আজকাল সামাজিক মাধ্যমে একটি শব্দ বারবার চোখে পড়ে— ভেগাস নার্ভ। কেউ বলছেন এটি সক্রিয় করতে পারলেই উদ্বেগ কমে যাবে, কেউ বলছেন শরীরের প্রদাহ দূর হবে, আবার কেউ দাবি করছেন কয়েক মিনিটের শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনেই জীবনের সব চাপ উধাও হয়ে যাবে।
বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল। আর সেই কারণেই আরও বেশি আকর্ষণীয়।
আপনি হয়তো খেয়ালই করেন না, কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার ঘাড়ের দুই পাশ দিয়ে একটি বিশাল তথ্য-যোগাযোগ ব্যবস্থা শরীরজুড়ে কাজ করে চলেছে। যখনই আপনি ধীরে, গভীরভাবে শ্বাস ছাড়েন, তখনই সেই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সক্রিয় হয়। এর নাম ভেগাস নার্ভ।
শরীরের তথ্য-মহাসড়ক
নাম শুনে মনে হতে পারে এটি একটি মাত্র স্নায়ু। কিন্তু বাস্তবে ভেগাস নার্ভ হলো প্রায় দুই লক্ষ স্নায়ুতন্তুর এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
মার্কিন গবেষক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী কেভিন জে. ট্রেসির ভাষায়, এটি মস্তিষ্ক থেকে শুরু হয়ে ঘাড় বেয়ে বুক ও উদর পর্যন্ত বিস্তৃত। পথিমধ্যে এটি হৃদ্পিণ্ড, ফুসফুস, অন্ত্র, যকৃত, অগ্ন্যাশয় এবং প্লীহার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
এই নেটওয়ার্কের প্রধান কাজ হলো মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা। আমরা সচেতনভাবে কিছু না করলেও এটি প্রতি মুহূর্তে হৃদ্স্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, হজম প্রক্রিয়া এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে চলে।
ধরা যাক, হঠাৎ আপনার হৃদ্স্পন্দন বেড়ে গেল। ভেগাস নার্ভ সেই পরিবর্তন শনাক্ত করে মস্তিষ্ককে খবর পাঠায়। মস্তিষ্ক তখন আবার একই স্নায়ুপথ ব্যবহার করে হৃদ্পিণ্ডকে ধীর হতে নির্দেশ দেয়।
অর্থাৎ শরীরের ভেতরে একটানা চলতে থাকা অসংখ্য বার্তার আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম এই ভেগাস নার্ভ।
চাপের সময় শরীরের ব্রেক প্যাডেল
আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা প্রায়ই দীর্ঘ সময় ধরে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ বা যুদ্ধ-অথবা-পালাও অবস্থায় থাকি।
কাজের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক মাধ্যমের অবিরাম উদ্দীপনা—সব মিলিয়ে শরীর যেন সারাক্ষণ সতর্ক অবস্থায় থাকে।
এই অবস্থায় হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হয়, কর্টিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরে প্রদাহজনিত কার্যকলাপও বাড়ে।
নিউ ইয়র্ক মেডিক্যাল কলেজের স্নায়ুবিজ্ঞানী মিল এতিয়েনের মতে, ভেগাস নার্ভ এই পরিস্থিতিতে শরীরের ‘ব্রেক প্যাডেল’ হিসেবে কাজ করে।
গাড়ির অ্যাক্সিলারেটর যেমন গতি বাড়ায়, তেমনই স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া শরীরকে উত্তেজিত করে। আর ভেগাস নার্ভ সেই গতিকে কমিয়ে শরীরকে ফিরিয়ে আনে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের অবস্থায়।
এ সময় হৃদ্স্পন্দন ধীর হয়, শ্বাস স্বাভাবিক হয়, কর্টিসলের মাত্রা কমে এবং প্রদাহও হ্রাস পায়।
যাদের ভেগাস নার্ভ কার্যকরভাবে কাজ করে, তাদের মধ্যে সাধারণত মানসিক স্থিতি বেশি দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় উচ্চ ভেগাল টোন।
অন্যদিকে নিম্ন ভেগাল টোন দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অতিরিক্ত প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভেগাস নার্ভের ব্যবহার
ভেগাস নার্ভ নিয়ে আগ্রহ কেবল সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানও বহু বছর ধরে এটি নিয়ে গবেষণা করছে।
বর্তমানে কিছু বিশেষ রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা ভেগাস নার্ভ স্টিমুলেশন (VNS) ব্যবহার করেন।
এর জন্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরে একটি বিশেষ যন্ত্র বসানো হয়, যা নির্দিষ্ট মাত্রায় বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠিয়ে ভেগাস নার্ভকে উদ্দীপিত করে।
ওষুধে নিয়ন্ত্রণে না আসা মৃগীরোগ, চিকিৎসা-প্রতিরোধী বিষণ্নতা, স্থূলতা এবং স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনের মতো ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির অনুমোদিত ব্যবহার রয়েছে।
এছাড়া গলায় বা কানের কাছে ব্যবহৃত কিছু বাহ্যিক যন্ত্রও তৈরি হয়েছে, যা মাইগ্রেন বা কানে অবিরাম শব্দ শোনার মতো সমস্যায় ব্যবহৃত হয়।
বিজ্ঞানীরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন এই যন্ত্রগুলি ঠিক কীভাবে কাজ করে। তবে একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, এগুলি শরীরের শিথিল প্রতিক্রিয়া সক্রিয় করে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
সামাজিক মাধ্যমের অতিরঞ্জন
ভেগাস নার্ভের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর চারপাশে অনেক অতিরঞ্জিত দাবিও তৈরি হয়েছে।
কেউ বলছেন কানে বিশেষ যন্ত্র লাগালেই উদ্বেগ দূর হবে, কেউ দাবি করছেন কয়েক মিনিটের অনুশীলনেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে।
গবেষকদের মতে, এই ধরনের দাবির বেশিরভাগই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
বাজারে বিক্রি হওয়া বহু ভেগাস নার্ভ উদ্দীপক যন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল গবেষণা নেই। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এগুলির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কেও নিশ্চি
থ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এসব পণ্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
বাড়িতে কীভাবে ভেগাস নার্ভ সক্রিয় করা যায়?
যদিও বাজারি যন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কিছু সহজ অভ্যাসের পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে।
ধীর ও গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস
গবেষণায় দেখা গেছে, ধীরে এবং গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া ভেগাস নার্ভের কার্যকলাপ বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে প্রতি মিনিটে ছয়বার বা তার কম শ্বাস নেওয়ার মতো ধীর শ্বাসপ্রশ্বাসের কৌশল, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া এবং পেট ফুলিয়ে শ্বাস নেওয়া উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে।
একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো বক্স ব্রিদিং।
চার সেকেন্ড শ্বাস নিন, চার সেকেন্ড ধরে রাখুন, চার সেকেন্ডে শ্বাস ছাড়ুন, আবার চার সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। তারপর একই চক্র পুনরাবৃত্তি করুন।
এই সহজ অনুশীলন শরীরকে দ্রুত শান্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
ধ্যান
অনেকেই ধ্যানের সময় লক্ষ্য করেন, তাদের হৃদ্স্পন্দন ধীরে আসছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ধ্যান শরীরের বিশ্রাম প্রতিক্রিয়াকে শক্তিশালী করে, হৃদ্স্পন্দন কমায় এবং মানসিক স্থিতি বাড়ায়।
এটি সরাসরি ভেগাস নার্ভের কারণে নাকি ধ্যানের সময় স্বাভাবিকভাবেই শ্বাস ধীর হয়ে যায় বলে—তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে ফলাফল ইতিবাচক।
ঠান্ডার সংস্পর্শ
বরফ-ঠান্ডা পানিতে ডুব দেওয়া বা মুখে ঠান্ডা পানি দেওয়া ভেগাস নার্ভকে সক্রিয় করে—এমন ধারণা সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হয়েছে।
এ নিয়ে গবেষণা এখনও সীমিত। তবে কিছু ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, মুখে ঠান্ডা পানির সংস্পর্শ হৃদ্স্পন্দন কমাতে এবং ভেগাল কার্যকলাপ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এটিকে এখনই নিশ্চিত চিকিৎসা-পদ্ধতি হিসেবে ধরা যায় না।
কোনও জাদুকাঠি নয়
ভেগাস নার্ভ নিঃসন্দেহে মানবদেহের অন্যতম বিস্ময়কর স্নায়ুব্যবস্থা। এটি মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে এক অনবরত সংলাপ চালিয়ে যায়, আমাদের হৃদ্স্পন্দন থেকে শুরু করে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত অসংখ্য কাজে ভূমিকা রাখে।
তবে এটিও সত্য যে ভেগাস নার্ভ উদ্দীপনা কোনও জাদুকাঠি নয়।
কয়েক মিনিটের শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন খারাপ খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের অভাব বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ক্ষতি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
তবু সুসংবাদ হলো, ধীর শ্বাস-প্রশ্বাস, ধ্যান, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মতো বহু পুরনো অভ্যাসই ভেগাস নার্ভকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
বিজ্ঞানীরা এখনও এই স্নায়ুর সম্ভাবনার কেবল শুরুটুকু বুঝতে পেরেছেন। ভবিষ্যতে হয়তো ভেগাস নার্ভকে কেন্দ্র করেই উদ্বেগ, প্রদাহ এবং নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
ততদিন পর্যন্ত, হয়তো সবচেয়ে সহজ উপদেশটিই সবচেয়ে কার্যকর—একটু ধীরে শ্বাস নিন, একটু গভীরভাবে শ্বাস ছাড়ুন। আপনার শরীরের অদৃশ্য তথ্য-মহাসড়ক তখনই নীরবে তার কাজ শুরু করে দেবে।