Home খবর প্রাগৈতিহাসিক সাইবেরিয়ায় প্লেগের তাণ্ডব: ৫,৫০০ বছর আগের মহামারির সন্ধান

প্রাগৈতিহাসিক সাইবেরিয়ায় প্লেগের তাণ্ডব: ৫,৫০০ বছর আগের মহামারির সন্ধান

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
12 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • সাইবেরিয়ার প্রস্তরযুগের কবরস্থান থেকে প্লেগের প্রাচীনতম প্রমাণ মিলেছে।
  • গবেষকদের মতে, প্রায় ৫,৫০০ বছর আগে শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ মহামারি ছড়িয়েছিল।
  • মৃতদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই ছিল ১৫ বছরের কম বয়সি শিশু।
  • দাঁতের মজ্জা থেকে সংগৃহীত ডিএনএ বিশ্লেষণে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস জীবাণুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
  • গবেষণা বলছে, কাঁচা মারমট (এক ধরনের বড় কাঠবিড়ালি জাতীয় প্রাণী) খাওয়া বা জবাই করার সময় মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল।
  • এই আবিষ্কার মানব ইতিহাসে প্লেগের উৎপত্তি ও বিস্তারের ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্লেগ এমন এক রোগ, যার নাম শুনলেই মনে পড়ে মধ্যযুগের ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর কথা। ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া সেই মহামারি দীর্ঘদিন ধরে ঘনবসতিপূর্ণ শহর, ইঁদুর এবং পিসুর সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু নতুন এক গবেষণা দেখাচ্ছে, প্লেগের ইতিহাস আরও অনেক পুরোনো এবং তার সূচনা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে।

বিজ্ঞানীরা সাইবেরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি প্রস্তরযুগীয় কবরস্থানে এমন প্রমাণ পেয়েছেন, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রায় ৫,৫০০ বছর আগে শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্লেগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। এটি এখন পর্যন্ত চিহ্নিত সবচেয়ে প্রাচীন প্লেগ মহামারির নিদর্শন।

গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বৈকাল হ্রদের উত্তর-পশ্চিমে আঙ্গারা নদীর তীরবর্তী কয়েকটি কবরস্থান। বৈকাল পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং গভীরতম মিঠা জলের হ্রদ। এই অঞ্চলের উস্ত-ইদা নামের একটি কবরস্থানে বহু শিশু ও পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নতত্ত্ববিদরা জানতে চাইছিলেন, কেন এত বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটেছিল। নতুন ডিএনএ বিশ্লেষণ সেই রহস্যের সমাধান করেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ডিএনএ গবেষক রুয়ারিধ ম্যাকলিয়ড জানান, প্রথমে তারা এমন ফলের আশা করেননি। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যায়, কবরস্থানে সমাহিত বহু মানুষের শরীরে প্লেগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতি ছিল। তাঁর কথায়, “প্রাগৈতিহাসিক শিকারি-সংগ্রাহকদের মধ্যে প্লেগের এমন প্রমাণ পাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর।”

আন্তর্জাতিক গবেষক দলটি কবর থেকে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালের দাঁতের মজ্জা পরীক্ষা করে। দাঁতের ভেতরে সংরক্ষিত জৈব উপাদান হাজার হাজার বছর পরেও রোগজীবাণুর চিহ্ন ধরে রাখতে পারে। ৪২ জন মানুষের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৮ জনের মধ্যে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস জীবাণুর ডিএনএ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ শতাংশ নমুনায় প্লেগের উপস্থিতি মিলেছে।

গবেষকদের মতে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ এত পুরোনো নমুনায় ডিএনএ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই সংক্রমণের চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে কবরস্থানে সমাহিত অধিকাংশ মানুষই সম্ভবত প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন।

গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে যে একবার নয়, অন্তত দুটি বড় প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। প্রথম মহামারি শুরু হয়েছিল প্রায় ৫,৫০০ বছর আগে। দ্বিতীয়টি ঘটে তার ৪০০ থেকে ৬০০ বছর পরে। এর অর্থ, এই অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে প্লেগ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই জনগোষ্ঠীর মানুষ মারমট নামের এক ধরনের বড় মাটিখোঁড়া কাঠবিড়ালি শিকার করত। বর্তমানে মধ্য এশিয়া ও সাইবেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রাণী প্লেগ জীবাণুর প্রধান প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে পরিচিত। মারমট জবাই করা বা কাঁচা মাংস খাওয়ার সময় মানুষের শরীরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। আজও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে এই কারণে প্লেগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

