সানির গর্জন, দেশভাগের কান্না কোথায়?

যা জানা জরুরি
- রাজকুমার সন্তোষী ও সানি দেওলের পুনর্মিলন ঘিরে প্রত্যাশা কম ছিল না।
- নব্বইয়ের দশকে এই জুটি ‘ঘায়েল’, ‘দামিনী’ এবং ‘ঘাতক’-এর মতো ছবি উপহার দিয়েছিল।
- সেই ছবিগুলিতে সানি দেওলের রাগ শুধু গলা ফাটানো গর্জন ছিল না—তার পিছনে থাকত সামাজিক অন্যায়, ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং প্রতিরোধের তীব্রতা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাজকুমার সন্তোষী ও সানি দেওলের পুনর্মিলন ঘিরে প্রত্যাশা কম ছিল না। নব্বইয়ের দশকে এই জুটি ‘ঘায়েল’, ‘দামিনী’ এবং ‘ঘাতক’-এর মতো ছবি উপহার দিয়েছিল। সেই ছবিগুলিতে সানি দেওলের রাগ শুধু গলা ফাটানো গর্জন ছিল না—তার পিছনে থাকত সামাজিক অন্যায়, ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং প্রতিরোধের তীব্রতা। কিন্তু ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’-এ সেই পরিচিত গর্জন থাকলেও গল্পের ভিতরে সেই পুরনো আগুন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
আসগর ওয়াজাহতের ১৯৮৯ সালের বিখ্যাত নাটক ‘জিস লাহৌর নাই ভেখ্যা ও জম্যা ই নাই’ অবলম্বনে তৈরি এই ছবি। দেশভাগের নিষ্ঠুরতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং মানবতার জয়কে অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাবে তুলে ধরেছিল মূল নাটকটি। প্রথমে ছবিটির নাম ছিল ‘লাহৌর ১৯৪৭’। দীর্ঘ নির্মাণ-জটিলতার পর শেষ পর্যন্ত ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’ নামে মুক্তি পেয়েছে।
গল্পের কেন্দ্রে লাহৌরের একটি হাভেলি। দাঙ্গায় ঘরছাড়া হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসা মির্জা পরিবারকে সেই বাড়িটি বরাদ্দ করা হয়। পরিবারের কর্তা সিকন্দর মির্জার ভূমিকায় সানি দেওল। সঙ্গে স্ত্রী হামিদা, ছেলে ও ছোট মেয়ে। কিন্তু বাড়িতে তখনও রয়েছেন বৃদ্ধা হিন্দু মহিলা দুর্গাবতী—সবার প্রিয় ‘মাই’। শাবানা আজমির অভিনয়ে চরিত্রটি ছবির সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলির একটি।
মাই বিশ্বাস করেন, তাঁর ছেলে ও পরিবারের লোকজন এক দিন ফিরে আসবে। পাড়ার মানুষ জানেন, দাঙ্গার আগুনে তাঁদের আর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সেই নির্মম সত্য বৃদ্ধাকে জানানোর সাহস কারও হয় না। ফলে একই বাড়িতে দুই সম্প্রদায়ের দুই বাস্তবতা পাশাপাশি বসবাস করতে শুরু করে।
বাড়ির ভিতরের এই টানাপড়েনের পাশাপাশি বাইরে ক্রমশ বাড়তে থাকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। অভিমন্যু সিংহের অভিনীত এক উগ্রবাদী চরিত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেমন ঘৃণা ছড়ায়, তেমনই ‘কাফের’দের বিরুদ্ধে হুমকি দিতে থাকে। অন্য দিকে, মির্জা পরিবার ও মাইয়ের সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিরোধ থেকে স্নেহ ও মানবিকতার দিকে এগোয়।
ছবির বক্তব্য একেবারেই পরিষ্কার—কোনও ধর্ম নিজে মন্দ নয়, মানুষের ঘৃণাই বিপজ্জনক; ধর্ম ও রাজনীতির মিশ্রণ ভয়ংকর; আর মানবতার চেয়ে বড় কোনও পরিচয় নেই। বক্তব্যের দিক থেকে ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হল, এই কথাগুলি চরিত্র ও ঘটনার স্বাভাবিক বিকাশ থেকে উঠে আসে না। বরং অনেক সময় মনে হয়, দর্শকের সামনে একের পর এক স্লোগান সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত নাটকীয় সংলাপ এবং মঞ্চনাটকের মতো দৃশ্যবিন্যাস ছবিটিকে আরও সেকেলে করে তুলেছে। ভাল-মন্দের পরিচিত ছকে হিন্দু ও মুসলমান চরিত্রগুলিকে ভাগ করে দেওয়ায় গল্পের ধূসর জায়গাগুলিও হারিয়ে যায়। ফলে দেশভাগের মতো জটিল ও বহুমাত্রিক একটি মানবিক বিপর্যয় অনেকটাই সরলীকৃত হয়ে পড়ে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে সানি দেওল এখনও নিজের পরিচিত দাপট ধরে রেখেছেন। তাঁর গর্জন, আবেগ এবং অ্যাকশনভঙ্গি অনুরাগীদের পরিচিত স্বাদ দেবে। প্রীতি জিন্টাও নিজের চরিত্রে যথাযথ। আলি ফজলের কবি-সুলভ চরিত্র কিছুটা হালকা মুহূর্ত এনে দেয়। আর ছবির আসল শক্তি শাবানা আজমি। সংযম, আবেগ এবং নাটকীয়তার সূক্ষ্ম ভারসাম্য তিনি এমন ভাবে ধরে রেখেছেন যে, ছবির দুর্বল চিত্রনাট্যের মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি আলাদা করে চোখে পড়ে।
‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’-এর মানবিক বার্তা আজও নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক। দেশভাগের ক্ষত, সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহতা এবং মানুষের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিকতার প্রয়োজন—সবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। কিন্তু সেই গভীর অনুভূতিগুলিকে দর্শকের মনে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে সংবেদনশীল গল্প বলার প্রয়োজন ছিল, ছবি সেখানে বারবার পিছিয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত তাই ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’ হয়ে থাকে এমন এক ছবি, যার বক্তব্য বড়, অভিনয়ে দক্ষতা আছে, কিন্তু গল্প বলার ভাষা সময়ের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। সানি দেওলের গর্জন শোনা যায়, কিন্তু দেশভাগের যে কান্না দর্শকের বুকের ভিতর পৌঁছনোর কথা ছিল, সেটাই যেন কোথাও চাপা পড়ে যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



