সেউতা সংকটে শেনগেনেই টান! ইউরোপে ফের অভিবাসন ঝড়

যা জানা জরুরি
- সীমান্ত কড়া করার দাবি মেলোনি-লে পেনের, শেনগেন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন স্পেনের উত্তর আফ্রিকীয় স্বশাসিত অঞ্চল সেউতাকে ঘিরে ফের উত্তপ্ত ইউরোপের অভিবাসন রাজনীতি।
- মরক্কো থেকে অভিবাসীদের নজিরবিহীন প্রবেশের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তনীতি, শেনগেন ব্যবস্থা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
- ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেন ইতিমধ্যেই আরও কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল করেছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মরক্কো থেকে সেউতায় অভিবাসীদের নজিরবিহীন ঢল। সীমান্ত কড়া করার দাবি মেলোনি-লে পেনের, শেনগেন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন
স্পেনের উত্তর আফ্রিকীয় স্বশাসিত অঞ্চল সেউতাকে ঘিরে ফের উত্তপ্ত ইউরোপের অভিবাসন রাজনীতি। মরক্কো থেকে অভিবাসীদের নজিরবিহীন প্রবেশের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তনীতি, শেনগেন ব্যবস্থা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেন ইতিমধ্যেই আরও কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল করেছেন। লে পেন এমনকি ২০২৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতলে শেনগেন অঞ্চলে অবাধ যাতায়াতের অধিকার কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২ জন নেতা যৌথ চিঠিতে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জরুরি ভিত্তিতে সদস্য দেশগুলির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘটনাটিকে “বিপর্যয়কর” বলে মন্তব্য করেছেন।
সেউতায় ঠিক কী ঘটেছে?
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত হলেও সেউতা স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন। প্রায় ৮৫ হাজার মানুষের এই শহরে স্প্যানিশ ও মরক্কোর বাসিন্দারা বসবাস করেন।
গত এক সপ্তাহে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এই বিপুল ঢলের পেছনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়ের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। ওই রায়ে সমুদ্রপথে পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল।
তবে রায়টির অর্থ এই নয় যে ওই ব্যক্তিরা স্পেনে স্থায়ীভাবে থাকার অধিকার পেয়ে গিয়েছেন বা ভবিষ্যতে তাঁদের বহিষ্কার করা যাবে না।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ-এর অভিযোগ, মানবপাচার চক্র আদালতের রায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ব্যাখ্যা করে মানুষকে সেউতার দিকে যেতে উৎসাহিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর প্রচারও পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেউতা-মরক্কো সীমান্তে প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ নতুন সামুদ্রিক প্রতিবন্ধক বসিয়েছে স্পেন। কঠোর নিরাপত্তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে কয়েক হাজার অভিবাসী ইতিমধ্যেই মরক্কোয় ফিরে গিয়েছেন।
সেউতা নিয়ে এত হইচই কেন?
২০১৫ সালের অভিবাসী সংকটের পর থেকেই ইউরোপীয় রাজনীতিতে অভিবাসন অন্যতম বড় ইস্যু। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, আফগানিস্তানের অস্থিরতা, আরব বসন্তের পরবর্তী পরিস্থিতি এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন সংকটে সে সময় ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছেছিলেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সংকটকে ঘিরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলির সমর্থন বাড়তে শুরু করে।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণও হয়ে ওঠে তাদের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান অস্ত্র।
সেউতার সাম্প্রতিক ঘটনা সেই রাজনৈতিক প্রবণতাকেই আরও উসকে দিয়েছে। ইতালি ও ফ্রান্সে সামনে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন থাকায় অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
কেন শেনগেন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে?
১৯৮৫ সালে ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং লুক্সেমবার্গের উদ্যোগে শেনগেন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ২৯টি দেশ এর অন্তর্ভুক্ত।
এই ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, সদস্য দেশগুলির মধ্যে অভ্যন্তরীণ সীমান্তে নিয়মিত পাসপোর্ট পরীক্ষা ছাড়াই যাতায়াতের সুযোগ।
কিন্তু সেউতার মতো সীমান্ত সংকটের পর প্রশ্ন উঠছে—এই অবাধ চলাচলের ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অভিবাসীরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারেন কি না।
ফলে সীমান্তে অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ ফেরানো থেকে শুরু করে শেনগেন ব্যবস্থার কাঠামোই পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ শুধু কট্টর ডানপন্থীরাই নন, ডেনমার্কের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন-ও শেনগেন ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনার পক্ষে মত দিয়েছেন।
অর্থাৎ, অভিবাসন প্রশ্নে ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিও ধীরে ধীরে কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে।
ডানপন্থার ঢেউ আরও জোরালো?
২০১৫ সালের পর থেকে জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (AfD), ইতালির ব্রাদার্স অব ইতালি এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালির মতো দলগুলির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
২০২৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দলগুলি মোট ভোটের প্রায় ২৭ শতাংশ পায়। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাবও বেড়েছে।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার জন্য চাপও সেই সঙ্গে বাড়ছে।
স্পেন কেন অন্য পথে?
এই আবহে স্পেনের নীতি ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় আলাদা।
সানচেজ সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বসবাস ও কাজ করা নথিহীন অভিবাসীদের বৈধ মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এর পেছনে অন্যতম কারণ দেশের দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যা এবং তার ফলে তৈরি হওয়া শ্রমশক্তির ঘাটতি। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সরকার টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থনও সানচেজের প্রয়োজন।
কিন্তু সেউতার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই উদার অভিবাসন নীতির উপরই নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সামনে বড় পরীক্ষা ইউরোপের
সেউতা সংকট তাই শুধু একটি সীমান্তে অভিবাসীদের ঢল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানবিক দায়িত্ব বনাম সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ বনাম অবাধ চলাচল এবং জাতীয় স্বার্থ বনাম ইউরোপীয় ঐক্যের প্রশ্ন।
২০২৭ সালের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, অভিবাসন ইস্যুটি ইউরোপের রাজনীতিতে আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
সেউতা সেই বৃহত্তর লড়াইয়েরই নতুন ফ্রন্ট—যেখানে প্রশ্ন শুধু কে সীমান্ত পেরোবে তা নয়, ইউরোপের দরজা আদৌ কতটা খোলা থাকবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



