Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: আবারও জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে দিল্লির রাজপথ। কথিত নিট (NEET) প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে যন্তর মন্তরে জমছে ভিড়।
জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’-এর ডাক থেকে অন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, নির্ভয়া-কাণ্ডের প্রতিবাদে দেশজোড়া ক্ষোভ, কিংবা কৃষক আন্দোলন—যার চাপে শেষ পর্যন্ত তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল কেন্দ্র—দিল্লি বারবার এমন সব গণআন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে, যার প্রভাব রাজধানীর গণ্ডি ছাড়িয়ে বদলে দিয়েছে জাতীয় রাজনীতি, আইন এবং জনমত।
স্বাধীনতার পর দিল্লিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন, তাদের প্রেক্ষাপট এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এক নজরে।
জেপি আন্দোলন বা ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ (১৯৭৪–৭৫)
১৯৭৪ সালে বিহারে ছাত্রদের নেতৃত্বে দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূচনা হয়, তা পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন প্রবীণ সমাজবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ, যিনি ‘জেপি’ নামেই অধিক পরিচিত।
পুলিশের গুলিচালনা এবং হাজার হাজার আন্দোলনকারীর গ্রেফতারের পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। জেপি ছাত্রদের ক্লাস বয়কটের আহ্বান জানান, বিহার বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার দাবি তোলেন এবং অহিংস গণআন্দোলনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেন।
আন্দোলন দ্রুত দিল্লিকে রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। ১৯৭৫ সালের জুনে রামলীলা ময়দানে জেপির বিশাল জনসভা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে।
এই জনসভার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, ২৫ জুন ১৯৭৫-এর রাতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। নাগরিক অধিকার স্থগিত করা হয়, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ চাপানো হয় এবং জেপি-সহ বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার করা হয়।
১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পর জেপির নৈতিক নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলি একজোট হয়ে জনতা পার্টি গঠন করে। সাধারণ নির্বাচনে তারা কংগ্রেসকে পরাজিত করে এবং স্বাধীনতার পর প্রথমবার কেন্দ্রে অ-কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়।
এই আন্দোলন ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
মণ্ডল কমিশনবিরোধী আন্দোলন (১৯৯০)
১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করার ঘোষণা দেন। এর ফলে মোট সংরক্ষণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯.৫ শতাংশ।
১৯৭৯ সালে গঠিত মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্তকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানানো হলেও, বহু ছাত্রছাত্রী ও উচ্চবর্ণের যুবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। তাঁদের অভিযোগ ছিল, সংরক্ষণ ব্যবস্থা মেধার মূল্য কমিয়ে দিচ্ছে এবং চাকরির সুযোগ সীমিত করছে।
উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, আর দিল্লি হয়ে ওঠে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজীব গোস্বামীর আত্মাহুতির চেষ্টা। তাঁর আত্মদাহের প্রচেষ্টা আন্দোলনের প্রতীকী চিত্রে পরিণত হয়।
যদিও সংরক্ষণ নীতি প্রত্যাহার করা যায়নি, এই আন্দোলন ভারতের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ওবিসি-ভিত্তিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে এবং প্রতিনিধিত্ব, সমতা ও মেধা নিয়ে জাতীয় বিতর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
অন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন (২০১১)
কমনওয়েলথ গেমস-সহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষুব্ধ জনমতের প্রেক্ষাপটে সমাজকর্মী অন্না হাজারে শক্তিশালী জন লোকপাল আইনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
তিনি এমন একটি স্বাধীন লোকপাল প্রতিষ্ঠার দাবি জানান, যার হাতে রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা থাকবে। পাশাপাশি সরকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ খসড়া কমিটি গঠনেরও দাবি ওঠে।
সরকার প্রাথমিকভাবে সেই দাবি না মানায় ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল তিনি যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেন। পরে আগস্টে রামলীলা ময়দানে দ্বিতীয় দফার অনশন শুরু হলে আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
ক্রমবর্ধমান জনচাপের মুখে সরকার যৌথ খসড়া কমিটি গঠনে রাজি হয়। পরবর্তীকালে সংসদে লোকপাল বিল নিয়ে আলোচনা হয় এবং ২০১৩ সালে লোকপাল ও লোকায়ুক্ত আইন পাস হয়। যদিও বহু আন্দোলনকারী মনে করেন, আইনটি মূল জন লোকপাল প্রস্তাবের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল ছিল।
এই আন্দোলনের আর একটি বড় রাজনৈতিক ফল ছিল অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে ২০১২ সালে আম আদমি পার্টির (আপ) জন্ম, যা পরে দিল্লির রাজনীতির চেহারা বদলে দেয়।
নির্ভয়া আন্দোলন (২০১২–১৩)