গবেষকদের ধারণা, প্রথমে প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে জীবাণু আসে। এরপর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একই পরিবারের একাধিক সদস্য আক্রান্ত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে একই কবরেও তাদের সমাহিত করা হয়।

এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিশুদের ওপর রোগটির প্রভাব। উস্ত-ইদা ও আরেকটি কবরস্থানে সমাহিত মৃতদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ছিল ১৫ বছরের কম বয়সি। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বয়স্কদের মধ্যে হয়তো পূর্ববর্তী সংক্রমণের ফলে কিছুটা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শিশুদের শরীর সেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

প্লেগের প্রাচীনতম রূপ নিয়ে এতদিন বিতর্ক ছিল। অনেক গবেষক মনে করতেন, প্রাথমিক ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস খুব বেশি প্রাণঘাতী ছিল না। কারণ এতে এমন কিছু জিন অনুপস্থিত ছিল, যা পরবর্তী কালে পিসুর মাধ্যমে রোগ ছড়াতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সাইবেরিয়ার জীবাণুতে একটি শক্তিশালী বিষাক্ত প্রোটিন বা ‘সুপারঅ্যান্টিজেন’ ছিল। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত সক্রিয় করে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল।

গবেষণাটি আরও জানিয়েছে যে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস অন্তত ৫,৭০০ বছর আগে তার পূর্বসূরি ব্যাকটেরিয়া ইয়ারসিনিয়া সিউডোটিউবারকিউলোসিস থেকে পৃথক হয়ে একটি স্বতন্ত্র রোগজীবাণুতে পরিণত হয়। পূর্বসূরি জীবাণুটি সাধারণত জ্বর, পেটব্যথা, ডায়রিয়া ও বমির মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে।

মানব ইতিহাসে প্লেগের বিস্তার নিয়ে এই আবিষ্কার নতুন প্রশ্নও তুলেছে। এতদিন মনে করা হত কৃষিকাজের বিকাশ, স্থায়ী বসতি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরেই বড় ধরনের মহামারি সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সাইবেরিয়ার এই প্রমাণ দেখাচ্ছে, তুলনামূলকভাবে ছোট এবং বিচ্ছিন্ন শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীগুলিও প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগের আঘাতে বিপর্যস্ত হতে পারত।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় ইতিহাসবিদ স্যামুয়েল কোহনের মতে, এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখিয়েছে যে প্লেগ শুধু কৃষিভিত্তিক সভ্যতার সমস্যা ছিল না। মানবসমাজের আরও প্রাচীন পর্যায়েও এই রোগ মৃত্যুর ছায়া বিস্তার করেছিল।

মধ্যযুগের প্লেগ মহামারি সাধারণত ইঁদুর, পিসু ও জনবহুল শহরের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সাইবেরিয়ার প্রস্তরযুগীয় কবরস্থানগুলির তথ্য অন্য ছবি তুলে ধরছে। শিকারি-সংগ্রাহকদের জীবন প্রকৃতির অনেক কাছাকাছি ছিল। তারা নিয়মিত বন্য প্রাণীর সংস্পর্শে আসত। ফলে প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে রোগজীবাণু প্রবেশের ঝুঁকিও ছিল অনেক বেশি।

এই আবিষ্কার শুধু প্লেগের ইতিহাস নয়, মানবসভ্যতার রোগ-সংক্রান্ত অতীত বোঝার ক্ষেত্রেও এক নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে ছোট ছোট শিকারি গোষ্ঠীর মধ্যে যে মহামারি ছড়িয়েছিল, তার ছাপ আজও রয়ে গেছে কবরের মাটির নিচে, দাঁতের মজ্জায় সংরক্ষিত ক্ষুদ্র ডিএনএ অণুতে। আধুনিক বিজ্ঞান সেই নীরব সাক্ষ্যকে পড়ে মানবজাতির বহু পুরোনো এক বিপর্যয়ের গল্প আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles