International

এআই-ছায়ায় তেলিসনের উত্থান

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • একটি উপন্যাস, হঠাৎ বিপুল পরিচিতি, তার পরেই একের পর এক প্রশ্ন।
  • তেলিসন ওরেলিয়াঁর C’était ça ou mourir—বাংলায় যার অর্থ ‘হয় এটাই, নয় মৃত্যু’—চলতি সাহিত্য-মরসুমে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল।
  • কিন্তু এখন সেই বইয়ের লেখককেই ঘিরে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অভিযোগ।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

একটি উপন্যাস, হঠাৎ বিপুল পরিচিতি, তার পরেই একের পর এক প্রশ্ন। তেলিসন ওরেলিয়াঁর C’était ça ou mourir—বাংলায় যার অর্থ ‘হয় এটাই, নয় মৃত্যু’—চলতি সাহিত্য-মরসুমে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল। কিন্তু এখন সেই বইয়ের লেখককেই ঘিরে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অভিযোগ। শুধু তা-ই নয়, ২০১০-এর দশকে কানাডার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর কয়েকটি লেখাতেও অন্যের লেখা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

তাহলে কে এই তেলিসন ওরেলিয়াঁ, যাঁর সাহিত্যিক উত্থান এত দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে এল?

১৯৮৮ সালে হাইতির তৃতীয় বৃহত্তম শহর গোনাইভে জন্ম তাঁর। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সঙ্গে ক্যাপ-হাইতিয়াঁয় বড় হয়ে ওঠা—এক গভীর ধর্মবিশ্বাসী প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে। মা ছিলেন বাক্‌চিকিৎসক, বাবা ধর্মতত্ত্ববিদ ও হিসাবরক্ষক। বইয়ের প্রতি টানটা বাবার কাছ থেকেই।

একটি মার্কিন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কাজ করার সূত্রে তাঁর বাবা হাইতির নানা প্রান্তে যাতায়াত করতেন। প্রতিবারই সঙ্গে করে আনতেন বই। বাইবেলের পাশাপাশি সেই বইগুলির হাত ধরেই কিশোর ওরেলিয়াঁর পরিচয় রোম্যাঁ গারি, নেগ্রিতিউদ আন্দোলনের লেখক এমে সেজেয়ার ও লেওপোল সেদার সেংঘরের সঙ্গে। পরে পড়েন ফরাসি-হাইতীয় কবি রেনে দেপেস্ত্রকে।

দেপেস্ত্র সম্পর্কে ল্য পয়ঁ-কে একবার ওরেলিয়াঁ বলেছিলেন, “আমার বেঁচে থাকার জন্য তিনি যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, লেখক হয়ে ওঠার জন্যও ততটাই।”

স্কুলের শিক্ষকদের উৎসাহে অল্প বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেন তিনি। ২০০৭ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে, তাঁর কবিতার সংকলন Les Couleurs de ma terre (‘আমার মাটির রং’) আন্তঃআঞ্চলিক তরুণ লেখক পুরস্কার পায়। বইটি প্রকাশ করে সুইৎজারল্যান্ডের এদিসিয়ঁ দ্য লেব।

সেই সময়ই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তটা যেন নিয়ে ফেলেছিলেন ওরেলিয়াঁ। লিবেরাসিয়োঁ-কে তিনি বলেছিলেন, “নিজেকে বলেছিলাম, আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। আমার জীবন লেখালিখির সঙ্গেই বাঁধা থাকবে।”

সেই বছরই হাইতীয় কবি জেমস নোয়েলের নজরে পড়েন তিনি। নোয়েল তাঁকে নিজের সাহিত্যপত্রিকা IntranQu’îllités-এ লেখার আমন্ত্রণ জানান। পরে ল্য মোঁদ-কে নোয়েল স্মরণ করেছিলেন, ওরেলিয়াঁর কবিতায় ছিল চমকে দেওয়ার মতো চিত্রকল্প, ছন্দময়তা এবং ছোট ছোট ছেদে গড়া এক নিজস্ব প্রাণবন্ত শৈলী। তাঁর চোখে, ওরেলিয়াঁ ছিলেন “আপাদমস্তক এক প্রকৃত লেখক হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি”।

তার পর আসে ২০১০-এর ভূমিকম্প। হাইতিকে বিধ্বস্ত করে দেওয়া সেই বিপর্যয়ের পর, মাত্র ২৩ বছর বয়সে দেশ ছাড়েন ওরেলিয়াঁ। C’était ça ou mourir-এর চরিত্র জোনাস দর্লেওঁর মতোই তাঁর নিজের জীবনেও শুরু হয় প্রবাসের যাত্রা। ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র থেকে যুক্তরাষ্ট্র, সেখান থেকে কানাডা—যেখানে পরিবারের কয়েকজন সদস্য আগেই থাকতেন।

প্রথমে মন্ট্রিয়ল। ২০২২ সালে অটোয়া। এখন স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে সেখানেই থাকেন তিনি।

কানাডায় অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটি পৌর গ্রন্থাগারে কাজ করেন। চালান কবিতার যৌথ ব্লগ Parole en archipel (‘দ্বীপপুঞ্জে শব্দ’)। স্বাধীন লেখক হিসেবেও লিখতে শুরু করেন হাফিংটন পোস্ট কেবেক-এ। তাঁর লেখা দুটি নিবন্ধের একটি ছিল হাইতি কীভাবে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল, অন্যটি হাইতীয় ক্রেওল ভাষায় প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসের ইতিহাস নিয়ে।

