বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোনও নির্বাচন হয় না, কোনও রায় ঘোষণা হয় না, কোনও দল ভাঙেও না— তবু একটি ছবি, একটি দৃশ্য, একটি ঘটনা অনেক বড় সত্যকে সামনে এনে দেয়। মঙ্গলবার কলকাতার ধর্ণামঞ্চে যা ঘটল, সেটি তেমনই একটি মুহূর্ত।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চে ছিলেন। মাইক ছিল। স্লোগান ছিল। ব্যানার ছিল। সংবাদমাধ্যম ছিল। কিন্তু যা ছিল না, তা হল তাঁর নিজের দলের মানুষের উপস্থিতি। এবং রাজনীতিতে কখনও কখনও অনুপস্থিত মানুষরাই সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য রেখে যায়।

সংখ্যাগুলি শীতল, নিরাবেগ এবং নিষ্ঠুর। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ধর্ণামঞ্চে দেখা গেল মাত্র হাতে গোনা কয়েকজনকে। সাংসদদের উপস্থিতিও ছিল নগণ্য। রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসাবে এটি হয়তো একটি প্রতিবাদ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে এটি ছিল এক ভয়াবহ সতর্কসংকেত।

একসময় যে নেত্রী একটি ডাক দিলেই কলকাতার রাস্তা ভরে যেত, সেই নেত্রীকেই আজ নিজের দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে— এই দৃশ্যের প্রতীকী গুরুত্ব উপেক্ষা করা কঠিন।

খালি চেয়ারও কখনও কখনও বক্তৃতা দেয়

রাজনীতিতে বক্তৃতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বক্তৃতার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো বক্তার চারপাশে কারা দাঁড়িয়ে আছেন। একজন নেতা যখন বক্তব্য রাখেন, তখন মানুষ শুধু তাঁর কথা শোনে না; তারা লক্ষ্য করে তাঁর পাশে কারা আছে, তাঁর পেছনে কারা আছে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— কারা নেই।

মঙ্গলবারের ধর্ণামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের চেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে সেই অনুপস্থিত মুখগুলি। অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, যাঁরা একসময় নেত্রীর পাশে প্রথম সারিতে বসার জন্য প্রতিযোগিতা করতেন, তাঁদের অধিকাংশেরই দেখা মেলেনি।

রাজনীতির অভিধানে এটিকে বলে ‘সাইলেন্ট মেসেজ’ অর্থাৎ নীরব বার্তা। প্রকাশ্যে বিদ্রোহ নয়, সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষোভ উগরে দেওয়া নয়, দলত্যাগও নয়। শুধু অনুপস্থিত থাকা। আর কখনও কখনও এই অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। কারণ রাজনীতিবিদেরা জানেন, নেতার ডাকে না যাওয়া মানে কেবল কর্মসূচি এড়িয়ে যাওয়া নয়; সেটি একটি অবস্থান গ্রহণ।

কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় ধাক্কা

ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয় বলেই এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

মাত্র কয়েক দিন আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় বিধায়কদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকেন। সেখানে উপস্থিতির হার ছিল হতাশাজনক। তখন অনেকেই যুক্তি দিয়েছিলেন যে বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক কারণে এমনটা হতে পারে। কেউ কেউ বলেছিলেন, বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। কিন্তু তার পরেই ধর্ণামঞ্চে একই ধরনের দৃশ্য দেখা যাওয়ায় সেই ব্যাখ্যা আর খুব শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে না।

একবার কোনও নেতা তাঁর সহকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারেন। কিন্তু বারবার একই ঘটনা ঘটতে থাকলে প্রশ্ন উঠবেই। প্রশ্ন উঠবে, সমস্যা কি শুধুই সময়সূচির? নাকি সমস্যা আরও গভীরে?

রাজনীতির ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত সংখ্যার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আর মঙ্গলবারের সংখ্যাগুলি তৃণমূলের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।

ভয়, ক্লান্তি নাকি আস্থার সংকট?

তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য হলো, বিজেপি বিভিন্ন উপায়ে চাপ সৃষ্টি করছে। তদন্ত, মামলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সব মিলিয়ে দলের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।

এই যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের উদাহরণ নতুন নয়। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও উঠে আসে। যদি ভয়ই একমাত্র কারণ হয়, তবে অন্তত প্রতীকী সমর্থন দেখানোর জন্যও এত কম মানুষ কেন এলেন?

কারণ রাজনীতিতে আনুগত্যেরও নানা স্তর আছে। কেউ হয়তো প্রকাশ্যে সংঘাতে যেতে চান না, কিন্তু দলের অস্তিত্বের লড়াইয়ে সাধারণত তাঁরা উপস্থিত থাকেন। এখানে সেই উপস্থিতিও দেখা গেল না। ফলে অনেকে মনে করছেন, বিষয়টি ভয় নয়, বরং ক্লান্তি এবং আস্থাহীনতার লক্ষণ হতে পারে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই একটি সমস্যা দেখা যায়। দলের ভিতরে এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়, যেখানে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দলীয় আদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্ষমতা থাকলে সবাই একসঙ্গে থাকে। ক্ষমতা চলে গেলে প্রত্যেকে নিজের হিসাব কষতে শুরু করে।

তৃণমূল কি এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে? ধর্ণামঞ্চের ছবি অন্তত সেই প্রশ্নটি তুলতে বাধ্য করছে।

আন্দোলনের রাজনীতি কি আর কাজ করছে না?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনকে যদি একটি শব্দে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে সেই শব্দটি হবে ‘আন্দোলন’। রেললাইন, অনশন, পদযাত্রা, ধর্না— এই সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়েই তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ করেছেন।

সমস্যা হলো, যে কৌশল একসময় অসাধারণ কার্যকর ছিল, সেটি চিরকাল কার্যকর থাকবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।

২০১১ সালে মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেছিল পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে। ২০২৬ সালে মানুষ তাঁকে দেখছে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবধান বিশাল।

যখন আপনি বিরোধী নেতা, তখন ধর্ণা একটি অস্ত্র। কিন্তু যখন আপনি বহু বছর ক্ষমতায় ছিলেন, তখন মানুষ ধর্ণার চেয়ে আপনার শাসনের হিসাব বেশি দেখতে চায়।

মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে সেই সমস্যাটাই স্পষ্ট হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাষায় রাজনীতি করতে স্বচ্ছন্দ, জনতার একাংশ হয়তো এখন আর সেই ভাষায় সাড়া দিচ্ছে না।

সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রুর নাম উদাসীনতা

রাজনীতিতে বিরোধী দল বিপজ্জনক। বিদ্রোহীরাও বিপজ্জনক। কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো উদাসীনতা।

কারণ বিরোধীরা আক্রমণ করে। বিদ্রোহীরা আওয়াজ তোলে। উদাসীন মানুষ কিছুই করে না। তারা শুধু সরে যায়। তারা ফোন ধরে না। সভায় আসে না। মঞ্চে ওঠে না। স্লোগান দেয় না। আর এই নীরব সরে যাওয়া কোনও রাজনৈতিক দলের জন্য ভয়ঙ্কর সংকেত।

মঙ্গলবারের ধর্ণামঞ্চে তৃণমূলের বহু জনপ্রতিনিধি ঠিক এই কাজটিই করেছেন। তাঁরা নেত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে একটি শব্দও বলেননি। কিন্তু তাঁরা উপস্থিতও হননি। এবং কখনও কখনও এই নীরবতাই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হয়ে ওঠে।

সামনে কী?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবমূল্যায়ন করা বিপজ্জনক। ভারতীয় রাজনীতিতে খুব কম নেতা আছেন যাঁরা এতবার প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে শেষ বলে ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু ভুল। তবু এটাও সত্য যে মঙ্গলবারের ধর্ণা তাঁকে কোনও শক্তির বার্তা দেয়নি। বরং দিয়েছে সতর্কবার্তা। এটি এমন একটি দৃশ্য, যা প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করার কথা দলের নিজের নেতৃত্বকে। কারণ এখানে বিজেপি কোনও বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করেনি, কোনও বড় রাজনৈতিক আক্রমণও চালায়নি। তবু তৃণমূলের দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

ধর্ণামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। মাইকও ছিল। স্লোগানও ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান— অনুসারীদের দৃশ্যমান সমর্থন ছিল না।

আর সেই কারণেই মঙ্গলবারের ধর্ণা কেবল একটি ব্যর্থ কর্মসূচি নয়। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক আয়না, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নিজের বর্তমান অবস্থার একটি অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। একসময় যিনি একা লড়ে হাজার মানুষকে নিজের দিকে টেনে এনেছিলেন, আজ তাঁর ডাকে হাজার মানুষের মধ্যে কজন সাড়া দিচ্ছেন— সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর রাজনীতিতে এমন প্রশ্ন যখন প্রকাশ্যে উচ্চারিত হতে শুরু করে, তখন সংকট সাধারণত অনেকটাই গভীরে পৌঁছে গিয়েছে।