বাংলাস্ফিয়ার: ব্রিটিশদের প্রশ্রয় ও শোষণ—দুইয়েরই শিকার হয়েছিল ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলি। ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনেও তারা একধরনের সীমিত স্বশাসন ভোগ করত। স্বাধীনতার প্রাক্কালে এই রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করাই হয়ে উঠেছিল নতুন দেশের সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পরেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে দেশীয় রাজ্যগুলির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা জরুরি। অবশ্য ত্রিশের দশকের শেষ দিকেই কংগ্রেস জানিয়ে দিয়েছিল, এই রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করাই তাদের লক্ষ্য।

১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের হরিপুরা অধিবেশনে সেই উদ্দেশ্য স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছিল—“ভারতের অন্য অংশের মতো দেশীয় রাজ্যগুলিতেও একই রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে কংগ্রেস। কংগ্রেস মনে করে, দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।”

এই সংযুক্তিকরণের কাজ পরিচালনার জন্য নতুন একটি ‘দেশীয় রাজ্য দফতর’ গঠন করা হয়। তার দায়িত্বে ছিলেন সর্দার বল্লভভাই পটেল এবং সচিব ছিলেন ভি পি মেনন। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের নির্দেশনা ও সহযোগিতায় রাজাদের বুঝিয়ে, প্রয়োজনে চাপ দিয়ে এবং নানা সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে রাজি করানোর দায়িত্ব পড়েছিল তাঁদের উপর।

বিকানের, বরোদা এবং রাজস্থানের আরও কয়েকটি দেশীয় রাজ্য প্রথম দিকেই ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু বেশ কয়েকটি রাজ্য ভারতের সঙ্গে হাত মেলাতে একেবারেই রাজি ছিল না। কেউ মনে করেছিল, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের এটাই সর্বোত্তম সুযোগ। আবার কেউ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়েছিল।

কাশ্মীর ও হায়দ্রাবাদের ঘটনা বহুল আলোচিত। তবে এগুলি ছাড়াও কয়েকটি দেশীয় রাজ্য ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ভারতভুক্তির প্রশ্নে অনড় ছিল।

১. ত্রিবাঙ্কুর

দক্ষিণ ভারতের সমুদ্রতীরবর্তী ত্রিবাঙ্কুরই ছিল ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে অস্বীকার করা প্রথম দেশীয় রাজ্যগুলির অন্যতম। তারা কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্বকেও প্রকাশ্যে প্রশ্ন করেছিল। সামুদ্রিক বাণিজ্যের দিক থেকে রাজ্যটির অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবসম্পদ ও খনিজ সম্পদেও ত্রিবাঙ্কুর ছিল সমৃদ্ধ।

ত্রিবাঙ্কুরের দেওয়ান স্যার সি পি রামস্বামী আইয়ার পেশায় ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। ১৯৪৬ সালের মধ্যেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ত্রিবাঙ্কুর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তবে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করতে স্বাধীন ত্রিবাঙ্কুরের আপত্তি থাকবে না।

ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, ত্রিবাঙ্কুরের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষার পিছনে মহম্মদ আলি জিন্নার উৎসাহও ছিল। স্যার সি পি রামস্বামী আইয়ারের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের গোপন যোগাযোগ ছিল বলেও মনে করা হয়। ব্রিটেন স্বাধীন ত্রিবাঙ্কুরের ধারণাকে সমর্থন করেছিল মূলত একটি বিশেষ খনিজের কারণে।

ত্রিবাঙ্কুরে প্রচুর পরিমাণে ‘মোনাজাইট’ পাওয়া যেত। পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য এই খনিজের একচেটিয়া জোগান নিজেদের হাতে রাখতে চেয়েছিল ব্রিটেন।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত দেওয়ান তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন। কিন্তু কেরল সোশ্যালিস্ট পার্টির এক সদস্যের ছুরি হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচার পরে তিনি মত পরিবর্তন করেন। অবশেষে ১৯৪৭ সালের ৩০ জুলাই ত্রিবাঙ্কুর ভারতে যোগ দেয়।

২. যোধপুর

হিন্দু রাজা এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও রাজপুত দেশীয় রাজ্য যোধপুর পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকেছিল। এই কারণেই যোধপুরের ঘটনাটি ছিল বেশ অস্বাভাবিক।

