বিজ্ঞাপন, না ফাঁকি?

যা জানা জরুরি
- মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের নোটিসে ফের সামনে এসেছে পুরনো প্রশ্ন—বিজ্ঞাপনের সীমা কোথায় শেষ, আর নিষিদ্ধ পণ্যের প্রচারই বা কোথা থেকে শুরু?
- বিমল এলাচির বিজ্ঞাপন ঘিরে শাহরুখ খান ও অজয় দেবগনকে নোটিস পাঠানোর পর ‘ছায়া-বিজ্ঞাপন’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
- প্রবীণ বিজ্ঞাপন-চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং জেনেসিস ফিল্ম প্রোডাকশনের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক প্রহ্লাদ কক্করের মতে, ছায়া-বিজ্ঞাপন আসলে আইনের ফাঁক গলে নিষিদ্ধ পণ্যের ব্র্যান্ড-পরিচিতি ধরে রাখার কৌশল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের নোটিসে ফের সামনে এসেছে পুরনো প্রশ্ন—বিজ্ঞাপনের সীমা কোথায় শেষ, আর নিষিদ্ধ পণ্যের প্রচারই বা কোথা থেকে শুরু? বিমল এলাচির বিজ্ঞাপন ঘিরে শাহরুখ খান ও অজয় দেবগনকে নোটিস পাঠানোর পর ‘ছায়া-বিজ্ঞাপন’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রবীণ বিজ্ঞাপন-চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং জেনেসিস ফিল্ম প্রোডাকশনের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক প্রহ্লাদ কক্করের মতে, ছায়া-বিজ্ঞাপন আসলে আইনের ফাঁক গলে নিষিদ্ধ পণ্যের ব্র্যান্ড-পরিচিতি ধরে রাখার কৌশল। তাঁর কথায়, এটি ‘‘মূলত প্রতারণামূলক এবং অনৈতিক’’। তাঁর মতে, ক্রেতার অবচেতন মনে প্রভাব ফেলতেই সংস্থাগুলি এই পথ বেছে নেয়।
ছায়া কেন?
মদ বা তামাকজাত পণ্যের সরাসরি বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। তাই একই নামে এলাচ, সোডা, জল, সুগন্ধি, গানের সংকলন কিংবা অন্য বৈধ পণ্য বাজারে আনে সংস্থাগুলি। বিজ্ঞাপনে সামনে থাকে সেই নিরীহ পণ্য, কিন্তু আড়ালে থেকে যায় নিষিদ্ধ পণ্যের ব্র্যান্ড।
অর্থাৎ, বোতল বদলালেও ব্র্যান্ডের গল্প বদলায় না।
সুপারফ্লাই ফিল্মসের প্রতিষ্ঠাতা এবং কান লায়ন্সের প্রাক্তন বিচারক কোপাল নাইথানির মতে, সংস্থাগুলি আসলে তাদের ক্লাব সোডার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করতে চাইছে না। বিজ্ঞাপনের আসল বার্তা দর্শকের কাছে পৌঁছয় অন্য স্তরে। তবে তাঁর মতে, এই ধরনের প্রচার অপ্রাপ্তবয়স্কদের কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে; প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের পছন্দ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যথেষ্ট বিচক্ষণ।
পণ্য নয়, বিক্রি হয় স্বপ্ন
নিষিদ্ধ পণ্যকে সরাসরি দেখানো যাবে না। তাই বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় তার চারপাশের জগৎ—তারকা, সাফল্য, বিলাসিতা, রাতের জীবন, সঙ্গীত, আত্মবিশ্বাস কিংবা একটু ‘বিদ্রোহী’ মনোভাব।
কক্করের মতে, নিষিদ্ধ জিনিসকে ঘিরে মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহলই বিজ্ঞাপনের শক্তি হয়ে ওঠে। ‘যেটা নিষিদ্ধ, সেটায় এমন কী আছে?’—এই প্রশ্নই আকর্ষণ বাড়ায়। বিশেষ করে যাঁরা আগে থেকেই ওই ব্র্যান্ডের সঙ্গে পরিচিত, তাঁদের মনে সেই সংযোগ আরও সহজে তৈরি হয়।
ফলে বিজ্ঞাপনটি আর শুধু কোনও এলাচ বা সোডার কথা বলে না। সেটি আসলে একটি জীবনযাপনের স্বপ্ন বিক্রি করে।
ব্র্যান্ড থাকে, পণ্য হারায়
ছায়া-বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই, যখন বিজ্ঞাপনে মূল পণ্যটি প্রায় অদৃশ্য থেকেও ব্র্যান্ডটি মানুষের মনে স্পষ্ট হয়ে থাকে।
একজন তারকা, একটি নির্দিষ্ট সুর, বিলাসবহুল পার্টি, সাফল্যের ছবি কিংবা স্বাধীনচেতা জীবনযাপন—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক ব্র্যান্ড-পরিচয়, যার সঙ্গে মূল পণ্যের নাম দর্শকের মনে নিজে থেকেই জুড়ে যায়।
কক্করের মতে, বিজ্ঞাপনের এই অবচেতন বার্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অল্পবয়সি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এই কৌশল কার্যকর হতে পারে।
তিনি মনে করেন, কোনও ব্র্যান্ডের প্রচার যত বেশি ‘নিষিদ্ধ’ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলে মনে হয়, একটি নির্দিষ্ট তরুণ শ্রেণির কাছে সেটি তত বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এত ঝলমলে কেন?
