Home সংস্কৃতি ও বিনোদন পরিশ্রমেই বাজিমাত!

পরিশ্রমেই বাজিমাত!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
13 views 6 minutes read
A+A-
Reset

ন’বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো। ১৩-তেই ঘরে ঘরে পরিচিতি। তার পর টেলিভিশন পেরিয়ে সলমন খানের ছবিতে বড় পর্দায় অভিষেক, আর এখন নেটফ্লিক্সের মুখ। মহিমা মাকওয়ানার পথচলা নিছক সাফল্যের গল্প নয়, বরং একের পর এক ধাপ পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। আর এই দীর্ঘ যাত্রায় সলমন খানের দেওয়া একটি পরামর্শ এখনও মনে গেঁথে রয়েছে তাঁর—কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই।

শিশুশিল্পী হিসেবে ‘বালিকা বধূ’-তে অভিনয় দিয়ে শুরু হয়েছিল মহিমার পথচলা। তবে সেই সময়ের স্মৃতি তাঁর প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁর কাছে আসল মোড় আসে ‘সপনে সুহানে লড়কপন কে’-তে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

মহিমার কথায়, ‘‘বালিকা বধূ-তে কাজ করার কোনও স্মৃতি আমার নেই। যে ধারাবাহিকটি আমাকে খ্যাতি, সাফল্য দিয়েছিল এবং ঘরে ঘরে পরিচিত করে তুলেছিল, সেটি ‘সপনে সুহানে লড়কপন কে’। তখন আমার বয়স ছিল ১৩ বছর।’’

শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, সেই সময়েই অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মহিমা। শুটিংয়ের ব্যস্ততা, ক্যামেরার চাপ কিংবা সেটের কঠিন পরিবেশ—কিছুই তাঁকে ভয় দেখায়নি। বরং ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর উত্তেজনাই তাঁকে টেনে রাখত।

টিভি ছিল তাঁর ‘স্কুল’

টেলিভিশন থেকে উঠে আসা অভিনেতাদের অনেক সময় বড় পর্দায় জায়গা পেতে অতীতের পরিচয়কে পিছনে ফেলার চেষ্টা করতে দেখা যায়। মহিমা অবশ্য সেই পথে হাঁটেননি। টেলিভিশন তাঁর কাছে কোনও বোঝা নয়, বরং অভিনয় শেখার সবচেয়ে বড় জায়গা।

এই প্রসঙ্গে তাঁর অনুপ্রেরণা শাহরুখ খান। টেলিভিশন থেকে উঠে এসে যিনি পরবর্তী সময়ে হিন্দি সিনেমার অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠেছেন।

মহিমা বলেন, ‘‘আমার সামনে অনেক উদাহরণ ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদাহরণ অবশ্যই শাহরুখ খান। আমার মনোভাব ছিল খুব পরিষ্কার—আমার অডিশন নিন। তার পরেও যদি কারও মনে হয় আমার সঙ্গে টেলিভিশনের বোঝা রয়েছে, তা হলে যা ভুলে যেতে হবে, ভুলব; নতুন করে যা শিখতে হবে, শিখব।’’

নিজের শিকড় অস্বীকার করার কোনও প্রয়োজনও তিনি দেখেননি। তাঁর কাছে টেলিভিশনের দিনগুলি ছিল শেখার সময়।

‘‘আমি কোথা থেকে এসেছি, সেটা মেনে নেওয়াটাই আসল। আমার টেলিভিশনের যাত্রাকে আমি কোনও দিন বোঝা বলে মনে করিনি। ওটাই ছিল আমার শেখার যুদ্ধক্ষেত্র, আমার অভিজ্ঞতা,’’ বলেন তিনি।

ছক ভাঙাই লক্ষ্য

‘সপনে সুহানে লড়কপন কে’-র সাফল্যের পর চেনা টেলিভিশন চরিত্রে আটকে থাকতে চাননি মহিমা। পরবর্তী কাজগুলিতে ইচ্ছাকৃত ভাবেই ভিন্ন ধরনের চরিত্র বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর কথায়, ‘‘আমি ভাগ্যবান যে যে সুযোগগুলি পেয়েছি এবং গ্রহণ করেছি, সেগুলি অনেকটাই অপ্রচলিত ছিল। সাধারণ দৈনিক ধারাবাহিকের চেনা চরিত্র ছিল না। আমার চেষ্টা বরাবরই ছিল স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার।’’

তবে টেলিভিশনে যতই সাফল্য আসুক, সিনেমার স্বপ্ন তাঁর ছিলই। তিনি জানতেন পথটা সহজ হবে না, তবু অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন।

‘‘আমি সব সময়ই জানতাম, এক দিন সিনেমার অংশ হতে চাই। সেটাই ছিল আমার স্বপ্ন। এটাও জানতাম, আমার জন্য পথটা কঠিন হবে। কিন্তু চেষ্টা আমাকে করতেই হত,’’ বলেন মহিমা।

অবশেষে সেই সুযোগ আসে ২০২১ সালে। আর প্রথম ছবিতেই সামনে সলমন খান।

প্রথম ছবিতেই সলমন!

