জ্ঞানেশকে সরানোর দাবি বিরোধীদের, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ কোন পথে?

যা জানা জরুরি
- দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
- কিন্তু কমিশনের অন্দরের মতবিরোধ নিয়ে সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি তুলেছে বিরোধী দলগুলি।
- তাঁকে সরাতে হলে কোন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে?
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু কমিশনের অন্দরের মতবিরোধ নিয়ে সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি তুলেছে বিরোধী দলগুলি। তাঁকে সরাতে হলে কোন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে? সংসদের ভূমিকা কী?
গত কয়েক মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কাজের পদ্ধতি নিয়ে কমিশনের অন্দরেই আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী। সেই আপত্তির কথা প্রকাশ্যে আসার পরেই জ্ঞানেশের অপসারণের দাবি জোরালো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের প্রতিষ্ঠান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সমমর্যাদার সদস্যদের মধ্যে প্রধান; অন্য দুই কমিশনারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নন। যত দূর সম্ভব, তিন সদস্যের সর্বসম্মতির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ কী ভাবে হয়?
সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং ২০২৩ সালের ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার—নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকালের মেয়াদ’ আইনে তাঁদের নিয়োগ, কার্যকাল এবং অপসারণের বিধান রয়েছে।
তিন সদস্যের একটি বাছাই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। কমিটিতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্য।
২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী, এই পদে নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভারত সরকারের সচিব বা সমমর্যাদার পদে কাজ করে থাকতে হবে। তাঁর সততা থাকতে হবে এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
নিয়োগের মেয়াদ ছ’বছর, অথবা ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত—যেটি আগে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সমান বেতন এবং আইননির্ধারিত অন্যান্য সুযোগসুবিধা পান।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর নিয়ম কী?
সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ বলছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে যে পদ্ধতিতে এবং যে কারণে অপসারণ করা যায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেও কেবল সেই পদ্ধতিতে এবং সেই কারণেই সরানো সম্ভব।
২০২৩ সালের আইনের ১১(২) ধারাতেও একই বিধান রয়েছে। তবে অন্য নির্বাচন কমিশনার বা আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনারের ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ ছাড়া তাঁদের অপসারণ করা যায় না।
রাজনৈতিক চাপ থেকে নির্বাচন কমিশনকে রক্ষা করতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের শর্ত ইচ্ছাকৃত ভাবে কঠোর রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ১২৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অপসারণের ভিত্তি হতে হবে ‘প্রমাণিত অসদাচরণ অথবা অক্ষমতা’। অর্থাৎ, শুধু অভিযোগ উঠলেই হবে না; তা প্রমাণিত হতে হবে।
অসদাচরণের মধ্যে দুর্নীতি বা পদের অপব্যবহার পড়তে পারে। পদের মর্যাদা ও দায়িত্বের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ আচরণ কিংবা সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাও এই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। আর অক্ষমতা বলতে এমন পরিস্থিতি বোঝায়, যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
সংসদে প্রক্রিয়াটি কী ভাবে এগোয়?
অপসারণের উদ্যোগ নিতে হলে অসদাচরণ বা অক্ষমতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানিয়ে প্রস্তাবের নোটিস দিতে হয়।
বিচারপতি অপসারণের পদ্ধতির ভিত্তিতে জানা যায়, লোকসভায় এমন নোটিসের জন্য অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন। রাজ্যসভায় প্রয়োজন অন্তত ৫০ জনের স্বাক্ষর। উদ্যোগটি যে কোনও একটি কক্ষ থেকেই শুরু হতে পারে।
নোটিস গ্রহণ করবেন কি না, তা স্থির করেন সংশ্লিষ্ট কক্ষের সভাপতি—লোকসভায় স্পিকার এবং রাজ্যসভায় চেয়ারম্যান। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র খতিয়ে দেখতে পারেন।
প্রস্তাব গৃহীত হলে অভিযোগের যথার্থতা যাচাই করতে তদন্ত হয়। অসদাচরণ বা অক্ষমতার অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, তা পরীক্ষা করার জন্য কমিটি গঠনের কথা জানা যায়।
অপসারণের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত সংসদের দুই কক্ষেই বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হতে হবে। প্রতিটি কক্ষে একসঙ্গে দু’টি শর্ত পূরণ জরুরি: সেই কক্ষের মোট সদস্যসংখ্যার অর্ধেকের বেশি সদস্যের সমর্থন এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন।
দুই কক্ষে প্রস্তাব পাশ হওয়ার পরে একই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির কাছে অপসারণের আবেদন পেশ করতে হয়। এর পর রাষ্ট্রপতির আদেশে অপসারণ কার্যকর হয়। সাংবিধানিক শর্তগুলি পূরণ হলে এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
ভারতে কখনও কোনও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এ ভাবে সরানো হয়েছে?
না। ভারতে এখনও কোনও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এই প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হয়নি।
জানা যায়, গত এপ্রিলেই জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে বিরোধীদের জমা দেওয়া প্রস্তাব খারিজ করেছিলেন রাজ্যসভার চেয়ারম্যান এবং লোকসভার স্পিকার। কোনও কক্ষের সভাপতিই সিদ্ধান্তের কারণ জানাননি। বিরোধী নেতারা তার সমালোচনা করেছিলেন।
গত ১২ মার্চ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধীরা সংসদের দুই কক্ষে ওই প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। লোকসভার নোটিসে স্বাক্ষর করেছিলেন ১৩০ জন সাংসদ এবং রাজ্যসভার নোটিসে ৬৩ জন।
দু’টি প্রস্তাবেই নির্বাচন কমিশনের চলতি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের উল্লেখ ছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও বৈষম্যমূলক আচরণ’-এর অভিযোগ আনা হয়। পাশাপাশি অভিযোগ ছিল, নির্বাচনী জালিয়াতি এবং এসআইআর নিয়ে তদন্তে বাধা দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে, এসআইআরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



