হাইলাইটস:

  • ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে ইতালির একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির প্রভাব নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।
  • স্বাগতিক দেশকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ বিশ্বকাপের ইতিহাসে বারবার উঠেছে।
  • রেফারিং বিতর্ক, বিদেশি খেলোয়াড়কে নাগরিকত্ব দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে।
  • ২০১৫ সালের দুর্নীতি কাণ্ডে ফিফার ৪০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছিলেন।
  • রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যেও বিশ্বকাপ আয়োজন অব্যাহত রেখেছে ফিফা।
  • ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নতুন সুযোগের পাশাপাশি নতুন বিতর্কের সম্ভাবনাও বাড়িয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল পরিচালনা করেছিলেন এক তরুণ সুইডিশ রেফারি। আজও একটি প্রশ্ন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হয়ে রয়েছে—সেমিফাইনালের আগের রাতে কি সত্যিই তিনি ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে নৈশভোজে বসেছিলেন? আর সেখানে কি তিনি স্বাগতিক ইতালিকে সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন?

এমন অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসে ষড়যন্ত্র, বিতর্ক এবং সন্দেহের যে দীর্ঘ ছায়া রয়েছে, তার সূচনা যেন সেখান থেকেই।

বিশ্বকাপের প্রথম আসর ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়। সেই টুর্নামেন্টও ছিল নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রধান স্টেডিয়াম সময়মতো প্রস্তুত হয়নি। অংশগ্রহণের কথা থাকলেও মিশরীয় দল জাহাজ মিস করে প্রতিযোগিতায় পৌঁছতে পারেনি। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলির অনীহায় ক্ষুব্ধ উরুগুয়ে চার বছর পরে ইতালির বিশ্বকাপ বয়কট করে। আজও সেটিই একমাত্র ঘটনা, যেখানে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দল পরবর্তী বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি।

স্বাগতিক দেশকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন নয়। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের পর লাতিন আমেরিকার বহু মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন যে পুরো প্রতিযোগিতাটিই ইউরোপীয় দলগুলির সুবিধার্থে সাজানো হয়েছিল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে বহিষ্কার করা হয়। আবার পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে উরুগুয়ের দুই খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডই শিরোপা জেতে, আর সন্দেহ আরও গভীর হয়।

২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপে অভিযোগের তীর ঘুরে যায় এশিয়ার দিকে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রথমে ইতালিকে এবং পরে স্পেনকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়। কিন্তু দুটি ম্যাচই রেফারিং বিতর্কে কলঙ্কিত হয়। ইতালির একটি বৈধ গোল বাতিল করা হয়, একজন তারকা ফুটবলারকে বহিষ্কার করা হয়। স্পেনের বিরুদ্ধেও একাধিক সিদ্ধান্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে। ক্ষুব্ধ ইতালীয় রাজনীতিক ফ্রাঙ্কো ফ্রাত্তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “মনে হচ্ছিল যেন কোথাও বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আমাদের বিদায় করার।”

তবে বিতর্ক শুধু রেফারিংকে ঘিরে নয়। মুসোলিনি আরেকটি পদ্ধতিরও পথিকৃৎ ছিলেন—বিদেশি ফুটবলারদের দ্রুত নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করা। ১৯৩৪ সালের ইতালি দলে এমন পাঁচজন খেলোয়াড় ছিলেন, যারা এর আগে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন।

পরবর্তীকালে এই প্রবণতা এতটাই বেড়ে যায় যে ২০০৬ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের উদ্দেশ্যে কাতার তিনজন ব্রাজিলীয় ফুটবলারকে নাগরিকত্ব দেয়। এর পরেই ২০০৪ সালে ফিফা নিয়ম বদল করে জানায়, জাতীয় দল পরিবর্তন করতে হলে নতুন দেশের সঙ্গে খেলোয়াড়ের প্রকৃত ও স্পষ্ট সম্পর্ক থাকতে হবে।

আরেক ধরনের অভিযোগ হল প্রতিপক্ষকে গোপনে দুর্বল করে দেওয়া। যদিও এর কোনও প্রমাণিত নজির নেই, তবুও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অভাব নেই। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপকে ঘিরে ইংল্যান্ড সমর্থকদের মধ্যে আজও সন্দেহ রয়েছে। অধিনায়ক ববি মুরকে একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কস অসুস্থ হয়ে পড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলতে পারেননি। তিনি পরে দাবি করেছিলেন, একটি সন্দেহজনক বিয়ার পান করার পরই তাঁর সমস্যা শুরু হয়।

এমনকি সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে ব্রাজিলের সামরিক শাসনকে জনপ্রিয়তা দেওয়ার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নাকি ব্যাঙ্কসকে বিষ প্রয়োগ করেছিল। যদিও এ ধরনের অভিযোগের কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালেও একই ধরনের গুজব ছড়ায়। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের তারকা স্ট্রাইকার রোনালদোর নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের জন্য অনেকেই বিষক্রিয়াকে দায়ী করেছিলেন।

এইসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে বিশ্বকাপ মানুষের আবেগের কতটা গভীরে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল টেলিভিশনে দেখেছিলেন প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ। ফলে সম্প্রচার অধিকার, স্পনসরশিপ, লাইসেন্স, টিকিট এবং আতিথেয়তা খাত থেকে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হয়। ফিফা চলতি বছরে প্রায় ৮৯০ কোটি ডলার আয়ের আশা করছে।

এই বিপুল অর্থের বণ্টন নিয়েও দীর্ঘদিন প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডের তদন্তে ফিফার দুর্নীতির বিশাল চিত্র সামনে আসে। ৪০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা অভিযুক্ত হন। তখনকার সভাপতি সেপ ব্লাটার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি জেফ্রি ওয়েব একাধিক অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন।

শেষ পর্যন্ত ফিফার নেতৃত্বে আসেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, তাঁর আমলেও ফিফার ভাবমূর্তি পুরোপুরি বদলায়নি। অনেকের প্রশ্ন, আবহাওয়া ও সংস্কৃতিগত নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কেন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ কাতারে আয়োজন করা হয়েছিল?

ফিফার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঝড়ঝাপটা সামলে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। ১৯৩৮ সালে জার্মানির অস্ট্রিয়া দখল বিশ্বকাপকে এক দল কমিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু টুর্নামেন্ট থামেনি। ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করার পরও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার হারায়নি।

এমনকি যুদ্ধরত দেশগুলিও একই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধ চলাকালীন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড দু’দেশই স্পেন বিশ্বকাপে খেলেছিল। যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছিল আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের পরের দিন।

এবারের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হয়েছে। ফলে ম্যাচ, দর্শক এবং অর্থনৈতিক লাভ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সংঘাত, অভিযোগ এবং বিতর্কের সম্ভাবনাও।

ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো আশা প্রকাশ করেছেন, বিশ্বকাপ বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করবে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ যতটা ফুটবলের উৎসব, ততটাই বিতর্ক, অভিযোগ, আবেগ এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্র। তাই সম্ভবত এক বিষয়েই বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী একমত হবেন—বিশ্বকাপ কখনও শুধু ফুটবল নয়; এটি মানুষের আবেগ, রাজনীতি, অর্থ এবং ক্ষমতার এক বিশাল নাট্যমঞ্চ।