‘অন্তিম: দ্য ফাইনাল ট্রুথ’-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক মহিমার। ছবিতে সলমন খান ও আয়ুষ শর্মার মতো তারকার পাশে তাঁর চরিত্রের দৈর্ঘ্য খুব বেশি ছিল না। কিন্তু সেই অল্প সময়ই তাঁর কেরিয়ারে বড় প্রভাব ফেলে।

মহিমার কথায়, ‘‘অন্তিম আমার জন্য অনেক দরজা খুলে দিয়েছিল। আমি কখনও কল্পনাও করিনি যে সলমন খানের ছবি দিয়ে আমার সিনেমার যাত্রা শুরু হবে। আমার চরিত্রটি ছিল মাত্র দশ মিনিটের। কিন্তু তার পর আমার যাত্রাটাই সম্পূর্ণ অন্য রকম হয়ে যায়।’’

প্রথম ছবির সেটে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর কাছে একেবারে নতুন। দীর্ঘদিন টেলিভিশনে কাজ করলেও সিনেমার সেটের পরিবেশ, কাজের ধরন এবং তারকাদের সঙ্গে কাজ—সবই নতুন করে শেখার সুযোগ করে দেয়।

আয়ুষের কাছেও শেখার ছিল

‘অন্তিম’-এর প্রস্তুতির সময় আয়ুষ শর্মার পরিশ্রমও কাছ থেকে দেখেছেন মহিমা। বিশেষ করে ছবির জন্য তাঁর শারীরিক প্রস্তুতি তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।

‘‘আয়ুষ অসম্ভব পরিশ্রমী। আবেগঘন দৃশ্যগুলিতেও খুব ভাল কাজ করেছিলেন। আমি তাঁকে হয় হাতে চিত্রনাট্য নিয়ে দেখেছি, নয়তো শরীরচর্চা করতে দেখেছি। তিনি সারাক্ষণ নিজেকে তৈরি করার মধ্যেই থাকতেন,’’ বলেন মহিমা।

তাঁর দাবি, ‘অন্তিম’-এর জন্য নিজের শরীর তৈরি করতে আয়ুষ প্রায় দুই থেকে তিন বছর পরিশ্রম করেছিলেন।

প্রথম ছবির ক্ষেত্রে এই ধরনের সহ-অভিনেতাদের কাছ থেকে শেখাটাই তাঁর কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

‘‘এটা আমার প্রথম ছবি ছিল। তাই আমি চেয়েছিলাম, আমার চারপাশে যেন সঠিক মানুষরা থাকেন,’’ বলেন তিনি।

সলমনের সেই এক কথা

প্রথম ছবিতে সলমন খানের মতো তারকার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ যে মহিমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল, তা বলাই যায়। কিন্তু আজ এত বছর পরেও তাঁর মনে সবচেয়ে বেশি গেঁথে আছে সলমনের দেওয়া একটি সহজ পরামর্শ।

মহিমা জানান, সলমন তাঁকে বুঝিয়েছিলেন—একটি ছবি সফল হবে কি না, বক্স অফিসে কত টাকা আয় করবে, বাজেট কতটা সফল হবে—এসব অভিনেতার হাতে নেই। কিন্তু নিজের কাজের প্রতি কতটা সৎ থাকবেন, কতটা পরিশ্রম করবেন, সেটা সম্পূর্ণ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত।

‘‘একেবারে শুরুতেই তিনি আমাকে একটি কথা বলেছিলেন—‘কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই। তোমাকে কাজটা করে যেতেই হবে।’ তিনি বলেছিলেন, একটি ছবির ভাগ্য কী হবে বা তার বাজেটের পরিণতি কী হবে, সেটা আমাদের হাতে থাকে না,’’ বলেন মহিমা।

এই কথাটিই ‘অন্তিম’-এর সেট থেকে পাওয়া তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

শূন্য থেকে উঠে আসা

পর্দার বাইরের মহিমার গল্পও কম কঠিন নয়। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে বাবাকে হারান তিনি। মুম্বইয়ের একটি চওলে মা-র সঙ্গে বেড়ে ওঠা। সংসার চালানো থেকে ভবিষ্যৎ গড়া—সবটাই সামলাতে হয়েছে মা-মেয়েকে মিলে।

