বাংলাস্ফিয়ার: কিয়েভের তারাস শেভচেঙ্কো বুলেভার্ডের শেষপ্রান্তে একটি খালি বেদি ২০১৩ সাল থেকে ইউক্রেনের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ভ্লাদিমির লেনিনের বিশাল মূর্তি। ময়দান বিপ্লবের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা সেটি ভেঙে ফেলে এবং হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। এখন সেই স্থানেই কসাক নেতা ইভান মাজেপা-র মূর্তি বসানোর প্রস্তাব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

জুন মাসে কিয়েভের ঐতিহাসিক পেচেরস্ক লাভরা মঠে মাজেপার একটি আবক্ষ মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে জেলেনস্কি বলেন, “যেখানে লেনিন পড়ে গিয়েছিল, সেখানে মাজেপা অটলভাবে দাঁড়াবে।” রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এই প্রাচীন মঠেই তিনি ইউক্রেনের ইতিহাস পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

সোভিয়েত অতীত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা

১৯৯১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই ইউক্রেন ধীরে ধীরে সোভিয়েত যুগের স্মৃতিচিহ্ন সরিয়ে ফেলার কাজ শুরু করে। রাস্তার নাম পরিবর্তন, লেনিনসহ সোভিয়েত নেতাদের মূর্তি অপসারণ—সবই ছিল তথাকথিত ‘ডিকমিউনাইজেশন’ বা সোভিয়েত প্রভাবমুক্তির অংশ।

২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করার পর এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগোয়। ২০২২ সালে ভ্লাদিমির পুতিনের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর তা নতুন গতি পায়। ইউক্রেনীয়দের বড় অংশ মনে করতে শুরু করেন, তাদের জাতীয় পরিচয়কে দীর্ঘদিন ধরে রুশ সাম্রাজ্য ও সোভিয়েত ইতিহাসের আড়ালে চাপা রাখা হয়েছে।

‘আমরা এক জাতি নই’

কিয়েভের তারাস শেভচেঙ্কো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির ইতিহাসের অধ্যাপক নাটালিয়া ক্রিভদা বলেন, ইউক্রেন এখনও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।

তার কথায়, “সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্ন জাতির সংস্কৃতিকে গ্রাস করে একটি একক ‘সোভিয়েত জাতি’ তৈরি করতে চেয়েছিল। আজও রাশিয়া দাবি করে, ইউক্রেন ও রাশিয়া একই জাতি। এটি সত্য নয়। আমাদের নিজস্ব চিন্তাধারা, ইতিহাস, বিশ্বাস ও স্বপ্ন রয়েছে।”

তার মতে, স্মৃতিস্তম্ভ কেবল ভাস্কর্য নয়, একটি জাতির স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের দৃশ্যমান প্রতীক। তাই লেনিনের জায়গায় মাজেপার মূর্তি স্থাপনকে তিনি সমর্থন করেন, যদিও মাজেপাকে তিনি “জটিল ও বিতর্কিত” ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবেই দেখেন।

কে ছিলেন ইভান মাজেপা?

১৭শ ও ১৮শ শতকের সন্ধিক্ষণে কসাক ইউক্রেনের নেতা বা হেটম্যান ছিলেন ইভান মাজেপা। শুরুতে তিনি রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেটের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। কিন্তু ১৭০৮ সালে সুইডিশ আক্রমণের মুখে ইউক্রেনকে রক্ষা করতে পিটার ব্যর্থ হওয়ায় মাজেপা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং সুইডেনের রাজা চার্লস দ্বাদশের সঙ্গে জোট বাঁধেন।

শেষ পর্যন্ত সেই অভিযান ব্যর্থ হয়। এরপর রুশ সাম্রাজ্য এবং পরে সোভিয়েত শাসকরা মাজেপাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তুলে ধরে। বহু বছর ধরে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের অবমাননাকরভাবে “মাজেপাবাদী” বলে আখ্যা দেওয়া হতো।

তবে আজকের ইউক্রেনে অনেকেই মাজেপাকে ইউরোপমুখী স্বাধীন ইউক্রেনের অন্যতম স্থপতি হিসেবে দেখেন।

ইতিহাসকে নিজেদের চোখে দেখার চেষ্টা

জেলেনস্কির মতে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে মাজেপার ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, যাতে ইউক্রেনীয়রা নিজেদের ইতিহাস অন্যের দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য হয়।

ক্রিমিয়ান তাতার লেখক ও মানবাধিকারকর্মী আলিম আলিয়েভ বলেন, ইউক্রেন এখন নিজেদের ইতিহাস নতুনভাবে ফিরে পাচ্ছে।

তার ভাষায়, “আমরা আমাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর ও পরিচয় পুনরুদ্ধার করছি।”

তিনি উল্লেখ করেন, সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী কবি ভাসিল স্তুস-এর ছবি আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ইউক্রেনের নতুন ২,০০০ হৃভনিয়া নোটে থাকবে। স্তুস ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন এবং আজ তিনি ইউক্রেনীয় জাতীয় পুনর্জাগরণের প্রতীক।

পুশকিন থেকে বুলগাকভ—রুশ প্রতীকও সরছে

শুধু সোভিয়েত নেতা নন, রুশ সাহিত্যিকদের স্মৃতিচিহ্নও সরিয়ে দিচ্ছে ইউক্রেন।

দেশজুড়ে আলেকজান্ডার পুশকিনের বহু মূর্তি অপসারণ করা হয়েছে। আলিয়েভের অভিযোগ, পুশকিন তাঁর লেখায় ক্রিমিয়াকে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছেন এবং ক্রিমিয়ান তাতারদের উপনিবেশিক চোখে উপস্থাপন করেছেন।

গত মাসে কিয়েভে রুশ সাহিত্যিক মিখাইল বুলগাকভ-এর মূর্তিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০০৭ সালে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ডিসেন্টে তাঁর বাড়ির সামনে এটি স্থাপন করা হয়েছিল। যদিও তাঁর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘর এখনও চালু রয়েছে।

‘আমি কে?’—যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন

বুলগাকভ জাদুঘরের পরিচালক লিউদমিলা হাবিয়ানুরি বলেন, তিনি মূর্তি অপসারণের বিরোধিতা করেননি। তাঁর মতে, যুদ্ধ ইউক্রেনীয়দের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তুলে ধরেছে—“আমি কে?”

তিনি বলেন, “যদি আমি রুশ ভাষায় কথা বলি, রুশ চলচ্চিত্র দেখি, অথচ সেই রাশিয়াই আমাকে হত্যা করছে, তাহলে আমাকে সেসব ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমি ইউক্রেনীয়। আর যদি আমি ইউক্রেনীয় হই, তবে যত দ্রুত সম্ভব আমাকে সেই পরিচয় গ্রহণ করতে হবে।”

ইউক্রেনে তাই লেনিনের খালি বেদি কেবল একটি ভাঙা মূর্তির স্মৃতি নয়; এটি একটি জাতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান সংগ্রামের প্রতীক। লেনিনের স্থানে মাজেপাকে বসানোর পরিকল্পনা সেই নতুন আত্মপরিচয়েরই প্রকাশ, যা রুশ প্রভাবের পরিবর্তে স্বাধীন ইউক্রেনের ইতিহাসকে সামনে আনতে চায়।