কেবেকের দৈনিক লা প্রেস-এও কলাম লিখতেন ওরেলিয়াঁ। আর সেই লেখাগুলিই এখন নতুন করে আলোচনায়।

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একাংশের অভিযোগ, তাঁর কয়েকটি কলামে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত লেখার অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। রেডিও-কানাডাও ২০১২ ও ২০১৩ সালে কানাডা ও ফ্রান্সের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি কলাম ও মতামতধর্মী লেখার সঙ্গে আগে প্রকাশিত অন্য লেখার বাক্যের মিলের কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে আরএফআই রেডিওর মঁদোব্লগ প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত কয়েকটি লেখায় এমন মিলের অভিযোগ সামনে এসেছে।

ওরেলিয়াঁ যে ওয়েবসাইটে নিজের কলামগুলি পুনঃপ্রকাশ করতেন, সেটিও ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে আর খোলা যাচ্ছে না।

তবে C’était ça ou mourir তাঁকে পরিচিত করে তোলার আগে তিনি একেবারেই লেখালিখির বাইরে ছিলেন না। বরং তাঁকে প্রায়ই প্রথম উপন্যাসের লেখক হিসেবে পরিচয় করানো হলেও, বইটি তাঁর প্রথম উপন্যাস নয়।

এর আগে তিনি লিখেছেন Eternels Amants (‘চিরন্তন প্রেমিকেরা’), যা ২০২৩ সালে লুলু প্ল্যাটফর্মে নিজেই প্রকাশ করেন। রয়েছে আরও একটি উপন্যাস—Le Rêve de la mer Noire (‘কৃষ্ণসাগরের স্বপ্ন’)।

দ্বিতীয় বইটির গল্পও তাঁর নিজের জন্মভূমির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে। ২০২৪ সালে নিজের পরিচয় গোপন রেখে হাইতির একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতায় উপন্যাসটি জমা দেন ওরেলিয়াঁ। কাহিনিতে এক ব্যক্তি ১৯৯৪ সালে গোনাইভে সংঘটিত একটি গণহত্যার তদন্ত করতে হাইতিতে ফিরে আসেন। সময়টা ছিল জেনারেল রাউল সেদ্রাসের সামরিক একনায়কতন্ত্রের।

উপন্যাসটি আমারান্ত পুরস্কার পায় এবং পোর্ত-অ-প্রাঁসের সি৩ এদিসিয়ঁ থেকে প্রকাশিত হয়। একই প্রকাশনা সংস্থা এখন C’était ça ou mourir-এর তৃতীয় ফরাসি সংস্করণ প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এখন সেই লেখকই গুরুতর অভিযোগের মুখে।

তাঁকে অবশ্য অন্য চোখে দেখেন কেবেকের লেখক রডনি সাঁত-এলোয়া। হাইতিতে জন্ম নেওয়া এই লেখক ওরেলিয়াঁকে তাঁর তরুণ বয়স থেকেই চেনেন। তাঁর স্মৃতিতে ওরেলিয়াঁ ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁকে সহজে বোঝা যেত না—নিঃসঙ্গ, নিজেকে আড়ালে রেখে এগিয়ে চলা, অথচ বইপড়া ও লেখালিখিতে গভীরভাবে নিমগ্ন।

সাঁত-এলোয়ার মতে, C’était ça ou mourir অসাধারণ একটি বই। তাঁর বক্তব্য, ওরেলিয়াঁর বিরুদ্ধে এআই ব্যবহারের অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

জেমস নোয়েলও উপন্যাসটি পড়েছেন মুগ্ধ হয়ে। বইটিতে কিছু খুঁত দেখেছেন তিনি, তবে তাঁর মতে, সেই খুঁতগুলিই লেখাটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে।

এআই ব্যবহারের অভিযোগ নিয়েও নোয়েলের অবস্থান সরল নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করাটাকেই তিনি সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। বরং তাঁর প্রশ্ন—এমন একটি যন্ত্র দিয়ে আদৌ কি এই ধরনের উপন্যাস তৈরি করা সম্ভব?

২৪ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সে Les Correspondances de Manosque সাহিত্য উৎসবে বক্তব্য রাখার আগে এএফপিকে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন ওরেলিয়াঁ। তাঁর দাবি, তাঁকে ঘিরে যে অভিযোগ উঠছে, তার উদ্দেশ্য শুধু বইটিকে আক্রমণ করা নয়; বরং তাঁর “কণ্ঠস্বরকে আক্রমণ করা” এবং “চুপ করিয়ে দেওয়া”।

এদিকে, ফ্রান্সে নিজের উপন্যাসের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রকাশনা সংস্থা এদিসিয়ঁ গ্রাসের জনসংযোগ দপ্তরের মাধ্যমে ল্য মোঁদ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে পত্রিকার প্রশ্নের উত্তর দেননি ওরেলিয়াঁ।

একটি উপন্যাস তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছিল। এখন সেই আলোচনাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে তাঁর লেখকসত্তা, পুরনো লেখা এবং লেখার পদ্ধতি নিয়ে। অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখনও হয়নি—কিন্তু তেলিসন ওরেলিয়াঁর দ্রুত উত্থানের গল্পে এখন একটি নতুন অধ্যায় নিশ্চিতভাবেই যোগ হয়েছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles