশ অবরোধ করা হয়। খোয়াই ও পশ্চিম ত্রিপুরার কয়েকটি এলাকায় সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছিল। পরে জনজাতি কল্যাণমন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা এবং প্রশাসনের আধিকারিকেরা দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে সেই আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আশ্বাসের পরেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি।

শান্তিচুক্তির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনটিকেই নতুন আন্দোলন শুরুর জন্য বেছে নেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। আত্মসমর্পণকারী সদস্যেরা জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো নয়; সরকারকে চুক্তি রূপায়ণে বাধ্য করতেই এই কঠোর কর্মসূচি। তবে ৭২ ঘণ্টার বন্‌ধে রাজ্যের সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজ্য সরকারের তরফে বন্‌ধের ডাক নিয়ে তাৎক্ষণিক বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া মেলেনি। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটানো না গেলে দীর্ঘদিনের বিদ্রোহের অবসান ঘটিয়ে অর্জিত শান্তির প্রক্রিয়া নতুন করে চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রাজনৈতিক মহলের।