বাংলাস্ফিয়ার: অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুমের পরও সারাদিন ক্লান্ত, অবসন্ন বা ঝিমুনি অনুভব করেন। শুধু ঘুমের অভাবই এর কারণ নয়। জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ঘরের পরিবেশ, এমনকি অন্ত্রের স্বাস্থ্যের মতো নানা বিষয়ও শরীরের শক্তি কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি ছোট পরিবর্তনেই এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
১. শোবার ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস ঢুকছে না
বন্ধ জানালা-দরজার ঘরে রাতভর কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে গভীর ঘুম ব্যাহত হতে পারে এবং সকালে উঠে ক্লান্তি অনুভূত হয়। তাই অন্তত সামান্য হলেও জানালা খোলা রাখুন।
২. শরীরে ক্রিয়েটিনের ঘাটতি
ক্রিয়েটিন শুধু শরীরচর্চাকারীদের জন্য নয়। এটি কোষে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। বয়স বাড়লে শরীরে শক্তি তৈরির ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক, নিরামিষভোজী ও নিয়মিত ব্যায়ামকারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ক্রিয়েটিন উপকারী হতে পারে।
৩. দিনের আলোয় কম সময় কাটানো
প্রাকৃতিক আলো শরীরের জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমকে ঠিক রাখে। সকালে বা দিনের বেলায় কিছুটা সময় বাইরে কাটালে রাতে ভালো ঘুম হয় এবং দিনের ক্লান্তিও কমে।
৪. খাদ্যে আঁশের অভাব
আঁশসমৃদ্ধ খাবার রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করে এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় ডাল, শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, বীজ ও বাদাম রাখুন।
৫. ঘুম হচ্ছে, কিন্তু বিশ্রাম হচ্ছে না
আট ঘণ্টা ঘুমালেও মানসিক বিশ্রাম না পেলে ক্লান্তি থেকেই যায়। সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকার প্রবণতা কমিয়ে কিছু সময় নীরবে বসে থাকা, বই পড়া, প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো বা পোষ্য প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক পুনরুজ্জীবনে সাহায্য করে।
৬. রঙিন ফল ও সবজি কম খাওয়া
বেরি, স্ট্রবেরি, বেগুনি রঙের ফল-সবজি, চা, কফি, ডার্ক চকলেট ও বিভিন্ন মশলায় থাকা পলিফেনল মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে সাহায্য করে। এগুলো মানসিক ক্লান্তি কমাতে কার্যকর হতে পারে।
৭. মাথার চিন্তা মাথাতেই রেখে ঘুমাতে যাওয়া
অনেকেরই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় অসমাপ্ত কাজের চিন্তায়। সন্ধ্যায় পরদিনের কাজের তালিকা লিখে রাখলে মস্তিষ্ক অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকে এবং ঘুমের মান বাড়ে।
৮. রাতে দেরি করে ভারী খাবার খাওয়া
ঘুমানোর ঠিক আগে মাংস বা চর্বিযুক্ত ভারী খাবার খেলে হজমের জন্য শরীরকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। ফলে গভীর ঘুম ব্যাহত হয়। রাতের খাবার হালকা রাখাই ভালো।
৯. কোষ্ঠকাঠিন্য
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে তা ক্লান্তি ও অবসন্নতার কারণ হতে পারে। পর্যাপ্ত আঁশ, পানি এবং গবেষণায় উল্লেখিত কিউই ফল অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
১০. অতিরিক্ত প্রোটিন, কম শর্করা
অনেকে ওজন কমানোর জন্য শর্করা প্রায় বাদ দিয়ে শুধু প্রোটিন খান। কিন্তু শরীরের প্রধান শক্তির উৎস শর্করা। তাই সুষম খাদ্যে শাকসবজি, শর্করা, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি—সবই থাকা উচিত।
১১. বিছানাপত্র পরিষ্কার নয়
ধুলোকণা, ডাস্ট মাইট বা সুগন্ধিযুক্ত ডিটারজেন্টের কারণে অ্যালার্জি ও অজান্তেই বারবার ঘুম ভাঙতে পারে। তাই প্রতি সপ্তাহে বিছানার চাদর ধোয়া, গদি-বালিশ পরিষ্কার রাখা এবং সকালে কিছুক্ষণ বিছানা বাতাসে মেলে রাখা উপকারী।
১২. সারাদিন বসে থাকা
একটানা বসে থাকলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং ক্লান্তি বাড়ে। প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর অন্তত দুই মিনিট দাঁড়িয়ে হাঁটাচলা করলে শরীরে শক্তি ফিরে আসে। দুপুরের খাবারের পরে ১০ মিনিট হাঁটাও উপকারী।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি না কমে, তবে অবশ্যই রক্তপরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। আয়রন বা ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, কিংবা থাইরয়েডের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির অন্যতম কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা সব সময় অলসতার লক্ষণ নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে জীবনযাপনের ছোট ছোট ভুল বা চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক সমস্যা। সঠিক কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনলেই শক্তি ও কর্মক্ষমতা অনেকটাই ফিরে আসতে পারে।