জন্মে সোনার আংটি, পথে নিখরচায় বাস: বিজয়ের জনকল্যাণ রাজনীতির বিস্তার, প্রশ্ন অর্থের জোগান নিয়ে

যা জানা জরুরি
- শুক্রবার সকালে চেন্নাইয়ের কোয়াম্বেডু বাস টার্মিনাসে কয়েকটি সরকারি বাসে উঠে পড়লেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়।
- মহিলা যাত্রীদের হাতে তুলে দিলেন এমন একটি জিনিস, যার দাম সাধারণত কয়েক টাকা—বাসের টিকিট।
- মহিলা ও রূপান্তরকামীদের বিনামূল্যে বাসযাত্রার সুবিধা বাড়াতে চালু হয়েছে ‘ভেট্ট্রি পয়ণম’।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শুক্রবার সকালে চেন্নাইয়ের কোয়াম্বেডু বাস টার্মিনাসে কয়েকটি সরকারি বাসে উঠে পড়লেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়। মহিলা যাত্রীদের হাতে তুলে দিলেন এমন একটি জিনিস, যার দাম সাধারণত কয়েক টাকা—বাসের টিকিট। তবে এই টিকিটের জন্য কোনও টাকা দিতে হল না।
মহিলা ও রূপান্তরকামীদের বিনামূল্যে বাসযাত্রার সুবিধা বাড়াতে চালু হয়েছে ‘ভেট্ট্রি পয়ণম’। পাঁচ মাসের বিজয় সরকার একের পর এক যে জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ করছে, এই প্রকল্পের সূচনা তারই সাম্প্রতিকতম সংযোজন।
এই উদ্যোগগুলি একসঙ্গে দেখলে বিজয় সরকারের জনকল্যাণ রাজনীতির রূপরেখা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আগের ডিএমকে সরকারের জনপ্রিয় প্রকল্পগুলি বজায় রাখা হচ্ছে, বাড়ানো হচ্ছে সেগুলির পরিধি। পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্ট্রি কাঝাগম বা টিভিকে-র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে উঠে আসা নতুন সুবিধা।
আলাদা করে দেখলে এগুলি একেকটি প্রকল্প। কিন্তু একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, একটি পরিবারের জীবনের নানা পর্বে সরকারের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে—সন্তানের জন্ম থেকে স্কুল, কলেজ, কর্মজীবন, বিয়ে এবং রোজকার যাতায়াত পর্যন্ত।
এত দিন মহানগর ও শহরাঞ্চলে ‘অর্ডিনারি’ শ্রেণির বাসে মহিলারা বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারতেন। পাহাড়ি পথে চলা ‘ঘাট অর্ডিনারি’ বাসেও ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাত্রায় এই সুবিধা মিলত। শুক্রবার থেকে মহানগর ও শহরাঞ্চলে চলা সরকারি ‘এক্সপ্রেস’, ‘লিমিটেড স্টপ সার্ভিস’ ও ‘ডিলাক্স’ বাসকেও এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে ‘মফস্সল অর্ডিনারি’ বাস এবং ‘ঘাট অর্ডিনারি’ বাসে ৪০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের যাত্রাও।
সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, রাজ্যের সাতটি পরিবহণ নিগমের মোট ১২,৬৯৫টি বাসকে ‘ভেট্ট্রি পয়ণম’-এর আওতায় আনা হয়েছে। এই বাসগুলি মোট ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৫০০টি একমুখী ট্রিপ চালায়। সরকারের আশা, প্রতিদিন প্রায় ৮৪ লক্ষ ৩২ হাজার মহিলা এই সুবিধা পাবেন।
গত ২৪ অগস্ট বিধানসভায় ১১০ নম্বর বিধির অধীনে এই সম্প্রসারণের ঘোষণা করেছিলেন বিজয়। সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, তখন মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টিকে স্পষ্টতই সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। সরকারের নীতি হল, তামিলনাড়ুর যে প্রান্তেই কোনও মহিলা থাকুন না কেন, যাতায়াতের খরচের কারণে তিনি যেন কোনও সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন।
সরকার জানিয়েছে, এই সম্প্রসারণের ফলে রাজ্যজুড়ে গণপরিবহণ ব্যবহার করা আরও সহজ হবে। ছাত্রীরা বাড়ি থেকে আরও দূরের কলেজে যেতে পারবেন। মহিলা ও রূপান্তরকামীরা বাসভাড়া না দিয়েই কর্মস্থল, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা পাওয়ার জায়গায় পৌঁছতে পারবেন।
তবে আপাতত চেঙ্গলপট্টু ও তিরুপ্পুর জেলায় এই প্রকল্প কার্যকর হবে না। আগামী ৬ অক্টোবর মাদুরান্তকম ও ধারাপুরম বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের জন্য ওই দুই জেলায় আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি বলবৎ রয়েছে।
বিজয়ের পথনকশা
বিজয়ের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য কিছুটা নিহিত রয়েছে তাঁর সরকার কোন প্রকল্পগুলি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মধ্যে।
বাসযাত্রার সুবিধা সম্প্রসারণের দশ দিন আগে চেন্নাইয়ে স্কুলপড়ুয়াদের সঙ্গে বসে প্রাতরাশ করেছিলেন বিজয়। উপলক্ষ ছিল বিনামূল্যে প্রাতরাশের প্রকল্পের সম্প্রসারণ। ২০২২ সালে ডিএমকে সরকারের চালু করা এই প্রকল্প আগে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য ছিল। বিজয় সরকার সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদেরও এর আওতায় এনেছে।
এই সম্প্রসারণের ফলে আরও প্রায় ১৫ লক্ষ শিশু প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে। বিজয়ের নীতির একটি ধারা এতে স্পষ্ট। অন্য ধারাটি হল, টিভিকে-র নিজস্ব নির্বাচনী প্রচারের ছাপ বহনকারী প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন।
প্রাতরাশ প্রকল্পের সম্প্রসারণের ছয় দিন পরেই তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত দেখা গেল। ২৮ সেপ্টেম্বর মাদুরাইয়ের সরকারি রাজাজি হাসপাতালে বিজয় চালু করলেন ‘থাইমামান থাঙ্গা মোথিরম থিট্টম’। এই প্রকল্পে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জন্মানো, নির্ধারিত শর্তপূরণকারী নবজাতকেরা পাবে এক গ্রাম ওজনের ২২ ক্যারাট সোনার আংটি।
এর প্রতীকী তাৎপর্যটি একান্তভাবেই তামিল সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। ‘থাইমামান’ অর্থ মামা। বহু তামিল পরিবারে সন্তানজন্ম এবং জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পর্বের আচার-অনুষ্ঠানে মামার বিশেষ ভূমিকা থাকে। আত্মীয়তার সেই ভাষাকেই জনকল্যাণের ভাষায় রূপান্তরিত করছে এই প্রকল্প। শিশুর জন্মের মুহূর্তে সরকার যেন প্রতীকীভাবে সেই মামার ভূমিকা নিচ্ছে, যিনি সোনার উপহার নিয়ে হাজির হন।
অগস্টে বিজয় সরকারের প্রথম বাজেটেই ইঙ্গিত মিলেছিল, এই জনকল্যাণ কাঠামো কতটা বিস্তৃত হতে পারে।
নবজাতকদের সোনার আংটি দেওয়ার প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয় ৫৬০ কোটি টাকা। ‘আন্নান সির থিট্টম’-এর অধীনে নির্ধারিত শর্তপূরণকারী কনেদের আট গ্রাম ওজনের সোনার মুদ্রা এবং একটি রেশমের শাড়ি দেওয়ার কথা। এর জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৮১২ কোটি টাকা। কলেজপড়ুয়াদের ‘ভেট্ট্রি ল্যাপটপ প্রকল্প’-এর জন্য আরও ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
বাজেটে ৩,৭০০টিরও বেশি সরকারি স্কুলের আধুনিকীকরণ, স্কুলে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচব্যবস্থার কর্মসূচি, সুবিধাবঞ্চিত পড়ুয়াদের জন্য আবাসিক স্কুল এবং প্রবীণ নাগরিক, রূপান্তরকামী ও মহিলাদের জন্য জনকল্যাণ প্রকল্পের সম্প্রসারণের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি এসেছে পরিবারের দৈনন্দিন খরচে সহায়তার আরও একটি বড় উদ্যোগ। ২৪ অগস্ট বিজয় ঘোষণা করেন ‘অন্নপূরানি সুপার সিক্স’। এই প্রকল্পে নির্ধারিত শর্তপূরণকারী নারীপ্রধান পরিবারগুলিকে বছরে তিনটি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিনামূল্যে দেওয়া হবে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ পরিবার এর সুবিধা পাবে। বছরে খরচ হবে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে পোঙ্গল উৎসব থেকে প্রকল্পটি কার্যকর করার কথা।
এই কর্মসূচিগুলির ব্যাপ্তি অবধারিতভাবেই বিজয়ের জনকল্যাণ পরিকল্পনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: এত খরচের টাকা তামিলনাড়ু জোগাবে কোথা থেকে?
টিভিকে সরকারের বাজেটেই এই সমস্যার কথা স্বীকার করা হয়েছে। তামিলনাড়ুর ঋণের বোঝা তখন প্রায় ১১ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছচ্ছিল। তবে অর্থমন্ত্রী এন মারি উইলসনের যুক্তি, প্রশাসনে আরও কড়া নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর শাসনব্যবস্থা এবং রাজস্ব আদায়ের উন্নতি ঘটলে শেষ পর্যন্ত জনকল্যাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি ব্যয়ের আর্থিক সংস্থান তৈরি হবে।
এই টানাপড়েন আরও স্পষ্ট, কারণ টিভিকে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তার পরিধি এখনও পর্যন্ত বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলির চেয়ে অনেক বড়। নির্বাচনের আগে অনুমান করা হয়েছিল, তাদের বৃহত্তর জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিগুলি কার্যকর করতে গেলে রাজ্যের বার্ষিক জনকল্যাণ ব্যয় প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। তুলনায়, আগের সরকারের আমলে ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে জনকল্যাণ প্রকল্প ও ভর্তুকি মিলিয়ে ব্যয় ছিল প্রায় ৬৫,০০০ কোটি টাকা।
ফলে বিজয় সরকারের যে মডেলটি গড়ে উঠছে, তা কেবল স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী ডিএমকে সরকারের জনকল্যাণ রাজনীতিকে সরিয়ে অন্য কিছু বসানোর প্রয়াস নয়। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সেই পূর্বসূরির তৈরি ভিতের উপরেই নিজের জনকল্যাণের পরিসর বাড়াচ্ছে বিজয় সরকার।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



