ঠেকানো যেত ইন্দোরের জলদূষণে মৃত্যু, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে দায়ী করল বিচারবিভাগীয় কমিশন

যা জানা জরুরি
- ইন্দোরের ভাগীরথপুরায় দূষিত পানীয় জল খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঠেকানো সম্ভব ছিল।
- দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, বিপজ্জনক পরিকাঠামো এবং মেরামতিতে অস্বাভাবিক দেরিই এই বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন।
- কমিশনের পর্যবেক্ষণ, কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন স্তরে জমতে থাকা গাফিলতির পরিণতি এই প্রাণহানি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইন্দোরের ভাগীরথপুরায় দূষিত পানীয় জল খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঠেকানো সম্ভব ছিল। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, বিপজ্জনক পরিকাঠামো এবং মেরামতিতে অস্বাভাবিক দেরিই এই বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন। কমিশনের পর্যবেক্ষণ, কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন স্তরে জমতে থাকা গাফিলতির পরিণতি এই প্রাণহানি। নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহের দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যর্থ হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সুশীলকুমার গুপ্তের এক সদস্যের কমিশন গত ১৮ অগস্ট হাই কোর্টের ইন্দোরেইন্দোর বেঞ্চে প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ওই এলাকায় জলদূষণের ঘটনায় ত্রিশের বেশি মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। তবে হাসপাতালের নথির ভিত্তিতে কমিশন এই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে ২২টি মৃত্যুর যোগ পেয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, পানীয় জলের পাইপ এবং নিকাশির লাইন বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি বসানো হয়েছিল। কোথাও দুই লাইন পরস্পরকে অতিক্রম করেছে, কোথাও পানীয় জলের পাইপের উপর দিয়ে গিয়েছে নিকাশির লাইন। প্রয়োজনীয় ব্যবধানও রাখা হয়নি। পুরনো পাইপে ক্ষয় ও ফুটো তৈরি হওয়ায় পানীয় জলের ব্যবস্থায় নোংরা জল ঢুকে পড়ে। কমিশনের মতে, নির্মাণের ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব মিলেই দূষণ ঘটিয়েছে।
বিপদের পূর্বাভাসও ছিল। ভাগীরথপুরার দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত সহকারী ইঞ্জিনিয়ার সরোজকুমার প্রজাপতি কমিশনকে জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপ এবং জল চুইয়ে পড়ার অভিযোগ পেয়েও তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাননি। বিষয়টি তাঁর বিভাগের, না নিকাশি বিভাগের দায়িত্ব, তা নিয়ে সংশয় ছিল বলে জানান তিনি। কমিশন এই আচরণকে গুরুতর কর্তব্যচ্যুতি বলেছে। অর্থাৎ, অভিযোগ পৌঁছলেও সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নমুনা পরীক্ষাতেও দূষণের ব্যাপকতা ধরা পড়ে। ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি সংগৃহীত ৫২টি বেসরকারি নলকূপের নমুনার মধ্যে ৫০টিতে কলিফর্ম এবং ৪০টিতে ই. কোলাই পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাইপ বদলানোর দরপত্রেও দীর্ঘসূত্রতা ছিল। ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার একটি প্রস্তাবের ফাইলে তৎকালীন অতিরিক্ত পুরকমিশনার রোহিত সিসোনিয়া ‘আলোচনা’ লিখেছিলেন। পরবর্তী আলোচনা ও ফাইল ফের পেশ করার প্রক্রিয়ায় প্রায় ৭২ দিন কেটে যায়। কমিশনের মতে, গ্রহণযোগ্য নথিভিত্তিক কারণ ছাড়া এই বিলম্ব অস্বাভাবিক। সময়মতো পাইপ বদলানো গেলে দূষণ আটকানোর উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা ছিল।
দায় নির্ধারণে কমিশন জল সরবরাহ বিভাগের তৎকালীন এগ্জিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জীবকুমার শ্রীবাস্তবের ভূমিকাও চিহ্নিত করেছে। ২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিভাগে থাকায় পরিকাঠামোর অবনতি সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতার দাবি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেছে কমিশন। পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত পরীক্ষা, আগাম মেরামতি এবং দুর্বল পাইপ বদলানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। দরপত্রে দেরির ক্ষেত্রেও সিসোনিয়া ও শ্রীবাস্তবের দায় চিহ্নিত হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রাক্তন দুই পুরকমিশনার দিলীপকুমার যাদব এবং শিবম বর্মাকে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের বিলম্বের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা ছিল অতিরিক্ত কমিশনারের হাতে। বর্মা সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের আগেই দায়িত্ব ছেড়েছিলেন। যাদবের ক্ষেত্রে দায় আরোপের উপযুক্ত গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্তে আরও বড় বাধা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুপস্থিতি। নব্বইয়ের দশকে নিকাশি এবং পরবর্তী সময়ে পানীয় জলের পাইপ বসানোর নকশা, অনুমোদন ও তদারকির একাধিক নথি পুরসভা এবং ইন্দোর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। ফলে মূল নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পূর্ণভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। নথি হারানো বা সরিয়ে ফেলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্তের সুপারিশ করেছে কমিশন।
প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য, নিরাপদ জল পৌঁছে দেওয়া পুরসভার দায়িত্ব; বিভাগের মধ্যে দায় ঠেলাঠেলি করে তা এড়ানো যায় না। নিয়মিত নজরদারি, সময়মতো মেরামতি এবং অভিযোগে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যর্থতাই বিপদ বাড়িয়েছে। কমিশন স্পষ্ট করেছে, প্রতিরোধযোগ্য এই ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। আইনের শাসনে এমন ব্যর্থতা পরিণামহীন থাকতে পারে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



