পশ্চিমবঙ্গের আগামী শিক্ষাবর্ষের স্কুলপাঠ্যে সাহিত্য, ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক রাজনীতির উপস্থাপনায় একাধিক পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে রাজ্যের বিজেপি সরকারের সিলেবাস ও পাঠ্যক্রম কমিটি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতার জায়গায় তাঁরই ‘শিবাজী উৎসব’ এবং শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’র পরিবর্তে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার পতন’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমস্ত পাঠ্যবইয়ের শুরুতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও অবদানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সুপারিশগুলির চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন এখনও বাকি।

ষষ্ঠ শ্রেণির বই থেকে কন্যাশ্রী প্রকল্প এবং অষ্টম শ্রেণি থেকে সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনসংক্রান্ত অধ্যায় সরানোর প্রস্তাব রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের আমলে বিষয়গুলি পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়েছিল। কমিটির চেয়ারম্যান দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে জানাতেই প্রত্যেক বইয়ের শুরুতে তাঁর পরিচিতি রাখা হবে। ‘শিবাজী উৎসব’ নির্বাচনের ব্যাখ্যায় তিনি বিকশিত ভারতের লক্ষ্যের সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের পরিচয়কে যুক্ত করেছেন।

এই উদ্যোগের রাজনৈতিক পটভূমিও স্পষ্ট। জুলাইয়ে শ্যামাপ্রসাদের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর দেশপ্রেম, অখণ্ড ভারতের ধারণা এবং পশ্চিমবঙ্গ গঠনে ভূমিকা বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ানো ও আলোচনার কথা বলেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা, যে সংগঠনের উত্তরসূরি বিজেপি। ফলে তাঁর পরিচিতিকে প্রতিটি বইয়ের শুরুতে রাখার প্রস্তাব নতুন সরকারের ঘোষিত শিক্ষাভাবনার সঙ্গেও যুক্ত।

পরিবর্তনের আর একটি দিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বের জন্য বরাদ্দ জায়গা। মোগল ইতিহাস ও সাম্যবাদসংক্রান্ত আলোচনা সংক্ষিপ্ত করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে পাঠ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কমিটির বক্তব্য, ভারতের ইতিহাসকে প্রধানত মোগল শাসনের ইতিহাস হিসেবে দেখানো উচিত নয়। সাম্যবাদ প্রসঙ্গেও প্রশস্তির বদলে তথ্যনিষ্ঠ আলোচনা রাখার কথা বলা হয়েছে। এগুলি কমিটির নিজস্ব মূল্যায়ন; বর্তমান বইয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি ঠিক কতখানি রয়েছে এবং নতুন বইয়ে কতখানি থাকবে, তার পূর্ণাঙ্গ তুলনা এখনও সামনে আসেনি।

ভাষার ক্ষেত্রেও রদবদলের সুপারিশ রয়েছে। ‘পানি’র পরিবর্তে ‘জল’ ব্যবহারের পাশাপাশি ‘আব্বা’ ও ‘আম্মা’র মতো শব্দ পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান। এর যুক্তি হিসেবে কথ্য বাংলায় পরিচিত শব্দ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে কোনও শব্দের ব্যবহার কতটা ব্যাপক, তা অঞ্চল, পরিবার ও সামাজিক পরিসরভেদে বদলায়। ফলে এই সংশোধনের তাৎপর্য শুধু বানান বা শব্দার্থে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পাঠ্যবই বাংলার ভাষিক বৈচিত্র্যকে কী ভাবে তুলে ধরবে, সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত।

সাহিত্যের দুটি কবিতা বদলের তাৎপর্য বুঝতে তাদের বিষয়বস্তুর দিকে তাকানো প্রয়োজন। ‘আফ্রিকা’য় রবীন্দ্রনাথ একটি নিপীড়িত মহাদেশের মানবিক মর্যাদার কথা বলেছেন। মানুষকে বন্দি করা, লুণ্ঠন, রক্তপাত এবং সভ্যতার নামে নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কবিতাটি প্রতিবাদ জানায়। সমুদ্রের অন্য পারে ধর্মাচরণ ও সৌন্দর্যচর্চার সঙ্গে উপনিবেশে চলতে থাকা অত্যাচারের বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন কবি। শেষ পর্যন্ত তাঁর আবেদন অপমানিত মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার। ফলে এই কবিতার পাঠ ছাত্রছাত্রীদের নিজের দেশের বাইরেও শোষণ ও অবমাননার অভিজ্ঞতা বুঝতে সাহায্য করে। মানবিক সংহতিই তার অন্যতম কেন্দ্রীয় সুর।

অন্য দিকে, ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতায় শিবাজীর বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং বিচ্ছিন্ন ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা প্রধান হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ সেখানে বাংলার সঙ্গে মারাঠা ইতিহাসের সম্পর্কও পুনর্বিবেচনা করেছেন। বিদেশি ইতিহাসে শিবাজীকে অবজ্ঞার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর আদর্শের স্থায়িত্বের কথা বলেছেন। কবিতায় বণিকের ক্ষমতা থেকে রাজক্ষমতার উত্থানের প্রসঙ্গও রয়েছে। শেষভাগে বাঙালি ও মারাঠাকে একসঙ্গে এগোনোর আহ্বান এসেছে। অর্থাৎ, একই কবির দুটি রচনা হলেও তাদের ঐতিহাসিক পটভূমি, আবেগ এবং শিক্ষার্থীর সামনে রাখা প্রশ্ন আলাদা। একটি সরিয়ে অন্যটি আনার ফলে রবীন্দ্রসাহিত্যের নির্বাচিত পাঠের দৃষ্টিকোণও বদলাবে।

নাটকের পরিবর্তনেও ঐতিহাসিক মনোযোগের স্থানান্তর স্পষ্ট। ‘সিরাজদ্দৌলা’য় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের পতন এবং ঘনিষ্ঠদের বিশ্বাসঘাতকতা গুরুত্বপূর্ণ। ‘মেবার পতন’ মোগল শক্তির সঙ্গে মেবারের সংঘাতের পটভূমিতে রচিত। ফলে বাংলায় ঔপনিবেশিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট থেকে পাঠের কেন্দ্র সরে যাবে রাজপুত ইতিহাসের দিকে। দুটি নাটকের সাহিত্যিক মূল্য বিচারের পাশাপাশি কোন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে বিদ্যালয়ের পাঠে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, সেটিও এই নির্বাচনের তাৎপর্য।

তবে প্রস্তাবের বিবর্তনের একটি দিক লক্ষণীয়। গত ১০ আগস্ট ‘সিরাজদ্দৌলা’র বিকল্প হিসেবে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের ‘বঙ্গের প্রতাপাদিত্য’র নাম এসেছিল। সর্বশেষ প্রতিবেদনে তার জায়গায় রয়েছে ‘মেবার পতন’। তাই আগের আলোচনায় উঠে আসা নাম এবং এখনকার সুপারিশকে একই বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অগস্টের প্রতিবেদনে কমিটির এক সদস্য ইতিহাসে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রামাণ্য নথির প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছিলেন। সেই মানদণ্ড চূড়ান্ত পাঠ নির্বাচনে কী ভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ।

পাঠ্যক্রমের প্রশ্নটি তাই কেবল কোন লেখক বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব জায়গা পেলেন, তার হিসাব নয়। একটি রচনা কেন শিক্ষার্থীর বয়স ও শেখার প্রয়োজনের উপযোগী, কোন বিষয় পড়লে অন্য বিষয়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় এবং বাদ দেওয়া অংশের শিক্ষামূল্য কী ভাবে পূরণ হবে, সেই ব্যাখ্যাও প্রয়োজন। সরকারি প্রকল্প বা রাজনৈতিক আন্দোলনের পাঠের ক্ষেত্রেও তথ্য, মূল্যায়ন এবং দলীয় প্রচারের মধ্যে সীমারেখা থাকা দরকার। নতুন পরিচিতি সংযোজনের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষাগত মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে অবশ্য সময়ের চাপ রয়েছে। দেবাশিস জানিয়েছেন, আগামী ২ জানুয়ারির মধ্যে স্কুলে বই পৌঁছনোর প্রয়োজন মাথায় রেখেই কাজ এগোচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন বলেছেন, বিষয়টি কমিটি দেখছে; সুপারিশ তাঁর কাছে এলে তিনি বিবেচনা করবেন। নতুন বইয়ের মুদ্রণ ও বিতরণের আগে অনুমোদনের ধাপ তাই গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত প্রস্তাবগুলি সরকারের বিবেচনাধীন। কোন সুপারিশ গৃহীত হবে, সংশোধিত পাঠে কী থাকবে এবং পরিবর্তনের শিক্ষাগত ব্যাখ্যা কী হবে, তার স্পষ্ট উত্তর মিলবে চূড়ান্ত পাঠ্যক্রম ও বই প্রকাশিত হলে।