মহারাজা হনবন্ত সিংহ প্রথমে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু কোনও এক পর্যায়ে তাঁর ধারণা হয়, পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে হয়তো তাঁর রাজ্য বেশি লাভবান হবে। কারণ যোধপুরের সীমান্ত নবগঠিত পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

জিন্নাও যোধপুরের মহারাজাকে পাকিস্তানে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করেছিলেন। তিনি করাচি বন্দরে পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সামরিক সহায়তা ও কৃষিক্ষেত্রে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

যোধপুর পাকিস্তানে যোগ দিতে পারে—এই খবর পেয়ে বল্লভভাই পটেল দ্রুত মহারাজার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনিও যোধপুরকে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে একটি মুসলিম রাষ্ট্রে যোগ দিলে হিন্দুপ্রধান যোধপুরকে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে, তা বুঝিয়ে বলেন। শেষ পর্যন্ত যোধপুরের মহারাজাকে ভারতের পক্ষে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।

রামচন্দ্র গুহ তাঁর ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী গ্রন্থে লিখেছেন, মহারাজার সামনে ভারতভুক্তির চুক্তিপত্র রাখা হলে তিনি নাটকীয় ভাবে একটি রিভলভার বার করে সচিবের মাথায় তাক করেন। বলেন, “আমি আপনার নির্দেশ মেনে নেব না।” তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি শান্ত হন এবং ভারতভুক্তির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।

৩. ভোপাল

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে চাওয়া আর একটি দেশীয় রাজ্য ছিল ভোপাল। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু হলেও শাসক ছিলেন মুসলিম নবাব হামিদুল্লাহ খান।

মুসলিম লীগের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নবাব হামিদুল্লাহ কংগ্রেসের শাসনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভোপালকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁর সিদ্ধান্ত।

মাউন্টব্যাটেন তাঁকে চিঠিতে জানান, “কোনও শাসক তাঁর নিকটতম অধিরাজ্যকে এড়িয়ে পালিয়ে যেতে পারেন না।”

১৯৪৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নবাব বুঝতে পারেন, বিপুল সংখ্যক দেশীয় রাজ্য ইতিমধ্যেই ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে শেষ পর্যন্ত তিনিও অন্য রাজাদের পথ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

৪. জুনাগড়

হায়দ্রাবাদ ছাড়াও ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ না দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল জুনাগড়। কাথিয়াওয়াড় অঞ্চলের দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে জুনাগড়ই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যার উপর শাসন করতেন একজন মুসলিম নবাব—মহম্মদ মহবৎ খানজি তৃতীয়।

১৯৪৭ সালের ২৫ জুলাই লর্ড মাউন্টব্যাটেন দেশীয় রাজাদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই সময় জুনাগড়ের দেওয়ান স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তিনি নবাবকে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেবেন।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের গোড়ার দিকে জুনাগড়ের দেওয়ান নবী বক্‌শ মুসলিম লীগের স্যার শাহনওয়াজ ভুট্টোকে রাজ্যের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তৎকালীন দেওয়ানের অনুপস্থিতিতে ভুট্টো দেওয়ানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নবাবকে পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন।

পাকিস্তান জুনাগড়ের অন্তর্ভুক্তির আবেদন গ্রহণ করলে ভারতের নেতারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। ভৌগোলিক ভাবে জুনাগড়ের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনও স্থলসীমান্ত ছিল না। অথচ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এই রাজ্যের নবাব পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

জুনাগড়ের অশান্ত পরিস্থিতির কারণে রাজ্যের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত নবাব করাচিতে পালিয়ে যান।

বল্লভভাই পটেল জুনাগড়ে গণভোট আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের কাছে দাবি জানান। পরে জুনাগড়ের অধীন তিনটি প্রধান ভূখণ্ডকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করতে তিনি সেনা পাঠান।

অর্থ ও সামরিক শক্তির তীব্র ঘাটতির মুখে পড়ে দেওয়ান শেষ পর্যন্ত ভারতের কাছে প্রশাসনের দায়িত্ব তুলে দিতে বাধ্য হন।

অবশেষে ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জুনাগড়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেই গণভোটে অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৯১ শতাংশ ভারতের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন।