সোমালিয়া ও ইয়েমেন উপকূলে চলতি সপ্তাহে সশস্ত্র জলদস্যুদের হাতে অপহৃত দুটি জাহাজে মোট ২২ জন ভারতীয় নাবিক রয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত সূত্র জানিয়েছে, দুই জাহাজের পরিচালন সংস্থাগুলি ভারত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে কাজ করছে। এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, ভারতীয় নাবিকেরা নিরাপদে রয়েছেন।

অপহৃত জাহাজ দুটির একটি এরিত্রিয়ার পতাকাবাহী তেলজাত পণ্য পরিবহণকারী ট্যাঙ্কার ‘সিবু ১’। বৃহস্পতিবার ইয়েমেন উপকূলের অদূরে এডেন উপসাগর থেকে জাহাজটি অপহরণ করা হয়। অন্যটি ক্যামেরুনের পতাকাবাহী সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ‘লুতুফ’। সোমবার, ১৭ আগস্ট সোমালিয়া উপকূলের অদূরে সেটি জলদস্যুদের কবলে পড়ে।

‘সিবু ১’-এ মোট ২০ জন নাবিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন ভারতীয়। অন্যদিকে, ‘লুতুফ’-এ থাকা ১০ জনের মধ্যে ছ’জন ভারতীয় নাবিক। জাহাজটিতে তুরস্কের অস্ত্রশস্ত্র, যোগাযোগের সরঞ্জাম এবং উপগ্রহ-সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি পরিবহণ করা হচ্ছিল।

উল্লেখযোগ্যভাবে, ‘সিবু ১’-এর পূর্বতন নাম ছিল ‘সিগাল’। ইরানের পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাহাজটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল আমেরিকা।

ব্রিটেনের ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ বা ইউকেএমটিও কেন্দ্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ছ’জন সশস্ত্র ব্যক্তি একটি ট্যাঙ্কারে উঠে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে জাহাজটিকে সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সূত্রের দাবি, ইউকেএমটিও-র ওই অপহরণ-সতর্কতা ‘সিবু ১’-কে কেন্দ্র করেই জারি করা হয়েছিল।

অন্য একটি সতর্কবার্তায় ইউকেএমটিও জানায়, সোমালিয়া উপকূলের অদূরে আটজন ‘সশস্ত্র অননুমোদিত ব্যক্তি’ একটি পণ্যবাহী জাহাজে উঠে সেটির নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে। জানা গিয়েছে, ওই বার্তাটি ছিল ‘লুতুফ’ সম্পর্কে।

শুক্রবার পর্যন্ত জাহাজ দুটির কোনওটিই নিজেদের অবস্থান-সংক্রান্ত সঙ্কেত পাঠাচ্ছিল না। মনে করা হচ্ছে, জলদস্যুরা জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী স্বয়ংক্রিয় প্রেরণযন্ত্র বন্ধ করে দিয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের কারণে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় সামুদ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি এমনিতেই বেড়েছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জলদস্যুতা এবং জাহাজ অপহরণের ঘটনাও। গত এক দশকে সোমালি জলদস্যুদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরে ফের জাহাজ অপহরণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

জাহাজ চলাচল বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীগুলি তাদের মনোযোগ ও সামরিক সম্পদের বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া এবং হরমুজ প্রণালীর দিকে সরিয়ে নেওয়ায় পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলিতে নজরদারি দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে এডেন উপসাগর, লোহিত সাগর এবং সোমালিয়া উপকূলবর্তী এলাকায় জলদস্যুতা ও জাহাজ অপহরণ বেড়ে যাওয়ার পিছনে এটি অন্যতম কারণ।

বিশ্বের বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত নাবিকদের মধ্যে ভারতীয়দের উপস্থিতি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। ‘বিমকো-আইসিএস সিফেয়ারার ওয়ার্কফোর্স রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, বিশ্ব জাহাজ পরিবহণ শিল্পে ভারত ৩ লক্ষ ১১ হাজার ৯৩৬ জন সামুদ্রিক পেশাজীবী সরবরাহ করে। নাবিক সরবরাহে ভারত এখন বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে।

প্রতিবেদনটির হিসাবে, বিশ্বের মোট নাবিকের ১২.২ শতাংশই ভারতীয়। এই তালিকায় ভারতের আগে রয়েছে শুধু ফিলিপিন্স। চিন, রাশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াও ভারতের পিছনে। বিশ্বের বিভিন্ন সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে ভারতীয় নাবিকদের বিপুল উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা বাড়লে তাঁদের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।

পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতে ইতিমধ্যেই বহু ভারতীয় নাবিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কয়েকজন প্রাণও হারিয়েছেন। মার্চের গোড়া থেকে ওই অঞ্চলে হামলার শিকার হওয়া একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে ভারতীয় নাবিকেরা ছিলেন। কয়েকটি ক্ষেত্রে হামলায় জাহাজ বিকল হয়ে যাওয়ার পরে আঞ্চলিক সামরিক বাহিনীকে অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করতে হয়েছে।