২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ দিল্লিতে চলন্ত বাসে ২৩ বছর বয়সি এক তরুণীর ওপর নৃশংস গণধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা গোটা দেশকে স্তম্ভিত করে দেয়।
তরুণী মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার সময় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী, নারী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ ইন্ডিয়া গেট, রাইসিনা হিল ও যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভে শামিল হন।
জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও পুলিশি বাধা সত্ত্বেও আন্দোলন থামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং নারীদের নিরাপত্তা জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
সরকার বিচারপতি জে. এস. বর্মার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৩ সালের ফৌজদারি আইন সংশোধন করা হয়। যৌন অপরাধের সংজ্ঞা বিস্তৃত হয় এবং ধর্ষণের ফলে মৃত্যু বা স্থায়ী উদ্ভিজ্জ অবস্থার সৃষ্টি হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত হয়।
এছাড়া গঠিত হয় ‘নির্ভয়া তহবিল’, চালু হয় দিল্লির ১৮১ নারী হেল্পলাইন এবং নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
২০২০ সালে চার দোষীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার ছিল—ভারতে নারী নিরাপত্তা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নিয়ে জনপরিসরের আলোচনাকে আমূল বদলে দেওয়া।
সিএএ-বিরোধী আন্দোলন (২০১৯)
২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর সংসদে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা সিএএ পাস হওয়ার পর দিল্লি আবারও বৃহৎ গণআন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এই আইনে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার দ্রুততর সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু মুসলমানদের এই তালিকার বাইরে রাখায় এবং দেশজুড়ে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) চালুর সম্ভাবনা ঘিরে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্রদের আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শাহিনবাগে মহিলাদের নেতৃত্বে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান-বিক্ষোভ আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
দেশজুড়ে ছাত্রছাত্রী, নাগরিক সমাজ, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নেন। নাগরিকত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক সমতার প্রশ্নে জাতীয় বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়।
যদিও আইনটি প্রত্যাহার হয়নি, তবু চার বছরের বেশি সময় পরে, ২০২৪ সালের মার্চে এর বিধি জারি হয় এবং মে মাসে নাগরিকত্ব প্রদান শুরু হয়। সেই সময় নিয়েও বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে।
এই আন্দোলন প্রমাণ করে, সংগঠিত নাগরিক প্রতিবাদ গণতন্ত্রে জনমত গঠনের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
কৃষক আন্দোলন (২০২০–২১)
২০২০ সালে কেন্দ্র সরকার কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তিনটি কৃষি আইন পাশ করে। সরকারের দাবি ছিল, এতে কৃষকের বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে।
কিন্তু পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বহু কৃষক সংগঠনের আশঙ্কা ছিল, এতে ধীরে ধীরে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) ব্যবস্থা দুর্বল হবে এবং কর্পোরেট সংস্থার প্রভাব বাড়বে।
নভেম্বর ২০২০-এ ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। দিল্লিতে প্রবেশে বাধা পেয়ে হাজার হাজার কৃষক সিংঘু, টিকরি ও গাজীপুর সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান শুরু করেন।
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনে ভারত বন্ধ, রেল রোকো এবং ট্র্যাক্টর মিছিলের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়। দেশ-বিদেশে এই আন্দোলন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অবশেষে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন এবং পরে সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনগুলি বাতিল হয়।
গণআন্দোলনের চাপে কেন্দ্রের বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের বিরল নজির হিসেবে কৃষক আন্দোলন ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও কৃষক সংগঠনগুলির ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি নিশ্চয়তাসহ একাধিক দাবি এখনও অমীমাংসিত, এই আন্দোলন দেখিয়ে দেয়—দীর্ঘস্থায়ী, সংগঠিত এবং শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন জাতীয় নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবাদের রাজধানী
ইতিহাস বলছে, প্রতিটি আন্দোলন তাৎক্ষণিকভাবে নীতি বা আইন বদলাতে না পারলেও, অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদে জনমত, প্রশাসন এবং গণতান্ত্রিক চর্চায় গভীর প্রভাব রেখে গেছে।
‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’-এর ডাক থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, নারী নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের প্রশ্ন কিংবা কৃষকের অধিকার—দিল্লি বারবার দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের প্রধান মঞ্চে পরিণত হয়েছে। নিট প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেটিও সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।