সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের ধাক্কা সামলে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে এবার সরাসরি মাঠে নামছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। আগামী ৬ অগস্ট মুম্বইয়ে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি প্রায় ২,০০০ কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসবেন সংঘপ্রধান মোহন ভাগবত। বিজেপি ও আরএসএস সূত্রের দাবি, জেন জেড এবং জেন আলফার সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের লক্ষ্যে এটি সংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
ছাত্র-ক্ষোভের পরেই নয়া ভাবনা
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র নেতৃত্বে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর তরুণদের মন বুঝতে নতুন করে তৎপর হয়েছে সংঘ পরিবার। সাম্প্রতিক আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়—তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের প্রয়োজনও বাড়ছে।
৬ অগস্টের অনুষ্ঠানটি হবে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট টু ইউনাইট নেশনস (আইআইএমইউএন)-এর ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে। মুম্বইয়ের নীতা মুকেশ আম্বানি কালচারাল সেন্টারে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের ১০০-রও বেশি শহর থেকে আসা প্রায় ২,০০০ পড়ুয়া অংশ নেবে।
‘আদেশ নয়, আলোচনা’
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময়ই তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন বদলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন ভাগবত। দিল্লির এক অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য ছিল, ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে—নির্দেশ দিয়ে নয়, আলোচনার মাধ্যমে; আদেশ চাপিয়ে নয়, ঐকমত্য তৈরি করে।
তরুণ প্রজন্মের মানসিকতার পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি। ভাগবতের মতে, আগের প্রজন্মের মতো আজকের তরুণরা শুধু নির্দেশ মেনে নেওয়ার জায়গায় নেই। তারা প্রশ্ন করে, যুক্তি জানতে চায়। তাই তাদের বোঝাতে হলে সময় দিতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে এবং স্নেহের সঙ্গে পাশে দাঁড়াতে হবে।
আন্দোলনে আয়না দেখেছে বিজেপি
বিজেপির একাধিক নেতার দাবি, ভাগবতের সেই মন্তব্যের পর সংগঠনের অন্দরেও আত্মসমালোচনা শুরু হয়। দলের এক শীর্ষ পদাধিকারীর মতে, ছাত্রদের ক্ষোভকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়—এই উপলব্ধি থেকেই সংগঠনের কৌশল নতুন করে ভাবা শুরু হয়েছে।
আরএসএসের সরকার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসাবলেও সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি ভারতের সভ্যতাগত মূল্যবোধের ভিত্তিতে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
এবিভিপিকেও বার্তা
ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখার বার্তা এসেছে সংঘের অন্দর থেকেও। আরএসএসের সহ-সরকার্যবাহ অতুল লিময়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-কে আন্দোলনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষ করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি কীভাবে আন্দোলনের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল, তা খতিয়ে দেখে নিজেদের সংগঠনগত কৌশল নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
‘যুব মোর্চা দুর্বল’
আন্দোলনের পর বিজেপির অন্দরেও উঠেছে সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রশ্ন। দলের এক শীর্ষ নেতা স্বীকার করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একাধিক যুবকেন্দ্রিক কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি দেখিয়ে দিয়েছে যে ছাত্রসমাজের সঙ্গে দলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগে ফাঁক রয়েছে।
ওই নেতার কথায়, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের কাজ অনেকটাই ওপর থেকে নিচে পরিচালিত হচ্ছে। যুব মোর্চা ও মহিলা মোর্চার মতো সংগঠনগুলিও অনেক ক্ষেত্রে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তাদের ভূমিকা কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
এবার ‘যুব-সংযোগ’
এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় জনতা যুব মোর্চা (বিজেওয়াইএম) এবং এবিভিপি-কে ছাত্র ও তরুণদের মধ্যে আরও সক্রিয় হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে দেশজুড়ে ১৫ দিনের একটি বিশেষ যুব-সংযোগ কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে, যার অংশ হবে মহারাষ্ট্র।
পাশাপাশি কেন্দ্র ও দিল্লি সরকার তরুণদের লক্ষ্য করে মাদকবিরোধী প্রচারও শুরু করেছে। অর্থাৎ, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রটি এখন শুধু রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—সামাজিক ও সরকারি কর্মসূচিতেও তার ছাপ পড়ছে।
ভাগবতের সামনে ২,০০০ তরুণ
৬ অগস্টের অনুষ্ঠানে ভাগবতের বক্তব্যের মূল বিষয়—“ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তরুণদের ভূমিকা”। তবে অনুষ্ঠানের তাৎপর্য শুধু একটি বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় ২,০০০ কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হওয়াটাই এই উদ্যোগের বড় দিক।
আইআইএমইউএন-এর কোর কাউন্সিলের সদস্য আতিব ইমতিয়াজের কথায়, দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জেন জেড প্রজন্মের সঙ্গে ভাগবতের সরাসরি সংলাপ জরুরি হয়ে উঠেছে। তরুণরা যেমন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি জানবে, তেমনই নিজেদের প্রশ্ন ও মতামতও সরাসরি তুলে ধরতে পারবে।
সব মিলিয়ে, ছাত্র আন্দোলনের পর আরএসএসের সামনে এখন শুধু সংগঠন বাড়ানোর প্রশ্ন নয়—তরুণদের আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ৬ অগস্টের মুম্বই বৈঠক তাই নিছক একটি অনুষ্ঠান নয়; নতুন প্রজন্মকে বোঝা এবং তাদের সঙ্গে নতুন ভাষায় কথা বলার সংঘের বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।