‘শিশু আলু’র ভারত জয়!

যা জানা জরুরি
- নিউ ইয়র্কের এক সাধারণ পাড়া থেকে উঠে আসা এক ছটফটে কিশোর।
- না আছে অঢেল টাকা, না অত্যাধুনিক অস্ত্র, না কোনও রাজকীয় ব্যক্তিত্ব।
- ভারতের পর্দায় ‘ধুরন্ধর’ ধরনের প্রবল পরাক্রমী নায়কদের পাশে দাঁড় করালে স্পাইডার-ম্যানকে বরং নিতান্তই ছাপোষা বলে মনে হতে পারে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিউ ইয়র্কের এক সাধারণ পাড়া থেকে উঠে আসা এক ছটফটে কিশোর। না আছে অঢেল টাকা, না অত্যাধুনিক অস্ত্র, না কোনও রাজকীয় ব্যক্তিত্ব। ভারতের পর্দায় ‘ধুরন্ধর’ ধরনের প্রবল পরাক্রমী নায়কদের পাশে দাঁড় করালে স্পাইডার-ম্যানকে বরং নিতান্তই ছাপোষা বলে মনে হতে পারে। অথচ সেই মুখোশধারী ‘ছোট মানুষ’-ই ভারতে এমন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন যে, তাঁর সর্বশেষ ছবি স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে বক্স অফিসে একের পর এক নজির গড়ছে।
স্পাইডার-ম্যানের আসল পরিচয়ই যেন ‘সাধারণ মানুষ’। কুইন্সের পিটার পার্কার ধনী নন। তাঁর ব্যক্তিগত বিমান নেই, বিরাট প্রাসাদ নেই, ব্যাটম্যানের মতো প্রযুক্তিতে ঠাসা গোপন আস্তানাও নেই। সুপারহিরো হয়ে ওঠার পরেও তাঁর পোশাকের মধ্যে রাজকীয়তার চেয়ে বেশি আছে ছাপোষা সরলতা—গায়ে আঁটসাঁট এক পোশাক, মুখে যেন বাড়িতে বানানো মুখোশ।
ব্র্যান্ড নিউ ডে-তে ইয়েলেনা বেলোভা, অর্থাৎ ফ্লোরেন্স পিউ, সেই চেহারা নিয়েই তাঁকে ব্যঙ্গ করে বলেন, “শিশু আলুর মতো।” মজার বিষয় হল, সেই ‘বেবি পটেটো’-ই ভারতের বক্স অফিসে এখন রীতিমতো পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের সঙ্গে স্পাইডার-ম্যানের প্রেম অবশ্য আজকের নয়। ২০০২ সালে টোবি ম্যাগুয়্যার অভিনীত প্রথম স্পাইডার-ম্যান এ দেশে ১০ লক্ষ ডলারের বেশি ব্যবসা করা প্রথম হলিউড ছবি হয়ে নজির গড়েছিল। ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি, তামিল ও তেলুগু ভাষায় প্রায় ২৫০টি পর্দায় মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। সেই সময় কোনও হলিউড ছবির জন্য এত বড় মাপের মুক্তি কার্যত নজিরবিহীন ছিল।
এর পর টোবি ম্যাগুয়্যারের জায়গায় এলেন অ্যান্ড্রু গারফিল্ড, তারপর টম হল্যান্ড। বদলেছে অভিনেতা, বদলেছে গল্পের আবহ, এসেছে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন প্রজন্ম। কিন্তু ভারতীয় দর্শকের সঙ্গে স্পাইডার-ম্যানের সম্পর্ক বরং আরও গভীর হয়েছে।
আর ব্র্যান্ড নিউ ডে যেন সেই জনপ্রিয়তার নতুন মাপকাঠি। টম হল্যান্ড অভিনীত চতুর্থ একক স্পাইডার-ম্যান ছবি ভারতে ৫০০ কোটি টাকার ব্যবসা করা প্রথম হলিউড ছবি হয়ে উঠেছে—মুক্তির মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই। ভারতীয় বাজারে পিছনে পড়েছে অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম এবং অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার-এর মতো বিশাল বাজেটের ছবি। বিশ্বজুড়েও মাত্র ছয় দিনে ছবিটি ১০০ কোটি ডলারের ব্যবসা পেরিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—ভারতীয় দর্শক স্পাইডার-ম্যানকে এত আপন করে নিলেন কেন?
উত্তরটা সম্ভবত তাঁর সুপারপাওয়ারে নয়, সাধারণত্বে।
পিটার পার্কার দেবতা নন। তাঁর বাড়িভাড়া দিতে হয়, পড়াশোনা করতে হয়, চাকরি নিয়ে ভাবতে হয়, প্রেমে পড়তে হয়, পরিবার ও সম্পর্ক সামলাতে হয়। দুনিয়াকে বাঁচানোর পরেও পরের দিন তাঁকে সময়মতো কলেজে পৌঁছতে হয়। তিনি ভুল করেন, হেরে যান, আঘাত পান, প্রিয়জনকে হারান এবং নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি ভোগ করেন।
এই জীবনযুদ্ধ ভারতীয় তরুণের কাছে খুব একটা অপরিচিত নয়।
স্পাইডার-ম্যানের সবচেয়ে বড় শক্তিও তাই তাঁর জাল ছোড়ার ক্ষমতা নয়, দায়িত্ববোধ। “বিপুল ক্ষমতার সঙ্গে আসে বিপুল দায়িত্ব”—এই দর্শন ভারতীয় পারিবারিক সংস্কৃতির সঙ্গেও আশ্চর্য রকম সহজে মিশে যায়। নিজের ইচ্ছার পাশাপাশি পরিবার, সম্পর্ক ও সমাজের দায়িত্ব সামলানোর চাপ এ দেশের অসংখ্য তরুণের জীবনের অংশ। পিটার পার্কারও সেই একই দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে থাকা এক তরুণ।
তার উপর রয়েছে মুখোশ। সেটিই হয়তো স্পাইডার-ম্যানের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক শক্তি। মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষটিকে বাইরে থেকে চেনা যায় না। তিনি শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, ভারতীয়—যে কেউ হতে পারেন। ফলে পর্দায় তাঁকে দেখে দর্শকের পক্ষে নিজের মুখ বসিয়ে নেওয়া সহজ।
ভারতের আঞ্চলিক ভাষায় ডাবিং, টেলিভিশনে নিয়মিত সম্প্রচার, কমিক্স, খেলনা ও অ্যানিমেশনের বিস্তার সেই সম্পর্ককে আরও শক্ত করেছে। প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু স্পাইডার-ম্যানের সঙ্গে পরিচয় থেকে গেছে।
ব্র্যান্ড নিউ ডে সেই পুরনো জাদুতেই ফিরেছে। মহাবিশ্বের অসংখ্য বিকল্প বাস্তবতা কিংবা বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের বদলে ছবির কেন্দ্রে রয়েছে এক নিঃসঙ্গ তরুণের জীবনসংগ্রাম। নো ওয়ে হোম-এর ঘটনার পর পৃথিবী পিটার পার্কারকে ভুলে গিয়েছে। তাই তাঁর নতুন লড়াই শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে নয়—নিজের পরিচয়, শোক এবং একাকিত্বের বিরুদ্ধেও।
ভারতীয় সিনেমায় নায়ক সাধারণত পর্দায় আসেন ঝড় তুলে। স্পাইডার-ম্যানের আবার বাস মিস হয়, পকেট ফাঁকা থাকে, প্রেমিকার সামনে কথা আটকে যায়। কখনও শহর বাঁচানোর মাঝেও নিজের জীবনটা গুছিয়ে উঠতে পারেন না।
সম্ভবত সেখানেই তাঁর আসল জাদু।
দর্শক তাঁর মধ্যে কোনও দূরের মহাপুরুষকে দেখেন না। দেখেন নিজেদেরই একটু বেশি সাহসী, একটু বেশি দায়িত্ববান, আর একটু বেশি আশাবাদী সংস্করণকে।
তাই ফ্লোরেন্স পিউয়ের দেওয়া সেই মজার তকমাটাই যেন আজ উল্টো গর্বের—‘শিশু আলু’ ছোট হোক, ভারতের বক্স অফিসে তার ক্ষুধা কিন্তু বিশাল!
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



