Table of Contents
হাইলাইটস:
- কলকাতার সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নতুন নাম হয়েছে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’।
- মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একে “ঐতিহাসিক ভুলের সংশোধন” বলে বর্ণনা করেছেন।
- কিন্তু ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, রাস্তার নামটি আসলে হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দির নামে ছিল না।
- রাস্তার নামকরণ হয়েছিল তাঁর কাকা, শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসক স্যার হাসান সুহরাওয়ার্দির নামে।
- ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কি ইতিহাসের দুই ভিন্ন ব্যক্তিকে এক করে দেখছে?
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার রাস্তার নাম বদল নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নাম পরিবর্তন ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল রাজনীতির নয়, ইতিহাসেরও। কলকাতা পুরসভা সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পার্ক সার্কাস সংলগ্ন সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নাম বদলে হবে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সিদ্ধান্তকে “ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে রাস্তার পুরনো নামটি এমন এক ব্যক্তির স্মৃতির সঙ্গে জড়িত, যিনি ১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী বলে বহু মানুষ মনে করেন।
কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
কারণ বহু ঐতিহাসিক দলিল এবং পুরনো পৌর নথি বলছে, সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নামকরণ হয়েছিল হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দির নামে নয়, বরং তাঁর কাকা স্যার হাসান সুহরাওয়ার্দির নামে।
কে ছিলেন হাসান সুহরাওয়ার্দি?
স্যার হাসান সুহরাওয়ার্দি ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও জনসেবক। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য। চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। ব্রিটিশ আমলে তিনি সামরিক চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং প্রশাসক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৩৩ সালে কলকাতা কর্পোরেশন পার্ক সার্কাস এলাকার একটি নতুন রাস্তার নামকরণ করে ‘সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউ’। কারণ ওই রাস্তার ধারে ছিল হাসান সুহরাওয়ার্দির বাসভবন ‘কাশানা’। সে সময় হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হননি। ফলে তাঁর নামে রাস্তার নাম হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
পুরনো ‘ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট’-এর নথিতেও উল্লেখ রয়েছে যে রাস্তার নামটি স্যার হাসান সুহরাওয়ার্দির সম্মানে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইতিহাসবিদ পি. থ্যাঙ্কাপ্পন নায়ারের গবেষণাগ্রন্থেও একই তথ্য পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
তাহলে বিতর্ক কোথায়?
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দি।
তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী এবং পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আজও তীব্র মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৪৬ সালের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ এবং পরবর্তী কলকাতা দাঙ্গার ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই তাঁকে ‘বুচার অফ বেঙ্গল’ বা ‘বাংলার কসাই’ বলে উল্লেখ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখন রাস্তার নাম বদলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন, তখন তিনি বলেন যে বহু দশক ধরে কলকাতার একটি প্রধান সড়ক এমন এক ব্যক্তির নাম বহন করেছে, যার উত্তরাধিকার শহরের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত।
সমালোচকদের বক্তব্য, এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় যে সরকার রাস্তার নামকে হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দির সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে রাস্তার নামটি ছিল হাসান সুহরাওয়ার্দির স্মৃতিতে।
ইতিহাস বনাম রাজনীতি
বিজেপির সমর্থকেরা বলছেন, নাম পরিবর্তনের বিষয়টি কেবল ইতিহাসের তথ্য নয়, স্মৃতির রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। তাঁদের যুক্তি, সুহরাওয়ার্দি পদবিটি কলকাতার বহু মানুষের কাছে ১৯৪৬ সালের রক্তাক্ত স্মৃতির প্রতীক। তাই গোপাল মুখার্জির মতো এক হিন্দু সমাজনেতার নামে রাস্তার নামকরণ যুক্তিসঙ্গত।
অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, কারও নাম পরিবর্তন করতে চাইলে সরকার অবশ্যই তা করতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে ইতিহাস বিকৃত করা চলতে পারে না। যদি রাস্তার নাম সত্যিই হাসান সুহরাওয়ার্দির নামে হয়ে থাকে, তাহলে তাঁকে হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দির সঙ্গে এক করে দেখানো একটি মৌলিক ঐতিহাসিক ভুল।
কংগ্রেস, তৃণমূল এবং বামপন্থী নেতারা অভিযোগ করেছেন যে সরকার ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে। তাঁদের মতে, একজন চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অবদানকে অস্বীকার করে তাঁকে অন্য একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
১৯৩৩ সালের তথ্য কী বলছে?
এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সময়কাল।
সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নামকরণ হয় ১৯৩৩ সালে। তখন হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দি এখনও বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নন, পাকিস্তানও সৃষ্টি হয়নি। তিনি তখনও সেই রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছাননি, যার জন্য পরবর্তীকালে তিনি পরিচিত হন। অন্যদিকে হাসান সুহরাওয়ার্দি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত উপাচার্য এবং জনজীবনের সম্মানিত ব্যক্তি।
এই কালানুক্রমিক তথ্যই ইতিহাসবিদদের যুক্তিকে শক্তিশালী করে। তাঁদের মতে, রাস্তার নামটি হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দির নামে হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই।
গোপাল মুখার্জি কে?
নতুন নামের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গোপাল মুখার্জিকে বিজেপি ও হিন্দু সংগঠনগুলি ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে। মুখ্যমন্ত্রীও তাঁকে “প্রকৃত রক্ষাকর্তা” বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গোপাল মুখার্জির ভূমিকা নিয়েও নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। ফলে নাম পরিবর্তনের বিতর্ক কেবল একজনকে সরিয়ে অন্যজনকে বসানোর বিষয় নয়; এটি ইতিহাসের স্মৃতি, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং পরিচয়ের রাজনীতির সংঘাতও।
শেষ কথা
সুহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নাম বদল এখন প্রশাসনিক বাস্তবতা। কিন্তু বিতর্ক থামেনি। মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে—সরকার কি সত্যিই একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধন করেছে, নাকি আরেকটি নতুন ঐতিহাসিক বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে?
প্রাপ্ত নথি, পুরনো পৌর রেকর্ড এবং গবেষণা বলছে, রাস্তার নামটি ছিল স্যার হাসান সুহরাওয়ার্দির স্মৃতিতে। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দির নাম ও তাঁর বিতর্কিত উত্তরাধিকার।
ফলে প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও অনিবার্য: কলকাতার এক ঐতিহাসিক রাস্তার নাম বদলের ক্ষেত্রে কি সত্যিই ইতিহাসের বিচার হয়েছে, নাকি হাসান ও হুসেন—দুই ভিন্ন সুহরাওয়ার্দিকে এক করে দেখার ফলেই এই বিতর্কের জন্ম?