হাইলাইটস:
- ওমান উপকূল ও হরমুজ প্রণালীর কাছে চার দিনের মধ্যে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ।
- এক হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ নয়াদিল্লির।
- এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বার মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জেসন মিক্সকে তলব করল বিদেশ মন্ত্রক।
- ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে, বেসামরিক জাহাজে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
- ঘটনাকে ঘিরে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়ছে।
বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অভিঘাত এবার সরাসরি এসে পড়েছে ভারতীয় নাবিকদের জীবনে। ওমান উপকূল ও হরমুজ প্রণালীর কাছে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভারত সরকার এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক জেসন মিক্সকে বিদেশ মন্ত্রকে ডেকে পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অত্যন্ত কড়া। ভারতের মতে, বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে যখন সেই জাহাজগুলিতে ভারতীয় নাগরিক কর্মরত রয়েছেন, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা ঘটে পালাউ-পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘সেত্তেবেলো’-কে ঘিরে। মার্কিন বাহিনীর হামলায় ওই জাহাজে কর্মরত তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়। প্রথমে তাঁরা নিখোঁজ বলে জানানো হলেও পরে তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করা হয়। এই ঘটনার পরই প্রথমবার মার্কিন কূটনীতিককে তলব করে ভারত।
কিন্তু বিতর্ক সেখানেই থামেনি। এর পর আরও দুটি ভারতীয় নাবিক-সম্বলিত জাহাজ হামলার মুখে পড়ে। সর্বশেষ ঘটনায় ‘জলবীর’ নামের একটি ট্যাঙ্কারের ইঞ্জিন কক্ষে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় বলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড স্বীকার করেছে। যদিও ওই জাহাজের ২০ জন নাবিকই নিরাপদে উদ্ধার হয়েছেন, তবু ভারতের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আমেরিকার দাবি, এই জাহাজগুলি ইরান-সংক্রান্ত তেল পরিবহণ অবরোধ ভেঙে চলাচল করছিল এবং মার্কিন নির্দেশ মানেনি। সেই কারণেই হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, এটি বৃহত্তর ইরান নীতির অংশ, যার উদ্দেশ্য তেহরানের তেল রফতানির ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
কিন্তু ভারত এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। দিল্লির অবস্থান পরিষ্কার—যে কোনও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও আন্তর্জাতিক জলপথে বেসামরিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। ভারতের মতে, সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজকে এক করে দেখা বিপজ্জনক প্রবণতা।
এই ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাতও কম নয়। বিরোধী দলগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করতে হবে। নিহত নাবিকদের পরিবারগুলিও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নাবিক-সরবরাহকারী দেশ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কর্মরত। ফলে হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপকূলের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতা ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক এবং মানবিক সংকটও তৈরি করছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ মার্কিন-ইরান সংঘাত এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির দিকে অগ্রগতি হচ্ছে এবং তিনি নতুন হামলা স্থগিত করেছেন, তবুও বাস্তবে সমুদ্রপথে উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
দ্বিতীয়বার মার্কিন কূটনীতিককে তলব করার সিদ্ধান্ত তাই নিছক আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ নয়; এটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। ভারত বুঝিয়ে দিতে চায় যে তার নাগরিকদের জীবনহানির প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না। একই সঙ্গে দিল্লি চাইছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহণকে জিম্মি না করে।
এখন নজর থাকবে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার দিকে। কারণ চার দিনের মধ্যে তিনটি হামলা এবং তাতে ভারতীয় প্রাণহানির ঘটনা ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ওপর এমন এক ছায়া ফেলেছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে খুব কমই দেখা গিয়েছে।