শৈশবের সেই দিনগুলির স্মৃতি বলতে গিয়ে মহিমা বলেন, ভাল-মন্দ সবই মনে আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর অনুভূতি কৃতজ্ঞতার।

‘‘নিজের জন্য আমার অসম্ভব গর্ব হয়, কারণ আমি এবং আমার মা—আমরা দু’জনে মিলে জীবনে আজ যে জায়গায় পৌঁছেছি, সেটা অর্জন করেছি।’’

একক অভিভাবকের সঙ্গে বড় হওয়া যে সহজ ছিল না, তা স্বীকার করেন মহিমা। কিন্তু সেই কঠিন সময়ই তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ দিয়েছে।

‘‘একক অভিভাবকের সঙ্গে বড় হওয়া, নিজের জায়গা ধরে রাখা, শূন্য থেকে একটা জীবন তৈরি করা কঠিন ছিল। কিন্তু অসম্ভব নয়। আপনাকে শুধু চেষ্টা করে যেতে হবে,’’ বলেন তিনি।

এবার ‘মুসাফির ক্যাফে’

‘অন্তিম’-এর পর ধীরে ধীরে অন্য ধরনের চরিত্রের দিকে এগিয়েছেন মহিমা। সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায় ‘মুসাফির ক্যাফে’। বিক্রান্ত ম্যাসির বিপরীতে এই রোম্যান্টিক সিরিজের মাধ্যমে নেটফ্লিক্সে অভিষেক হয়েছে তাঁর।

মজার বিষয়, শুরুতে সিরিজটির গল্পই জানতেন না মহিমা। নির্বাচক পরিচালক যোগাযোগ করলেও প্রথমে শুধু জানানো হয়েছিল, এটি একটি বই অবলম্বনে তৈরি হচ্ছে।

পরে চিত্রনাট্য হাতে পেয়ে তাঁর ধারণা বদলে যায়।

‘‘লেখাটা এত সুন্দর ছিল যে পড়তে পড়তেই বুঝেছিলাম, এটা নিছক একটা প্রেমের গল্প নয়,’’ বলেন তিনি।

বিক্রান্তের সঙ্গে ‘কেমিস্ট্রি’

বিক্রান্ত ম্যাসির সঙ্গে মহিমার প্রথম দেখা হয় কেমিস্ট্রি টেস্টের সময়। পর্দায় তাঁদের সম্পর্ক কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, তা বোঝার জন্য নির্মাতারা দু’জনকে একসঙ্গে দৃশ্যে অভিনয় করিয়েছিলেন।

সেখানেই নাকি তাঁদের মধ্যে একটি পরিণত ও স্থির রসায়ন চোখে পড়ে।

মহিমার কথায়, ‘‘নির্মাতারা আমাদের মধ্যে একটা স্থিতিশীল রসায়ন এবং পরিণত আবেগ দেখতে পেয়েছিলেন।’’

বিক্রান্তের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে বেশ ভাল। অভিনেতাকে নিয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘‘তিনি খুবই ভাল মানুষ।’’

‘মুসাফির ক্যাফে’ তৈরি হয়েছে দিব্য প্রকাশ দুবের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে। পরিচালনা করেছেন রুচির অরুণ। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন বেদিকা পিন্টোও। ২৪ জুলাই মুক্তির পর সিরিজটি নেটফ্লিক্সে দেখা যাচ্ছে। দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার পর দ্বিতীয় মরসুম তৈরির সিদ্ধান্তও হয়েছে।

যাত্রা এখনও অনেক বাকি

ন’বছরের শিশুশিল্পী থেকে ১৩ বছর বয়সে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ, তার পর সলমন খানের ছবিতে আত্মপ্রকাশ এবং এখন ওটিটির গুরুত্বপূর্ণ মুখ—মহিমার পথচলায় মাধ্যম বদলেছে বারবার। বদলায়নি শুধু একটি জিনিস—নিজেকে আরও ভাল করে তোলার চেষ্টা।

টেলিভিশনকে তিনি নিজের শেখার জায়গা মনে করেন। সিনেমায় প্রথম সুযোগের সময় সলমনের কাছ থেকে পেয়েছেন পরিশ্রমের মন্ত্র। আর ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, চেষ্টা থামালে চলবে না।

তাই মহিমার গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো খুব সহজ—সাফল্যের কোনও শর্টকাট নেই। পথটা যত দীর্ঘই হোক, কাজ করে যেতে হয়।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles