Home International ট্রাম্পকে থামালেন এমবিএস? নেপথ্যের ফোনালাপে কী ঘটেছিল

ট্রাম্পকে থামালেন এমবিএস? নেপথ্যের ফোনালাপে কী ঘটেছিল

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
14 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ইরানে নতুন হামলার ঠিক আগে ট্রাম্পকে ফোন সৌদি যুবরাজের। জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে পাল্টা আঘাতে গোটা উপসাগর অশান্ত হয়ে উঠতে পারে—উদ্বেগ জানিয়ে কূটনীতির পথেই থাকার পরামর্শ রিয়াদের।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বড় সামরিক অভিযানের ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রাম্পকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শনিবারের ওই ফোনালাপে এমবিএস জানতে চান, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছে এবং তার পরিসর কতটা হতে পারে। একই সঙ্গে বড় আকারের হামলার বদলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

রিয়াদের ভয়, পাল্টা হামলায় জ্বলবে উপসাগর

অ্যাক্সিওসের দাবি, দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং আলোচনার সঙ্গে পরিচিত আরও এক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বের মূল আশঙ্কা ছিল—ইরানের ওপর নতুন মার্কিন হামলা হলে তেহরান পাল্টা সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের তেল ও গ্যাস পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করতে পারে।

এক মার্কিন কর্মকর্তার কথায়, সৌদি আরব মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা চাইছিল এবং নিজেদের উদ্বেগও জানিয়েছিল। অন্য একটি সূত্রের দাবি, এমবিএস সরাসরি ট্রাম্পকে হামলা না চালানোর অনুরোধ করেন।

তবে ফোনালাপ নিয়ে হোয়াইট হাউস বা ওয়াশিংটনে সৌদি দূতাবাস কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

ফোনের আগেই ওয়াশিংটনে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের কয়েক দিন আগেই সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স-সহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করেন তিনি।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই বৈঠকগুলিতেও সৌদি আরব সংঘাত আরও বাড়ানো থেকে বিরত থাকার বার্তা দিয়েছিল।

ইরান সংকটের পুরো সময়জুড়েই রিয়াদ নেপথ্যে থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। তবে দুই দেশের সব বিষয়ে অবস্থান যে এক, তা নয়।

ফোনের কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্পের ‘ব্রেক’

এমবিএসের সঙ্গে ফোনালাপের কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা করেন, আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা স্থগিত রাখছেন তিনি।

ট্রাম্পের দাবি, মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছে। সেই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থেকে তৈরি হুমকির অবসানের মতো বিষয় রয়েছে।

তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে জানিয়েছেন, দ্রুত চুক্তি না হলে সামরিক বিকল্প আবারও তাঁর বিবেচনায় ফিরতে পারে।

অর্থাৎ, যুদ্ধের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি তিনি—শুধু আপাতত সামরিক পদক্ষেপে ব্রেক কষেছেন।

এখনও চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি নয়

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি বা চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত।

আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার দাবি, সম্ভাব্য সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলির আঞ্চলিক হামলা বন্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরমাণু আলোচনা ফের শুরু করার বিষয় থাকতে পারে।

এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটিকে ফের তেল রফতানির সুযোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে।

সৌদির আসল চিন্তা তেল

রিয়াদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা।

সৌদি নেতৃত্বের আশঙ্কা, ইরানের বিরুদ্ধে বড় মার্কিন অভিযান শুরু হলে তেহরান পাল্টা সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে।

এমন ঘটনা শুধু উপসাগরীয় দেশগুলির নিরাপত্তার জন্যই বিপজ্জনক হবে না। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যেও।

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাও নিশ্চিত করেছে যে, ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণার আগে এমবিএস তাঁর সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছিলেন।

একসঙ্গে নড়ছে একাধিক কূটনৈতিক সুতো

শুধু সৌদি আরব নয়, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, তুরস্ক ও পাকিস্তানও ওয়াশিংটন এবং তেহরান—উভয় পক্ষকেই উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেন।

আরাঘচি সতর্ক করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরায়েলের যে কোনও হামলা কিংবা তাতে আঞ্চলিক দেশগুলির সহযোগিতার জবাব “দৃঢ় ও সমানুপাতিক” হবে।

এদিকে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ, ওমানি প্রতিনিধিদের এবং ইরানি পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালাচ্ছেন। আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়ার পথ খোঁজা।

তেহরানের অন্দরেও মতভেদ

এপি জানিয়েছে, আলোচনায় বসা নিয়েও ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

একটি অংশ কোনও পরিস্থিতিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যেতে চায় না। অন্য অংশের যুক্তি, সামরিক চাপ বজায় রেখেই আলোচনার টেবিলে বসলে তেহরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে।

ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণার পর ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, দেশটি “বিস্মিত নয় বা নিষ্ক্রিয়ও নয়” এবং বাস্তব সামরিক হুমকি তৈরি হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।

ইরান নিয়ে কূটনীতি, গাজায় যুদ্ধ অব্যাহত

ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও গাজায় সংঘর্ষ থামেনি।

এপি-র খবর অনুযায়ী, রবিবার ইজরায়েলি হামলায় অন্তত ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ইজরায়েলি এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব নিয়ে ইজরায়েলের গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে এবং তা হোয়াইট হাউসকে জানানো হয়েছে।

ইজরায়েলি সেনাবাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, তাদের সাম্প্রতিক হামলার লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র যোদ্ধারা।

এমবিএসের ফোন কতটা বদলাল হিসাব?

ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণার আগে এমবিএসের ফোনালাপ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হয়েছে। তবে ফোনের কারণেই ট্রাম্প সিদ্ধান্ত বদলেছেন—এমন সরাসরি প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

তবে ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে: ইরানে নতুন মার্কিন হামলা শুধু ওয়াশিংটন-তেহরানের সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো, তেলের বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও তার ধাক্কা খেতে পারে।

তাই সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলির কাছে এখন যুদ্ধ থামানোর প্রশ্নটি শুধু কূটনীতির নয়—নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে বাঁচানোরও প্রশ্ন।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles