Table of Contents
হাইলাইটস
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক (মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) নিয়ে আলোচনা চলছে।
- সম্ভাব্য চুক্তিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে।
- ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে।
- তবে ইউরেনিয়াম মজুত ও পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
- চুক্তি চূড়ান্ত হলে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির খসড়া সামনে আসার পর থেকেই সেই সমঝোতার প্রকৃত বিষয়বস্তু নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার দাবি করেন, সংবাদমাধ্যমে যে সব শর্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলি সঠিক নয়। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, ইরান থেকে সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া তথাকথিত শর্তগুলির সঙ্গে লিখিতভাবে সম্মত হওয়া প্রকৃত শর্তের “কোনও সম্পর্ক নেই”।
অন্যদিকে ইরানের সংবাদমাধ্যমেও চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা সামনে এসেছে। একটি কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম এমন কিছু শর্তের কথা বলেছে যা ইরানের জন্য বেশি সুবিধাজনক বলে মনে হয়। আবার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষায় চুক্তির সম্ভাব্য কাঠামো তুলে ধরেছে।
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার বলেন, একটি সমঝোতা “আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি কাছাকাছি”। তবে একইসঙ্গে তিনি সংবাদমাধ্যমকে চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে অনুমানভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করার আহ্বান জানান।
এখনও অনেক কিছুই অস্পষ্ট
চুক্তির অনেক দিক এখনও ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। উভয় পক্ষই এটিকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী।
তবে এটুকু জানা গেছে যে, দুই দেশের মধ্যে একটি “সমঝোতা স্মারক” নিয়ে আলোচনা চলছে।
চুক্তির শর্ত সম্পর্কে অবহিত ইরানের দুই কর্মকর্তা এবং এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। সেই সমঝোতার ফলে যুদ্ধ বন্ধ হবে, হরমুজ প্রণালী আবার জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে এই চুক্তি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার পথও প্রশস্ত করবে।
ওই তিন কর্মকর্তার মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে আলোচনায় যে ধরনের প্রস্তাব উঠেছিল, এই চুক্তির কাঠামো তার সঙ্গে মোটামুটি সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে ভাষা ও কিছু শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইসরায়েল কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে।
এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ নতুন করে শুরু হয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরান হয়তো তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনও ছাড় দেবে না।
চুক্তি সম্পর্কে অবহিত আঞ্চলিক কর্মকর্তাটি আশাবাদী যে সমঝোতা চূড়ান্ত হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, শেষ মুহূর্তে কোনও পক্ষ বাধা সৃষ্টি করলে পুরো প্রক্রিয়াটিই ভেঙে পড়তে পারে।
৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি
তিন কর্মকর্তার বর্ণনা অনুযায়ী, চুক্তির কাঠামো অনুসারে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে।
এই আলোচনা সর্বাধিক ৬০ দিন চলবে।
সেই সময়ে যুদ্ধ সব ফ্রন্টে বন্ধ থাকবে। শুধু ইরান বা উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, লেবাননেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
তবে ৬০ দিনের মধ্যে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হয়, তাহলে এরপর কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
হরমুজ প্রণালী খুলে যাবে
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হবে।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে ইরানের বন্দরগুলির বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে।
তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৬০ দিনের আলোচনার সময় ইরান এবং আঞ্চলিক দেশগুলি হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলাদা আলোচনা করবে।
গত মাসে জানা গিয়েছিল, ওমান ও ইরান যৌথভাবে প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে পরিষেবা ফি আদায়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এমন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল।
জেনেভায় হতে পারে স্বাক্ষর
চুক্তি চূড়ান্ত হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা জেনেভাতেই আলোচনা করেছিলেন।
আঞ্চলিক কর্মকর্তার মতে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের।
ট্রাম্পও বৃহস্পতিবার জানিয়েছিলেন, চুক্তি সম্পন্ন হলে তিনি ভ্যান্সকে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে পাঠাবেন।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন দেশটির প্রধান আলোচক এবং পার্লামেন্টের স্পিকার জেনারেল মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ।
পরমাণু অস্ত্র নয়, কিন্তু পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সমঝোতা স্মারকে ইরান আবারও ঘোষণা করবে যে তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না।
তবে চুক্তিটি ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না।
একইভাবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও কোনও নিষ্পত্তি করা হয়নি।
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্ন
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং লেনদেনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি তুলবে তেহরান।
বিনিময়ে ইরানকে তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছু ছাড় দিতে হতে পারে।
শান্তির পথে প্রথম ধাপ?
সম্ভাব্য চুক্তিটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে এটি কোনও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নয়। বরং একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার ভিত্তি।
পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইসরায়েলের উদ্বেগ—সব মিলিয়ে সামনে আরও কঠিন আলোচনা অপেক্ষা করছে।
তবু যুদ্ধ, অবরোধ এবং অনিশ্চয়তায় জর্জরিত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এই খসড়া চুক্তি আপাতত শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।