হাইলাইটস
- প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রির চাপে মার্কিন ও এশীয় বাজারে বড় ধস।
- নাসডাক সূচক একদিনেই ২.২% পড়ে যায়।
- এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিয়ে ‘বুদ্বুদ’ তৈরির আশঙ্কা বাড়ছে।
- অ্যালফাবেট (গুগলের মূল সংস্থা) এবং স্পেসএক্সের শেয়ার পতন বাজারে আতঙ্ক ছড়ায়।
- দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার ১০% এবং জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৩.৫% নেমে যায়।
- সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে মঙ্গলবার বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে বিনিয়োগকারীদের নজর সরে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং চিপ নির্মাতা সংস্থাগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই খাতগুলিই গত কয়েক বছরে শেয়ারবাজারকে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই উত্থানের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক মঙ্গলবার দিনের শেষে ২.২ শতাংশ নিম্নমুখী হয়। একই সঙ্গে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১.৪৩ শতাংশ কমে যায়। তুলনামূলকভাবে ডাও জোন্স সূচক স্থিতিশীল থাকলেও বাজারে উদ্বেগের আবহ স্পষ্ট ছিল। চলতি বছরে মার্কিন শেয়ারবাজারের তিনটি প্রধান সূচকই নতুন রেকর্ড গড়েছে। এআই প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার, চিপ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের জোয়ারে নাসডাক সূচক এ পর্যন্ত প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। ডাও জোন্স ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫১ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করেছে এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ বেড়েছে ৭.৩ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ অনেক দিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে এআই-নির্ভর এই উন্মাদনা ২০০০ সালের গোড়ার দিকের ‘ডট-কম বুদ্বুদ’-এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে। বর্তমানে মাত্র সাতটি বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থার হাতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের মোট মূল্যের প্রায় ৩০ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। ফলে পুরো বাজারের স্থিতিশীলতা এখন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্সের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অনেক বিনিয়োগকারীর আশঙ্কা, প্রশ্ন এখন আর ‘বুদ্বুদ ফাটবে কি না’ নয়, বরং ‘কখন ফাটবে’। সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে যখন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দিয়েছে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার বাড়ানো হতে পারে। সুদের হার বাড়লে ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়বে, যা প্রযুক্তি সংস্থাগুলির সম্প্রসারণ পরিকল্পনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাজারে বিক্রির চাপ শুরু হয় সোমবার। গুগলের মূল সংস্থা অ্যালফাবেট গত এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ দিনের মুখোমুখি হয়। গত সপ্তাহে সংস্থার দুই জন খ্যাতনামা এআই গবেষক চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ সোমবার বাজার বন্ধ হওয়ার সময় অ্যালফাবেটের শেয়ারদর ৫ শতাংশ কমে যায়। আরও বড় ধাক্কা আসে ইলন মাস্কের মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সকে ঘিরে। ১২ জুন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রবল উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও সোমবার সংস্থাটির শেয়ার ১৬ শতাংশ পড়ে যায়। একই দিনে স্পেসএক্স ঘোষণা করে যে তারা ২০ বিলিয়ন ডলারের বন্ড বিক্রির মাধ্যমে নতুন অর্থ সংগ্রহ করতে চায়। অথচ প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সংস্থাটি ইতিমধ্যেই ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ তুলেছিল।
এই ঘোষণার ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সংস্থাটি কি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্পে অর্থ ঢালছে? বিশেষ করে এআই এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুইসকোটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইপেক ওজকারদেস্কায়া বলেন, স্পেসএক্স এখনও নাসডাক সূচকের অন্তর্ভুক্ত না হলেও তাদের বন্ড বাজারে ঝাঁপ দেওয়া পুরনো আশঙ্কাগুলিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ, বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি হয়তো এআই অবকাঠামো নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় করছে এবং সেই ব্যয় মেটাতে ক্রমশ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগ ব্যাংক মরগ্যান স্ট্যানলির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে এআই-সংক্রান্ত ঋণের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মার্কিন বাজারে এই ধাক্কার প্রভাব দ্রুত এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ার সূচক ১০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়। দেশের দুই বৃহত্তম চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, SK Hynix এবং Samsung Electronics-এর শেয়ার ১২ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। জাপানের Nikkei 225 সূচকও দিনের শেষে ৩.৫ শতাংশ নিম্নমুখী ছিল। প্রযুক্তি ও চিপ খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল বাজারগুলিতে এই পতনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে।
অন্যদিকে, সব বাজার সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। FTSE 100 সূচক দিনের শেষে মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল, যা দেখায় যে প্রযুক্তি খাতের ওপর অপেক্ষাকৃত কম নির্ভরশীল বাজারগুলি আপাতত এই ঝড় থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এআই খাতে আয় ও মুনাফার প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, তাহলে বাজারে আরও বড় সংশোধন দেখা যেতে পারে। আবার যদি সংস্থাগুলি প্রমাণ করতে পারে যে বর্তমান বিপুল বিনিয়োগ ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য আয় সৃষ্টি করবে, তাহলে এই পতন সাময়িক হিসেবেই বিবেচিত হবে। আপাতত বিশ্ববাজারে প্রশ্ন একটাই—এআই কি সত্যিই আগামী অর্থনীতির ভিত্তি, নাকি এটি আরেকটি বিপজ্জনক বুদ্বুদ?