Home খবর যুদ্ধের পরের ইরান: ঐক্যের আবরণ সরতেই কি ফিরে আসবে ক্ষোভ, মূল্যবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব?

যুদ্ধের পরের ইরান: ঐক্যের আবরণ সরতেই কি ফিরে আসবে ক্ষোভ, মূল্যবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব?

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 11 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • যুদ্ধ শেষ না হলেও ইরান ইতিমধ্যেই যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে।
  • অর্থনীতি ১০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা।
  • খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
  • ইন্টারনেট অবরোধের কারণে অন্তত ২০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি।
  • যুদ্ধকালে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য শান্তিকালে ভেঙে পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
  • বহু ইরানির আশা, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে নিষেধাজ্ঞার শিথিলতা এবং অর্থনৈতিক অবরোধের অবসান।

যুদ্ধ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। শান্তিচুক্তিও নিশ্চিত নয়। তবু ইরানের শাসকগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই আরেকটি কঠিন লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছে—যুদ্ধের পরের শান্তির লড়াই। কারণ তেহরানের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা নয়, যুদ্ধের পর সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখা যায়।

ইরানে এখন প্রকাশ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে যুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রের রূপরেখা নিয়ে। বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং অনলাইন আলোচনায় উঠে আসছে দেশের ভবিষ্যৎ পথচলার নানা ধারণা। কেউ চাইছেন আরও উন্মুক্ত সমাজ ও অর্থনীতি, আবার কেউ মনে করছেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে ইরানকে আরও স্বনির্ভর ও স্বাধীন পথেই এগোতে হবে।

ইরানের আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাঈদ আজোরলুর মতো ব্যক্তিরা যুক্তি দিচ্ছেন, পশ্চিমা বিশ্বের কাছে “দুর্বল ইরান”-এর ধারণা ভেঙে গেছে। এখন দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হওয়া উচিত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনির্ভরতা।

কিন্তু এই আদর্শগত বিতর্কের আড়ালে রয়েছে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, যুদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করতে বহু বছর লেগে যাবে। অবকাঠামো, স্কুল, বিদ্যুৎব্যবস্থা, ইস্পাত কারখানা ও আবাসন খাতে ক্ষতির পরিমাণ মিলিয়ে প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হচ্ছে।

অনেকেরই সন্দেহ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলও করেন, তবুও সেই সাহায্য এই বিপুল ক্ষতির তুলনায় খুবই সামান্য হবে।

ইরানের সমাজবিজ্ঞানী এবং কুর্দিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ হাবিবি মনে করেন, যুদ্ধের আগেও যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ ছিল, যুদ্ধ তা আরও তীব্র করেছে।

তাঁর ভাষায়, “অর্থনৈতিক সংকট এবং জীবনযাত্রা নিয়ে অসন্তোষ স্পষ্টভাবেই বেড়েছে। সমুদ্রপথে অবরোধ এবং যুদ্ধের ফলে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ইন্টারনেট অবরোধের কারণে অন্তত ২০ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ হারিয়েছেন।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ইরানে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন বা পেশাজীবী সংগঠনের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে অসন্তোষ কখন বিস্ফোরণে পরিণত হবে, তা আগাম বোঝা কঠিন।

হাবিবির মতে, বর্তমানে যে জাতীয় ঐক্যের ছবি দেখা যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই।

“বোমাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের মুখে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই একত্রিত হয়। কিন্তু জার্মান দার্শনিক হেগেলের ভাষায়, কোনও ফ্রন্ট যখন জেতে, তখনই তার ভিতরে বিভাজনের শুরু হয়।”

এই আশঙ্কার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

যুদ্ধ শেষ হলে ইরান এমন এক অর্থনীতির মুখোমুখি হবে, যেখানে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে খাদ্যপণ্যের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১৩০ শতাংশে।

মাংস ও মুরগির দামের বৃদ্ধি আরও ভয়াবহ—১৭৬ শতাংশ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এত বেশি মূল্যবৃদ্ধির কারণে বহু পরিবার দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে অপুষ্টি, অস্টিওপোরোসিস এবং শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানের প্রাক্তন যোগাযোগমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ আজারি জাহরোমি সম্প্রতি নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, “ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর পরবর্তী বোমা হয়তো বারুদের হবে না, হবে মূল্যস্ফীতির। আগামী যুদ্ধ হবে মানুষের খাবারের টেবিল, বাড়িভাড়া এবং জীবিকা নিয়ে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কি এই জমে থাকা ক্ষোভ সম্পর্কে সচেতন? দেশের অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা কি প্রস্তুত, নাকি আবারও আমরা অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ব?”

এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian-এর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মনে করা হচ্ছে, তাঁকেই মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন সচল রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বারবার জনগণকে কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন।

যুদ্ধের ক্ষতির ফলে বিদ্যুৎ অবকাঠামোও চাপে রয়েছে। যদিও জ্বালানি মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে, তবুও ব্যবসায়ী মহলে আশঙ্কা ছড়িয়েছে যে আগামী মাস থেকেই প্রতিদিন দুই ঘণ্টার পরিকল্পিত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা শুরু হতে পারে।

ইরান চেম্বার অব কমার্সের জ্বালানি কমিশনের প্রধান আরাশ নাজাফি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে জনগণকে দৈনিক বিদ্যুৎ বন্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

বিদ্যুৎ ব্যবহার ১০ শতাংশ কমাতে পারলে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়ার মতো প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, যুদ্ধের সময় আরোপিত কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে শিথিল করা হচ্ছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নিয়েও রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়েছে। রক্ষণশীল সাংসদরা যোগাযোগমন্ত্রীকে অভিশংসনের হুমকি দিচ্ছেন।

রাজনৈতিক কর্মী রহিম ঘোমেইশি এই সপ্তাহে লিখেছেন, “আমরা একটি ভাঙা নৌকা থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। রক্তপিপাসু তিমির ভয়, ভয়ংকর ঢেউয়ের ভয় আমাদের গ্রাস করেছিল। এখন নৌকায় ফিরে এসেছি বলে শুধু উদ্ধার পাওয়ার আনন্দে সন্তুষ্ট থাকা যায় না।

“দারিদ্র্য কখনও স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল না। প্রতিদিন সকালে মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ঘুম ভাঙার কথা ছিল না। মানুষের নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকার কথা ছিল। জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু পেট ভরানো হওয়ার কথা ছিল না।”

ইরানের রাজনৈতিক মহলে আপাতত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যুদ্ধের পর কি সত্যিই অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল হবে?

কারণ বহু ইরানির বিশ্বাস, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনও সামরিক বিজয় নয়; বরং সেই অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ভাঙা, যা বছরের পর বছর ধরে তাদের জীবনকে সংকুচিত করে রেখেছে।

কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। আর সেই অনিশ্চয়তাই যুদ্ধোত্তর ইরানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষার নাম।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles