হাইলাইটস
- INDIA জোটের বৈঠকে একাধিক শরিক দল কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্য অসন্তোষ জানায়।
- আরজেডির নেতা মনোজ ঝা কংগ্রেসকে ‘বড় দলের অহংকার’ ত্যাগ করার পরামর্শ দেন।
- সমাজবাদী পার্টি, বামপন্থী দল এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেয়।
- কেরল নিয়ে রাহুল গান্ধীর প্রচার কৌশলকে ঘিরে বামপন্থীদের তীব্র আপত্তি ওঠে।
- ডিএমকে এবং আম আদমি পার্টির অনুপস্থিতি জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক ছিল বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হওয়ার কথা। কিন্তু বৈঠক যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে শরিকদের ক্ষোভই যেন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
জোটের একাধিক নেতা সরাসরি কিংবা পরোক্ষে কংগ্রেসকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে তারা আর সেই সর্বশক্তিমান দল নয়, যারা একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে। বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আঞ্চলিক দলগুলির গুরুত্ব স্বীকার করেই এগোতে হবে।
আরজেডির প্রবীণ নেতা মনোজ ঝা বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জোট রাজনীতির বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, কংগ্রেসকে আরও উদার ও সহযোগিতাপূর্ণ হতে হবে। বিজেপির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে ছোট-বড় সব শরিককেই সমান মর্যাদা দিতে হবে। জোটের সাফল্য নির্ভর করবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সমন্বয়ের উপর, কোনও একক দলের কর্তৃত্বের উপর নয়।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক আঞ্চলিক দলের নেতার বক্তব্যেও একই সুর শোনা যায়। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আঞ্চলিক দলগুলিই বহু রাজ্যে প্রধান শক্তি। ফলে কংগ্রেসকে তাদের মতামত ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আরজেডির তরুণ নেতা তেজস্বী যাদব-ও একই ধরনের বক্তব্য রাখেন বলে জানা গেছে। তাঁর মতে, কংগ্রেস যদি এখনও নিজেকে একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভাবতে থাকে, তাহলে জোটের বিস্তার ও কার্যকারিতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বামপন্থী দলগুলিও কংগ্রেসকে ছাড় দেয়নি। বিশেষ করে কেরলে কংগ্রেস এবং সিপিএমের দ্বন্দ্ব নিয়ে বৈঠকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সিপিএম নেতৃত্ব অভিযোগ তোলে যে কেরলের নির্বাচনী প্রচারে রাহুল গান্ধীর ভাষা ও অবস্থান জোটের চেতনাকে আঘাত করেছে। বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয় এবং রাহুল গান্ধীকে ব্যাখ্যাও দিতে হয় বলে সূত্রের খবর।
এদিকে বৈঠকে ডিএমকের অনুপস্থিতি অনেকের নজর কেড়েছে। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম শক্তিশালী এই দলটির অনুপস্থিতি জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইতিমধ্যেই আম আদমি পার্টির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক শরিকই উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে জোট ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।
বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের একাংশের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা কংগ্রেসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এক সময় যে দল শরিকদের শর্ত দিত, এখন সেই দলকেই শরিকদের আস্থা অর্জনের জন্য বাড়তি উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, মমতা বন্দোপাধ্যায় এদিন তুলনামূলকভাবে অনেক নরম সুরে কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। অতীতে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরব থাকলেও এবার তিনি জোটকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।
সব মিলিয়ে দিল্লির বৈঠক এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। ইন্ডিয়া জোটের শরিকরা এখনও বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট থাকতে চান, কিন্তু সেই ঐক্যের পূর্বশর্ত হিসেবে তারা কংগ্রেসের রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তন দেখতে চাইছেন। বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হলেও পর্দার আড়ালে কংগ্রেসকে ঘিরে যে অস্বস্তি, ক্ষোভ এবং অবিশ্বাস জমে রয়েছে, তা আর গোপন রইল না। বরং বলা যায়, এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা ছিল—জোট বাঁচাতে হলে কংগ্রেসকে আগে নিজের ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।