Home খবর ওবামা প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টার: ইতিহাস, স্মৃতি ও আত্মমুগ্ধতার স্থাপত্য

ওবামা প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টার: ইতিহাস, স্মৃতি ও আত্মমুগ্ধতার স্থাপত্য

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
13 views 5 minutes read
A+A-
Reset

Barack Obama-র নতুন প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টারটি শিকাগোর দক্ষিণাংশে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ব্রুটালিস্ট জিগুরাটের মতো। আটতলা কংক্রিটের এই স্থাপনা, গ্রানাইটে মোড়া দেয়াল ও বিশাল প্রাঙ্গণ নিয়ে, আশপাশের সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। ধূসর রঙের আধিপত্যে এর চেহারা যেন সোভিয়েত বিজ্ঞান-কল্পকাহিনির কোনো ভবিষ্যৎ নগরী—আশির দশকের মস্কো আর Dune-এর জগতের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

১৯ জুন জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া এই কেন্দ্রটির নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৮৫ কোটি ডলার। ফলে এটি এখন পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির মূল উদ্দেশ্য হলো সাবেক রাষ্ট্রপতিদের সরকারি নথি ও দলিল সংরক্ষণ করা। কিন্তু এর আরেকটি, আরও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যও রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সাবেক প্রেসিডেন্টদের নিজেদের সাফল্য তুলে ধরতে, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে এবং নিজেদের জীবনকাহিনি নিজেদের ভাষায় উপস্থাপন করতে সুযোগ দেয়—বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক বা প্রতিবাদকারীদের হস্তক্ষেপ ছাড়াই।

এই ব্যবস্থাটি বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় ব্যতিক্রমী। অনেক দেশে রাষ্ট্রপ্রধানদের নথি সরকারি আর্কাইভে সংরক্ষিত হয়, আবার কোথাও কোথাও তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে জাদুঘর বা স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি ধারণাকে একত্র করেছে। ব্যক্তিগত অনুদানে নির্মিত হয় লাইব্রেরি, আর সরকারি সংস্থা নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে।

এটি এমন এক ব্যবস্থা, যা রাষ্ট্রপতিকে কার্যত রাজকীয় মর্যাদার কাছাকাছি নিয়ে যায়। সংবিধান অনুযায়ী তিনি সরকারের তিনটি সমান শাখার একটির প্রধান হলেও, প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি তাঁকে ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে দেওয়ার আইনি অধিকার প্রদান করে।

এই প্রথার সূচনা হয় Franklin D. Roosevelt-এর আমলে। তার আগে রাষ্ট্রপতিরা সাধারণত নিজেদের কাগজপত্র Library of Congress-এ দান করতেন। কিন্তু বাস্তবে বহু গুরুত্বপূর্ণ দলিল হারিয়ে যেত বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ত।

১৯৫৫ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিজ অ্যাক্ট প্রথমবারের মতো ফেডারেল সরকারকে রাষ্ট্রপতিদের নথি সংরক্ষণের ক্ষমতা দেয়। পরে ১৯৭৮ সালের আরেকটি আইনে রাষ্ট্রপতির সরকারি কাগজপত্রকে সরকারের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যদিও Donald Trump এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং নিজের নথির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেয়েছেন, কোনো আদালত এখনও তাঁর যুক্তি সমর্থন করেনি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি ডলার ব্যয় করে এসব লাইব্রেরির রক্ষণাবেক্ষণে। তবে নির্মাণ ব্যয় ক্রমেই বেড়ে চলেছে, আর ওবামা সেন্টার সেই প্রবণতার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ।

এই কেন্দ্রটির বিশেষত্ব হলো এটি নিজেকে প্রথম “সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি” বলে দাবি করছে। ওবামার নথিপত্র অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রচলিত প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির মতো এটি সরাসরি সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে না।

সরকারি সংস্থা National Archives and Records Administration (এনএআরএ) ডিজিটাল আর্কাইভ এবং কিছু নথি সংরক্ষণ করবে বটে, কিন্তু পুরো কমপ্লেক্স পরিচালনা ও অর্থায়নের দায়িত্ব থাকবে ওবামা ফাউন্ডেশনের হাতে। ফলে এটি কার্যত একটি বেসরকারি জাদুঘরের মতো পরিচালিত হবে।

ওবামার দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা Valerie Jarrett বলেছেন, এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। সমালোচকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বাজেট বা প্রদর্শনীর ওপর সরকারি প্রভাব ঠেকানো। তবে এর ফলে ওবামার উত্তরাধিকারকে নিজের মতো করে সাজানোর স্বাধীনতাও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

