হাইলাইটস:

  • উচ্ছেদ অভিযানে কলকাতা ও শহরতলির হাজার হাজার হকারের জীবিকা অনিশ্চিত।
  • বহু বিক্রেতার অভিযোগ, ভোটের সময় আশ্বাস মিললেও এখন পুনর্বাসনের স্পষ্ট রূপরেখা নেই।
  • প্রশাসনের দাবি, ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করতেই অভিযান; পুনর্বাসনের বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।
  • হকারদের প্রশ্ন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ হলে পরিবার চালাবে কীভাবে?
  • রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ, অবরোধ এবং রাজনৈতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে।

বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার ফুটপাত, বাজার এলাকা কিংবা স্টেশন চত্বর—বছরের পর বছর ধরে এই জায়গাগুলিই হাজার হাজার মানুষের জীবিকার ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান সেই ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ছোট দোকান, ঠেলাগাড়ি বা অস্থায়ী স্টল চালিয়ে সংসার টিকিয়ে রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

হকারদের একাংশের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় তাঁরা উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার আশায় ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—“দোকান তুলে দিলে আমরা যাব কোথায়?” এই উদ্বেগ শুধু ব্যক্তিগত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার পরিবারের রুটি-রুজি।

রাজ্য সরকারের তরফে রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। প্রশাসনের যুক্তি, পথচারীদের চলাচল, যানবাহনের গতি এবং নগর ব্যবস্থাপনার স্বার্থে অবৈধ দখল সরানো জরুরি। কিন্তু হকারদের অভিযোগ, পুনর্বাসনের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে তা কার্যত তাঁদের জীবিকা কেড়ে নেওয়ার সামিল।

এই সংকট নতুন নয়। কলকাতায় হকার সমস্যা বহু দশকের পুরনো। বিভিন্ন সময়ে সরকার ও পুরসভা হকার নীতি তৈরির কথা বলেছে, ভেন্ডিং জোন নির্ধারণের পরিকল্পনাও হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই উদ্যোগ সম্পূর্ণ রূপ পায়নি। ফলে একদিকে পথচারী ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অন্যদিকে জীবিকার প্রশ্নে হকারদের দাবি—দুইয়ের সংঘাত বারবার সামনে এসেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন সেই সব ক্ষুদ্র বিক্রেতারা, যাঁদের অন্য কোনও আয়ের উৎস নেই। অনেকেই ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কারও সন্তানের পড়াশোনা, কারও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, কারও আবার মাসের রেশন—সবই নির্ভর করে প্রতিদিনের বিক্রির ওপর। কয়েকদিন দোকান বন্ধ থাকলেই সংসারে টান পড়ছে।

শুধু কলকাতা নয়, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ বিভিন্ন জায়গায় উচ্ছেদবিরোধী বিক্ষোভও দেখা গেছে। কোথাও রেল অবরোধ, কোথাও রাস্তা আটকে প্রতিবাদ—সব ক্ষেত্রেই মূল দাবি একটাই: পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, উন্নয়নের নামে গরিব মানুষের জীবিকা ধ্বংস করা চলবে না।

অন্যদিকে শহরের ব্যবসায়ী সংগঠন ও নাগরিকদের একাংশের মত, ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত না হলে যানজট, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জনসাধারণের চলাচলের সমস্যা আরও বাড়বে। তাঁদের দাবি, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা তৈরি করা হোক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে হবে।

এই দ্বন্দ্বের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার পরিবার। প্রশাসন যদি দ্রুত স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পুনর্বাসন নীতি ঘোষণা করতে না পারে, তবে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। কারণ হকারদের কাছে বিষয়টি শুধু ব্যবসার নয়, বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

তাই আজ কলকাতার বহু ফুটপাত-ব্যবসায়ীর কণ্ঠে একই প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে—“আমরা তো আশায় ভোট দিয়েছিলাম। এখন যদি দোকানটাই না থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?” এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে রাজ্যের নগর নীতি ও রাজনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে চলেছে।