য়াদিল্লির যন্তর মন্তরে গত ২০ জুলাই ছাত্র-যুবদের ‘সংসদ চলো’ অভিযান ঘিরে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করল সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের হাতে পুলিশকর্মীদের আক্রান্ত হওয়া এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হওয়ার অভিযোগও তদন্ত করবে এই কমিটি। অর্থাৎ, কোনও এক পক্ষের বক্তব্যকে অগ্রাধিকার না দিয়ে সংঘর্ষের সামগ্রিক ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

কমিটির নেতৃত্বে থাকছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি আর সুভাষ রেড্ডি। অন্য সদস্যেরা হলেন পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রবিশঙ্কর ঝা, দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি শালিন্দর কৌর, সিবিআইয়ের প্রাক্তন অধিকর্তা ঋষিকুমার শুক্ল এবং মেঘালয়ের প্রাক্তন পুলিশ মহাপরিচালক এল আর বিষ্ণোই।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ ১৮ আগস্ট কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে সেই নির্দেশ প্রকাশিত হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিট-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়ম এবং দেশজুড়ে ছাত্র-বিক্ষোভের সময় পুলিশি অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে দায়ের হওয়া একগুচ্ছ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ।

আদালত জানিয়েছে, তদন্ত কমিটিকে প্রথমে দেখতে হবে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বল প্রয়োগ করেছিল কি না। অভিযোগ রয়েছে, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের পাশাপাশি ধাতব গুলি বা পেলেট ব্যবহার করা হয়েছিল। মহিলা বিক্ষোভকারীদের চিহ্নিত করে আক্রমণ, হেনস্থা এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগও আলাদা গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। আহত বিক্ষোভকারী ও পুলিশকর্মীদের অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন কি না, সে বিষয়েও সুপারিশ করতে পারবে কমিটি।

বিক্ষোভ সামলানোর সময় পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দিষ্ট পোশাক পরা এবং দৃশ্যমান পরিচয়পত্র রাখা উচিত কি না, তাও তদন্তের পরিধিতে রয়েছে। যন্তর মন্তরে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের উপর নজরদারি চালানো হয়েছিল কি না এবং পরে তাঁদের লক্ষ্য করে হেনস্থা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। শান্তিপূর্ণ জমায়েত ঠেকাতে প্রশাসন নিয়মিত ভাবে সার্বিক নিষেধাজ্ঞা জারি করছে কি না, সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিও কমিটির বিবেচনাধীন।

আবার পুলিশের অভিযোগও সমান গুরুত্বে দেখতে বলেছে আদালত। বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা করেছিল কি না, কতটা সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা কী ধরনের শারীরিক ও মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন—এসবও তদন্ত করা হবে। আদালতের কথায়, দুই পক্ষ উত্থাপিত সমস্ত বিষয়ই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রয়োজন মনে করলে কমিটি এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য প্রশ্নও বিবেচনা করতে পারবে।

২০ জুলাই ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে কয়েক হাজার ছাত্র-যুব যন্তর মন্তর থেকে সংসদের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেন। তাঁদের দাবি ছিল, প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা ঘিরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বাধে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, পুলিশ ও দ্রুত কার্যকর বাহিনী নির্বিচারে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং পেলেট ব্যবহার করেছিল। পরে ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন এবং আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।

দিল্লি পুলিশ অবশ্য সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া হলফনামায় মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, সংসদ অভিযানের অনুমতি ছিল না এবং কয়েকটি ব্যারিকেড ভেঙে জনতার একাংশ হিংসাত্মক হয়ে ওঠার পর ধাপে ধাপে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বল প্রয়োগ করা হয়। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০ হাজার বিক্ষোভকারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাঁচ হাজার পুলিশ মোতায়েন ছিল; সংঘর্ষে ২৪০ জনের বেশি পুলিশকর্মী এবং প্রায় ২০০ জন বিক্ষোভকারী আহত হন।

সুপ্রিম কোর্ট আগেই সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া সিসিটিভি এবং পুলিশকর্মীদের দেহ-ক্যামেরার সমস্ত দৃশ্য কমিটির হাতে তুলে দিতে বলেছে। তদন্ত শেষ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি; তবে যত দ্রুত সম্ভব অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। তদন্তটি এককালীন নয়—কমিটিকে পর্যায়ক্রমে অনুসন্ধানের ফল জানাতে হবে, যাতে আদালত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে।

আদালত আরও স্পষ্ট করেছে, কমিটি গঠনের কারণে দোষী পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ব্যবস্থা আটকে থাকবে না। ফলে তদন্ত চলাকালীনই নিয়মভঙ্গের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট বাহিনী স্বাধীন ভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এই নির্দেশের তাৎপর্য এখানেই—প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের দায় নির্ধারণ, দুই ক্ষেত্রেই সমান মানদণ্ডে জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে চাইছে সর্বোচ্চ আদালত।