জ্বালানি সাশ্রয়ের নতুন বিধি: বদলাবে ভারতের গাড়ির বাজার

যা জানা জরুরি
- ভারতে আগামী পাঁচ বছরে কোন ধরনের গাড়ি বেশি তৈরি হবে, শোরুমে কী কী বিকল্প মিলবে, তার গতিপথ বদলে দিতে পারে কেন্দ্রের নতুন জ্বালানি সাশ্রয়বিধি।
- ‘কর্পোরেট অ্যাভারেজ ফুয়েল ইকনমি’ বা ক্যাফে-৩ কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে।
- দেশে বিক্রির জন্য তৈরি অথবা আমদানি করা নতুন যাত্রিবাহী গাড়ি এর আওতায় আসবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতে আগামী পাঁচ বছরে কোন ধরনের গাড়ি বেশি তৈরি হবে, শোরুমে কী কী বিকল্প মিলবে, তার গতিপথ বদলে দিতে পারে কেন্দ্রের নতুন জ্বালানি সাশ্রয়বিধি। ‘কর্পোরেট অ্যাভারেজ ফুয়েল ইকনমি’ বা ক্যাফে-৩ কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে। চলবে ২০৩২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। দেশে বিক্রির জন্য তৈরি অথবা আমদানি করা নতুন যাত্রিবাহী গাড়ি এর আওতায় আসবে।
এই ব্যবস্থার মূল কথা, কোনও একটি গাড়ির বদলে নির্মাতা সংস্থার বিক্রি করা সমস্ত যোগ্য গাড়ির গড় জ্বালানি খরচ বিচার করা। অর্থাৎ, একটি সংস্থা বেশি তেল খাওয়া এসইউভি বিক্রি করতেই পারে, যদি তার অন্য সাশ্রয়ী গাড়িগুলি সামগ্রিক গড়কে নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখে। পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এই হিসাব হয়; রাস্তায় প্রত্যেক গাড়ির মাইলেজের নিশ্চয়তা এটি নয়।
নতুন বিধিতে জ্বালানি খরচের মূল মানদণ্ড ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষে প্রতি ১০০ কিলোমিটারে ৩.৯৯৬ লিটার থেকে কমে ২০৩১-৩২ সালে হবে ৩.৩২৭৩ লিটার। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে প্রায় ১৬.৭ শতাংশ হ্রাস। তবে সব সংস্থার জন্য একই সংখ্যা প্রযোজ্য নয়। তাদের বিক্রি করা গাড়িগুলির গড় ওজন অনুযায়ী লক্ষ্য বদলাবে। হিসাবের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে ১,২২৯ কিলোগ্রাম ওজন।
ছোট গাড়ি নিয়ে বিতর্কেরও নতুন নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের খসড়ায় ৯০৯ কিলোগ্রাম পর্যন্ত ওজনের পেট্রল গাড়িকে কার্বন নিঃসরণের হিসাবে পৃথক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। চূড়ান্ত নিয়মে সেই বিশেষ সুবিধা নেই। পরিবর্তে ওজনভিত্তিক সূত্র সংশোধন করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এতে হালকা গাড়ির লক্ষ্য তুলনায় নমনীয় হবে, আর ভারী গাড়ির ক্ষেত্রে জ্বালানি সাশ্রয়ের দাবি বাড়বে।
সবচেয়ে বড় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। সংস্থার গড় হিসাবের সময় একটি ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়িকে তিনটি গাড়ির সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্লাগ-ইন হাইব্রিডের ক্ষেত্রে এই গুণক ২.৫, স্ট্রং হাইব্রিডের ক্ষেত্রে ১.৬। ফলে এসব গাড়ি বিক্রি বাড়ালে নির্মাতার নিয়ম মেনে চলা সহজ হবে। পেট্রল ইঞ্জিনের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করা হাইব্রিডও তাই বাড়তি গুরুত্ব পাবে।
শুধু ইঞ্জিন বা ব্যাটারি বদলালেই সুবিধা মিলবে, এমন নয়। স্বয়ংক্রিয় স্টার্ট-স্টপ ব্যবস্থা, ব্রেক করার শক্তি পুনরুদ্ধার, উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, এলইডি আলো এবং অন্যান্য অনুমোদিত প্রযুক্তির জন্যও হিসাবের ছাড় রয়েছে। ইথানলমিশ্রিত পেট্রল ও নির্দিষ্ট বিকল্প জ্বালানির অবদান স্বীকার করা হবে। ফলে প্রচলিত গাড়িকেও আরও সাশ্রয়ী করার একাধিক পথ খোলা থাকছে নির্মাতাদের সামনে।
নিয়ম মানার ক্ষেত্রেও থাকছে নমনীয়তা। প্রথম তিন বছর এবং পরের দুই বছর—এই দুই পর্বে হিসাব মেটানোর সুযোগ থাকবে। নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে ভালো ফল করলে সংস্থা ‘ক্রেডিট’ অর্জন করবে। পিছিয়ে থাকা সংস্থা অন্য নির্মাতার কাছ থেকে সেই ক্রেডিট কিনতে পারবে। ব্যুরো অব এনার্জি এফিশিয়েন্সির মাধ্যমে ক্রেডিট কেনার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এই সুবিধার অর্থ লক্ষ্য উঠে যাওয়া নয়।
ক্রেতাদের জন্য এর সম্ভাব্য ফল হল, বাজারে আরও বেশি বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড এবং কম জ্বালানি খরচের গাড়ির বিকল্প। নিয়মের প্রণোদনা দেখে বলা যায়, নির্মাতারা কোন মডেলে বিনিয়োগ করবেন, কোন প্রযুক্তি সহজলভ্য করবেন, সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে। কোনও নির্দিষ্ট গাড়ির দাম কতটা বাড়বে বা কমবে, তা অবশ্য এই বিধি থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না।
নতুন ব্যবস্থা ব্যক্তিগত গাড়িমালিককে সরাসরি নতুন কোনও জ্বালানি সীমা মানতে বলছে না। দায়িত্ব মূলত নির্মাতাদের। তবে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ক্রেতার পছন্দেও পড়তে পারে। বড় গাড়ির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সাশ্রয়ী মডেল বিক্রি বাড়ানোর চাপ থাকবে সংস্থাগুলির উপর। তাই ২০৩২ পর্যন্ত গাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু দাম, আকার বা সাজসজ্জায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; শক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে পরীক্ষাগারের সাশ্রয় বাস্তব যাতায়াতে কতটা মিলছে, সেটিও ক্রেতাদের বিবেচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