এই প্রশ্ন—ইতিহাস নাকি আত্মপ্রচার—প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিগুলোর ক্ষেত্রে নতুন নয়।

Richard Nixon নিজের লাইব্রেরির ওয়াটারগেট প্রদর্শনী তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা নিয়েছিলেন। পরে এনএআরএ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেই প্রদর্শনী বদলে আরও সমালোচনামূলক করা হয়।

Ronald Reagan-এর লাইব্রেরিতে প্রথমদিকে ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারির উল্লেখই ছিল না। আর Lyndon B. Johnson-এর লাইব্রেরি বহু বছর ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে কার্যত নীরব ছিল।

একইভাবে ওবামা সেন্টারেও তাঁর প্রশাসনের সময়কার রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী বহিষ্কারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

এসব লাইব্রেরিতে প্রায়শই ইতিহাসের তুলনায় আড়ম্বর বেশি গুরুত্ব পায়। রেগানের লাইব্রেরিতে রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স ওয়ান, রাষ্ট্রপতির লিমুজিন এবং হেলিকপ্টার। জনসনের লাইব্রেরিতে আছে রাষ্ট্রপতির আকৃতির কথা বলা পুতুল। অনেক লাইব্রেরিতেই ওভাল অফিসের হুবহু প্রতিরূপ তৈরি করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা প্রেসিডেন্টের আসনে বসার অভিজ্ঞতা নিতে পারেন।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলায়। রুজভেল্টের লাইব্রেরিতে এখন তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ইহুদি শরণার্থীদের গ্রহণে অনীহার মতো অস্বস্তিকর বিষয়ও তুলে ধরা হয়।

ওবামা সেন্টার তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন। রাজনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ভেতরের নকশা সমসাময়িক শিল্প জাদুঘরের মতো। গাঢ় কাঠ, উজ্জ্বল চিত্রকর্ম এবং সুচিন্তিত আলোকসজ্জা একে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

গাইডরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে জাদুঘরের সংগীত নির্বাচন করেছেন স্বয়ং ওবামা। এমনকি সেখানে প্রদর্শিত বইগুলোর তালিকাও তাঁর পছন্দ অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।

বিপুল ব্যয়ের আরেকটি কারণ এর সুযোগ-সুবিধা। প্রায় ৬০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে রয়েছে অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া অবকাঠামো, যার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাস্কেটবল কোর্টও আছে।

Michelle Obama-এর বিশেষ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে একটি উঁচু ঢালু টিলা, যেখানে শিশুরা শীতে স্লেজ চালাতে পারবে। তিনি বলেছেন, ছোটবেলায় এমন একটি জায়গা তাঁর ছিল না। ভবনের ছাদজুড়ে রয়েছে সবজি বাগান, যা ওবামা হোয়াইট হাউসের উদ্যোগেরই সম্প্রসারণ।

ওবামার সমর্থকেরা এই কেন্দ্রকে ভালোবাসবেন। সমালোচকেরা হয়তো একে দেখবেন তাঁর প্রেসিডেন্সির মতোই—চকচকে, দক্ষভাবে নির্মিত, কিন্তু অতিরিক্ত পরিকল্পিত ও আত্মপ্রচারমূলক। একই কথা ভিন্নভাবে প্রযোজ্য George W. Bush-এর ডালাসের কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও।

রাজনৈতিক পক্ষপাত সরিয়ে রাখলে, উভয় প্রতিষ্ঠানই মানুষের এক চিরন্তন প্রবৃত্তির প্রতিফলন—নিজের গল্প নিজে বলার আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিজের উত্তরাধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।

ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিগুলো আরও জটিল হয়ে উঠবে। ইমেল, মেসেজিং অ্যাপ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা সরকারি যোগাযোগের যুগে কোনটি ব্যক্তিগত আর কোনটি সরকারি নথি—এই সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হচ্ছে।

যদি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতিরাও ওবামার মডেল অনুসরণ করে নিজেদের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এসব কেন্দ্র পরিচালনা করেন, তাহলে প্রদর্শনীগুলো আরও বেশি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে।

প্রশ্ন থেকে যায়—একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির স্মৃতির জন্য প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি ব্যয় কি যুক্তিসঙ্গত? গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি তো শেষ পর্যন্ত একজন জনসেবকই। কিন্তু আধুনিক আমেরিকার রাজনীতিতে অনেকেই আর নিজেদের শুধু জনসেবক হিসেবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী নন। প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিগুলো সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই সবচেয়ে দৃশ্যমান স্থাপত্যিক প্রতীক।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles