বাংলাস্ফিয়ার: টানা কয়েক দিন অচলাবস্থার পর মঙ্গলবার ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরল সংসদ। লোকসভায় শুরু হল পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) সংশোধনী বিল, ২০২৬ নিয়ে দীর্ঘ ও উত্তপ্ত আলোচনা। সরকার এই বিলকে স্বাধীনতার পর দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে ‘প্রথম এবং ঐতিহাসিক’ পদক্ষেপ বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, এটি বাস্তব সমস্যার সমাধান নয়, বরং ‘লোকদেখানো সংশোধনী’। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি বলপ্রয়োগ এবং ধারাবাহিক প্রশ্নফাঁসের দায় নিয়েও কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ শানায় বিরোধী শিবির।

বিলটি পেশ করে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং বলেন, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই ধরনের আইন এই প্রথম আনা হচ্ছে। তাঁর দাবি, কেন্দ্রের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র কঠোর শাস্তির বিধান করা নয়, বরং দেশের কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। তিনি বলেন, আগের আইনের সঙ্গে এই সংশোধনী মিলিয়ে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে পরীক্ষা ব্যবস্থায় কোনও ধরনের অনিয়ম বা প্রশ্নফাঁস বরদাস্ত করা হবে না।

মন্ত্রী জানান, গত কয়েক বছরে প্রযুক্তির অপব্যবহার, সংগঠিত অপরাধচক্র এবং আন্তঃরাজ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরীক্ষায় জালিয়াতির প্রবণতা বেড়েছে। সেই কারণেই বিদ্যমান আইনকে আরও কার্যকর ও কঠোর করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই সংশোধনী পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা এবং বিচারব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দেবে।

সরকারের দাবি, সংশোধিত বিলে প্রশ্নফাঁস বা সংগঠিত পরীক্ষা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে, যাতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে না থাকে। একই সঙ্গে অপরাধচক্রের আর্থিক লেনদেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সংগঠিত চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও বাড়বে বলে সরকারের বক্তব্য।

বিরোধী দলগুলি অবশ্য সরকারের এই দাবি মানতে রাজি হয়নি। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস-সহ একাধিক দলের সাংসদেরা অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র আইন কঠোর করলেই প্রশ্নফাঁস বন্ধ হবে না। তাঁদের মতে, বারবার জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, অথচ দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নতুন আইন আনা হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ নিয়েই বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বিরোধীদের আরও অভিযোগ, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের মূল কারণ ছিল পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা। সেই অসন্তোষের জবাবে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনায় বসার বদলে পুলিশি কড়াকড়ি, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং গ্রেফতারের পথ বেছে নিয়েছে সরকার। সংসদে কয়েকজন সদস্য বলেন, ছাত্রদের উদ্বেগের উত্তর আইন দিয়ে দেওয়া যায় না; প্রয়োজন স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।

সরকারি পক্ষ অবশ্য পাল্টা যুক্তি দেয়, আইন এবং প্রশাসনিক সংস্কার—দু’টিই সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে। জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। তাদের বক্তব্য, শুধুমাত্র সমালোচনা না করে বিরোধীদেরও ছাত্রদের স্বার্থে এই আইনের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

শাসক দলের সদস্যরা বলেন, কোটি কোটি পরিশ্রমী পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষা করাই এই বিলের মূল লক্ষ্য। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলিকে কঠোর বার্তা দিতে এই সংশোধনী অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, আইন যতই কঠোর হোক, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের আবহে এই বিলের ওপর আলোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার একে পরীক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধীরা এটিকে বাস্তব সংস্কারের বদলে প্রতীকী উদ্যোগ বলেই অভিহিত করেছে। ফলে বিলটি নিয়ে সংসদের বিতর্কে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর আইন প্রয়োজন কি না, তার চেয়েও বড় বিতর্ক এখন সেই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে।