হাইলাইটস:

  • জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নতুন প্রতিরোধমূলক আইনের প্রস্তাব।
  • অপরাধ সংঘটনের আগেই ‘সমাজবিরোধী’ বলে চিহ্নিত ব্যক্তিকে আটক করার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাতে।
  • জমি দখল, তোলাবাজি, বেআইনি বালি ও পাথর খাদান, বনজ সম্পদ লুট, মাদক ও অস্ত্র পাচার—সবই আইনের আওতায়।
  • গত সাত বছরে দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা একাধিক মামলায় চার্জশিট থাকলে প্রতিরোধমূলক আটকের পথ খুলবে।
  • আটক ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে, তবে জনস্বার্থের কারণে কিছু তথ্য গোপন রাখার সুযোগও থাকছে।
  • উপদেষ্টা পর্ষদ আটকের যৌক্তিকতা পরীক্ষা করবে; পর্যাপ্ত কারণ না থাকলে আটকাদেশ প্রত্যাহারের সুপারিশ করতে পারবে।
  • সরকার বলছে সংগঠিত অপরাধ দমনের হাতিয়ার, সমালোচকদের আশঙ্কা—ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের অপব্যবহার।

বাংলাস্ফিয়ার: রাজ্যে জননিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে একটি নতুন প্রতিরোধমূলক আইন আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। সরকারের দাবি, প্রচলিত ফৌজদারি আইন কার্যকর থাকলেও সংগঠিত অপরাধচক্র, সিন্ডিকেট, বেআইনি খনি ও বালি মাফিয়া, তোলাবাজি এবং জমি দখলের মতো অপরাধ মোকাবিলায় আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই আনা হয়েছে নতুন বিল, যার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল—কোনও ব্যক্তি ভবিষ্যতে গুরুতর সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়াতে পারেন বলে সরকারের বিশ্বাস হলে, অপরাধ সংঘটনের আগেই তাঁকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক করা যাবে।

বিলে ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত রাখা হয়েছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, ভয় বা নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি, প্রাণ বা সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি, জনশৃঙ্খলা বা জনশান্তি নষ্ট করা, কোনও ব্যক্তির আইনসিদ্ধ ব্যবসা, পেশা বা জীবিকায় বাধা দেওয়া, বেআইনিভাবে জমি বা সম্পত্তি দখল, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি, বেআইনি খনি, বালি উত্তোলন, বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত অপরাধের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারের ক্ষতি—সবই এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে শুধু খুন, ডাকাতি বা ছিনতাই নয়, অর্থনৈতিক ও সংগঠিত অপরাধের বিস্তৃত ক্ষেত্রও এই আইনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

একইভাবে ‘গুন্ডা’র সংজ্ঞাও অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। নিয়মিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত ব্যক্তি, কোনও গ্যাং বা সিন্ডিকেটের নেতা বা সদস্য, অপরাধে অর্থ জোগানদাতা বা সহযোগী, অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক কিংবা মানবপাচার সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত ব্যক্তি—সবাই এই সংজ্ঞার আওতায় আসতে পারেন। এমনকি কোনও ব্যক্তিকে সমাজে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে সাধারণভাবে পরিচিত বলেও বিবেচনা করা হলে, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।

বিলের সবচেয়ে আলোচিত ধারা হল প্রতিরোধমূলক আটক সংক্রান্ত বিধান। রাজ্য সরকার যদি বিশ্বাস করে, কোনও ব্যক্তি ভবিষ্যতে সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়াতে পারেন, তাহলে অপরাধ সংঘটনের অপেক্ষা না করেই তাঁকে আটক করার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য কিছু শর্তও রাখা হয়েছে। গত সাত বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্তত একবার আদালতের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় থাকতে হবে, অথবা তিনটি পৃথক মামলায় চার্জশিট দাখিল থাকতে হবে, যেখানে অভিযোগকারী শুধুমাত্র পুলিশ নন, অন্য কোনও ব্যক্তি।

আটকের সিদ্ধান্তও সরাসরি কোনও থানার স্তরে নেওয়া যাবে না। প্রথমে পুলিশ সুপার বা সমমর্যাদার কোনও আধিকারিক বিস্তারিত রিপোর্ট দেবেন। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই রাজ্য সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, প্রতিরোধমূলক আটক প্রয়োজন কি না।

বিলে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই আটককে শাস্তি হিসেবে দেখা হবে না। সরকারের বক্তব্য, এটি বিচার-পরবর্তী দণ্ডের ব্যবস্থা নয়; বরং গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধের জন্য আগাম প্রশাসনিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ কোনও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, সম্ভাব্য অপরাধ ঠেকানোর উদ্দেশ্যেই এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে।

আটক হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব তাঁর আটকের কারণ জানাতে হবে, যাতে তিনি সরকারের কাছে নিজের বক্তব্য বা আপত্তি জানাতে পারেন। তবে এখানেও একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। যদি সরকার মনে করে, কোনও তথ্য প্রকাশ করলে জনস্বার্থ বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, তাহলে সেই তথ্য গোপন রাখার ক্ষমতাও থাকবে। ফলে আটক ব্যক্তি সব তথ্য জানার অধিকার সব ক্ষেত্রে পাবেন না।

সরকারি সিদ্ধান্তের উপর নজরদারির জন্য উপদেষ্টা পর্ষদের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সাধারণত উচ্চ আদালতের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতি কিংবা বিচারপতি হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে এই পর্ষদ গঠিত হবে। পর্ষদ পরীক্ষা করবে, আটক করার পর্যাপ্ত কারণ ছিল কি না এবং সরকারের সিদ্ধান্ত আইনসম্মত কি না। যদি তারা মনে করে যথেষ্ট ভিত্তি নেই, তাহলে আটকাদেশ প্রত্যাহারের সুপারিশ করতে হবে।

বিলে আটকের সর্বোচ্চ সময়সীমাও নির্দিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য কাউকে আটক রাখা যাবে না। আইন নির্ধারিত সীমার মধ্যে আটক রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ান্তরে তা পর্যালোচনার ব্যবস্থাও থাকবে।

আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারকে বিস্তৃত প্রশাসনিক ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত আধিকারিক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন, প্রশাসনিক নির্দেশ জারি এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে। ফলে আইন পাস হওয়ার পরে বাস্তব প্রয়োগের অনেকটাই পরবর্তী বিধি ও প্রশাসনিক নির্দেশের উপর নির্ভর করবে।

সরকারের মতে, এই আইন কার্যকর হলে জমি মাফিয়া, বালি ও পাথর মাফিয়া, তোলাবাজ চক্র, অস্ত্র ও মাদক পাচারকারী এবং অন্যান্য সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। সরকারের যুক্তি, ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং সেই ফাঁকে বহু অভিযুক্ত জামিনে মুক্ত হয়ে একই ধরনের অপরাধ চালিয়ে যায়। নতুন আইন সেই সমস্যার মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই আনা হয়েছে।

তবে বিলটি নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। সমালোচকদের মতে, ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’ এবং ‘গুন্ডা’র সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় এর অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অপরাধের আশঙ্কায় কাউকে আটক করা ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী কি না, সরকারের হাতে অতিরিক্ত বিবেচনাধিকার দেওয়া হচ্ছে কি না এবং বিরোধী নেতা, আন্দোলনকারী বা সামাজিক কর্মীদের বিরুদ্ধেও এই আইন প্রয়োগ হতে পারে কি না—এসব প্রশ্ন উঠতেই পারে।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, এই আইন সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে নয়। অভ্যাসগত অপরাধী, সংগঠিত অপরাধচক্র ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই এই বিল তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি উপদেষ্টা পর্ষদ, বিচারিক পর্যালোচনা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে সরকারের দাবি।

সব মিলিয়ে, এই বিলের মূল দর্শন হল প্রতিরোধমূলক আটক। অর্থাৎ অপরাধ সংঘটনের পরে শাস্তি নয়, বরং গুরুতর সমাজবিরোধী কার্যকলাপ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা। একই সঙ্গে বিলটি নাগরিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্কেরও জন্ম দিতে পারে। আইনসভায় আলোচনা এবং ভবিষ্যতে আদালতের ব্যাখ্যার উপরই নির্ভর করবে এই আইনের চূড়ান্ত পরিসর ও বাস্তব প্রয়োগ।