হাইলাইটস:

  • বিধানসভায় ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পুলিশ গুলি-কাণ্ডের তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পেশ করল রাজ্য সরকার।
  • মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, তৃণমূল সরকার ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
  • রিপোর্টে নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হলেও আগের সরকার তা কার্যকর করেনি বলে দাবি।
  • কমিশনের পর্যবেক্ষণ, মেয়ো রোড ও ডোরিনা ক্রসিংয়ে পুলিশের গুলি চালানো ছিল “অযৌক্তিক” ও “বেআইনি”।
  • নতুন সরকার নিহত ও আহতদের পরিবারকে নথিসহ আবেদন করতে এবং নতুন এফআইআর দায়ের করার আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই কলকাতার বহুল আলোচিত পুলিশ গুলি-কাণ্ডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। সোমবার বিধানসভায় বিচারপতি (অব.) সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট পেশ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এই ঘটনাকে বছরের পর বছর রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করলেও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলি কার্যকর করেনি। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ওই ঘটনার প্রধান প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবি করেন, তাঁকেই কেন কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়নি।

বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, কমিশন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, প্রাক্তন মুখ্যসচিব এন. কৃষ্ণমূর্তি এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকেছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালের সেই যুব কংগ্রেস মিছিলের নেতৃত্বদানকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কখনও তলব করা হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “যিনি নিজেকে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সাক্ষী বলে দাবি করেন, তাঁকেই কমিশন ডাকেনি। আমার ধারণা, তাঁকেই না ডাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।”

শুভেন্দুর আরও অভিযোগ, ২০১১ সালে তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার কমিশন গঠন করলেও ২০২৪ সালে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলি বাস্তবায়নের কোনও উদ্যোগ নেয়নি।

সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, কমিশন নিহত ১৩ জনের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেই সুপারিশ কার্যকর হয়নি বলে বর্তমান সরকারের দাবি।

বিধানসভায় শুভেন্দু বলেন, “কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নিহত ও আহতদের পরিবার নথিপত্র নিয়ে আবেদন করলে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে।”

এছাড়াও তিনি ঘোষণা করেন, যাঁরা ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাঁরা চাইলে নতুন করে এফআইআর দায়ের করতে পারবেন। রাজ্য সরকার সেই অভিযোগের ভিত্তিতে নতুন তদন্ত শুরু করবে বলেও আশ্বাস দেন।

রিপোর্টের উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কমিশনের মতে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পুলিশের গুলি চালানোর কোনও যৌক্তিকতা ছিল না। মেয়ো রোড এবং ডোরিনা ক্রসিংয়ে যে গুলি চালানো হয়েছিল, তা ছিল “অযৌক্তিক” এবং “বেআইনি”। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাণঘাতী গুলি চালানোর প্রয়োজনীয়তা ছিল না এবং ঘটনাটির যথাযথ তদন্তও সে সময় হয়নি।

শুভেন্দুর অভিযোগ, এই ঘটনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আবেগ তৈরি করা হলেও প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “২১ জুলাইয়ের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেকেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ গড়েছেন।”

বিধানসভায় আলোচনার সময় মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, কমিশনের সামনে সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্য দেননি। তবে তিনি কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছিলেন যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তই ঘটনার জন্য প্রধানত দায়ী। শুভেন্দু এ প্রসঙ্গে বলেন, পরবর্তীকালে সেই মণীশ গুপ্তই তৃণমূল সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী হয়েছিলেন।

সরকারের এই অবস্থানের মধ্যেই বিধানসভায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া আসে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক মদন মিত্রের কাছ থেকে। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে এই রিপোর্ট প্রকাশের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। সরকারের এই সিদ্ধান্তের জন্য বিধানসভা এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কৃতজ্ঞ থাকবে বলেও মন্তব্য করেন।

মদন মিত্র বলেন, “এই রিপোর্ট প্রকাশের জন্য আমরা বহু বছর অপেক্ষা করেছি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষও এর জন্য কৃতজ্ঞ থাকবেন।”

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন যুব কংগ্রেস ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার দাবিতে রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের ডাক দিয়েছিল। সেই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশি বাধা এবং সংঘর্ষের এক পর্যায়ে গুলি চালানো হলে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী নিহত হন। ঘটনায় আহত হন বহু মানুষ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও পুলিশি অভিযানে আহত হয়েছিলেন।

পরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ২১ জুলাই “শহিদ দিবস” পালন শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের রাজনৈতিক উত্থানের ইতিহাসে এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার বিচারপতি (অব.) সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করে। বহু বছর তদন্ত চলার পর কমিশন তার রিপোর্ট সরকারের হাতে জমা দেয়।

বর্তমান বিজেপি সরকার সেই রিপোর্ট প্রকাশ করে একদিকে যেমন আগের সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তেমনই ক্ষতিপূরণ, নতুন এফআইআর এবং পুনর্তদন্তের মতো পদক্ষেপের ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনাকে নতুন করে বিচারিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে কমিশনের রিপোর্ট।

এখন নজর থাকবে, কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজ্য সরকার কত দ্রুত পদক্ষেপ করে এবং নতুন তদন্তের ঘোষণার পর ৩৩ বছর আগের এই বহুচর্চিত ঘটনায় আদৌ কোনও নতুন আইনি বা প্রশাসনিক অগ্রগতি হয় কি না।