কারণ সরাসরি পণ্য দেখানো যাচ্ছে না।
তাই দেখানো হয় তারকা। তৈরি করা হয় আভিজাত্যের আবহ। যোগ করা হয় সাফল্য, রোমাঞ্চ, স্বাধীনতা, রাতের বিনোদন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার গল্প। উদ্দেশ্য একটাই—পণ্যটিকে আড়াল করে তার আকর্ষণটুকু সামনে রাখা।
নাইথানি এই কৌশলকে গল্প বলার ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করেন। একটি সুগন্ধি মূলত বোতলে থাকা সুগন্ধযুক্ত তরল। কিন্তু বিজ্ঞাপনের গল্প তাকে মর্যাদা, কামনা ও পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত করতে পারে। ছায়া-বিজ্ঞাপনও একই ভাবে মূল পণ্যের রহস্য ও আকর্ষণ ধার করে নিজের কাহিনি তৈরি করে।
এলাচ থেকে সোডা, গল্প একই
মদের সরাসরি বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা আসার পর বিভিন্ন ব্র্যান্ড বিকল্প পণ্য সামনে এনেছে। কখনও এলাচ, কখনও সোডা, কখনও জল, আবার কখনও গান বা সঙ্গীতের সংকলন।
ম্যাকডাওয়েলস নম্বর ওয়ানের ‘মেরা নম্বর ওয়ান ইয়ার’ প্রচারে যেমন বন্ধুত্বকে সামনে আনা হয়েছিল, তেমনই কিংফিশারের ‘দ্য কিং অব গুড টাইমস’ তৈরি করেছিল আনন্দ, বিলাসিতা ও উচ্ছ্বাসে ভরা এক জীবনযাপনের ছবি।
বিজ্ঞাপনে হয়তো মদের বোতল নেই, কিন্তু ব্র্যান্ডের মেজাজটা ঠিকই থেকে যায়।
আইনের ফাঁকেই আসল খেলা
সমস্যাটা এখানেই। কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিজ্ঞাপনে হুইস্কির বোতল দেখানো বন্ধ করতে পারে। কিন্তু সেই ব্র্যান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাফল্য, সঙ্গীত, নৈশজীবন, আভিজাত্য কিংবা উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছবি মুছে ফেলবে কীভাবে?
কক্করের মতে, এখানেই নীতি ও আইনের দ্বন্দ্ব। তাঁর প্রশ্ন, কোনও পণ্য যদি সত্যিই জনস্বাস্থ্যের পক্ষে এতটা ক্ষতিকর হয়, তা হলে সেটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হোক। আর যদি তা না করা হয়, তবে ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তাঁদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।
শুধু বিজ্ঞাপন বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেই মনে করেন তিনি। কারণ নিষেধাজ্ঞার ফাঁক খুঁজে সংস্থাগুলি নতুন নামে, নতুন পণ্যের মোড়কে একই ব্র্যান্ড-পরিচিতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
নিষেধাজ্ঞাই কি আকর্ষণ বাড়ায়?
কক্করের মতে, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কাছে নিষিদ্ধ জিনিসের আকর্ষণ বরাবরই থাকবে। সময়ের সঙ্গে ছায়া-বিজ্ঞাপনও তাই আরও পরিশীলিত হয়েছে। সরাসরি পণ্যের বদলে এখন সেখানে বিক্রি হয় সাহস, বিদ্রোহ, স্বাধীনতা, সাফল্য এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
আর প্রচারের জায়গাটাও বদলে যাচ্ছে। টেলিভিশন বা সংবাদমাধ্যমের বাইরে এখন সমাজমাধ্যম, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে মানুষ বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট দেখছে। ফলে ব্র্যান্ডের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ধরে রাখার পথও হয়ে উঠছে আরও বিস্তৃত।
এবার মঞ্চে সংস্কৃতি
ছায়া-বিজ্ঞাপন এখন আর শুধু এলাচ বা সোডার বোতলে আটকে নেই। সঙ্গীত উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতা, শিল্পী ও গায়কদের সঙ্গে অংশীদারি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া—ব্র্যান্ডের উপস্থিতি ছড়িয়ে পড়ছে আরও নানা ক্ষেত্রে।
নাইথানির মতে, লক্ষ্য শুধু ব্র্যান্ডকে মনে করিয়ে দেওয়া নয়; তাকে সংস্কৃতির অংশ করে তোলা।
র্যাপশিল্পীর সঙ্গে কাজ করা, রক কনসার্টের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হওয়া কিংবা জনপ্রিয় তারকার সঙ্গে জুড়ে যাওয়া—এসবের মাধ্যমে একটি ব্র্যান্ড আর শুধু পণ্য হিসেবে থাকে না। ধীরে ধীরে সেটি হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট জীবনযাপন, মনোভাব এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।
আর সেখানেই ছায়া-বিজ্ঞাপনের আসল জাদু—পণ্যটি চোখের আড়ালে, কিন্তু ব্র্যান্ডটি ঠিকই চোখে পড়ে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



