Home খবর রাজনীতির রঙবদল সম্রাট ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

রাজনীতির রঙবদল সম্রাট ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

যেখানে আদর্শ অস্থায়ী, দল সাময়িক, কিন্তু আত্মরক্ষা চিরস্থায়ী

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 3 views 6 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বঙ্গ রাজনীতিতে দলবদলের ইতিহাস দীর্ঘ, কিন্তু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে এক নতুন শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। বামপন্থী ছাত্রনেতা থেকে সংসদ সদস্য, তারপর দলত্যাগ, তারপর নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় — পথচলা যথেষ্ট ঘটনাবহুল। আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক আবহাওয়ার প্রতি তাঁর সংবেদনশীলতা অনেক বেশি বলেই সমালোচকদের দাবি। তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে জনপ্রিয় রসিকতা — “ঋতব্রত দল বদলান না, কেবল নিজের চারপাশের দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নেন।” গিরগিটিরও হয়তো তাঁর কাছ থেকে কিছু শেখার আছে।

বাংলার রাজনীতিতে অনেক প্রাণীর উপমা ব্যবহৃত হয়েছে। কেউ বাঘ, কেউ শেয়াল, কেউ হাতি, কেউ ঘোড়া। কিন্তু একটি প্রাণী দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল, সেটি হল গিরগিটি। এই অবিচারের অবসান ঘটিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনৈতিক বিবর্তনের সর্বোচ্চ স্তর বাঘ হওয়া নয়, গিরগিটি হওয়া। কারণ বাঘের শক্তি আছে, কিন্তু নমনীয়তা নেই। গিরগিটির শক্তি তার রং বদলানোর ক্ষমতায়। আর রং বদলানো যদি অলিম্পিক ক্রীড়া হত, তবে ঋতব্রত সম্ভবত একাধিক স্বর্ণপদক জিততেন।

এক ছিল বিপ্লব

রাজনীতিতে ঋতব্রতের আবির্ভাব হয়েছিল আগুনঝরা বক্তৃতা, বিপ্লবী শব্দভাণ্ডার এবং মার্কস-লেনিনের উদ্ধৃতি নিয়ে। তখন তিনি ছিলেন নতুন প্রজন্মের বামপন্থী মুখ। মঞ্চে উঠলেই পুঁজিবাদ কাঁপত, সাম্রাজ্যবাদ ঘামত, এবং শ্রেণিসংগ্রাম নতুন করে আশার আলো দেখত। তাঁর বক্তৃতা শুনে মনে হত, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যেই হয়তো বিশ্ববিপ্লব শুরু হয়ে যাবে। সেই সময় তিনি ছিলেন রাজনৈতিক লাল রঙের উজ্জ্বল প্রতিনিধি।

কিন্তু সমস্যা হল, বাংলার রাজনীতির আবহাওয়া দ্রুত বদলাতে শুরু করল। আর ঋতব্রত বুঝলেন, একই রং নিয়ে বেশিদিন টিকে থাকা বিপজ্জনক।

আদর্শ বনাম আবহাওয়া

রাজনীতিতে সাধারণত দুই ধরনের মানুষ দেখা যায়। এক দল মানুষ আদর্শের সঙ্গে মানিয়ে নেন, অন্য দল আদর্শকে নিজের সঙ্গে মানিয়ে নেন। ঋতব্রত সম্ভবত তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধি — তিনি আদর্শকে আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেন। যেদিকে রাজনৈতিক বাতাস, সেদিকেই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। আজ যা নীতি, কাল তা কৌশল। আজ যা সংগ্রাম, কাল তা ভুল বোঝাবুঝি। আজ যা বিশ্বাস, কাল তা পরিণত রাজনৈতিক উপলব্ধি।

এ এক বিরল প্রতিভা। সাধারণ মানুষ যেখানে মত পরিবর্তন করতে কয়েক বছর সময় নেয়, সেখানে দক্ষ রাজনৈতিক গিরগিটি কয়েক মিনিটেই পরিবেশ অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

রাজনীতির ওয়েদার অ্যাপ

বাংলার রাজনীতিতে যদি কখনও আবহাওয়া দফতর খোলা হয়, সেখানে ঋতব্রতকে প্রধান বৈজ্ঞানিক করা উচিত। কারণ তিনি অন্যদের আগে বুঝতে পারেন কোন দিকে হাওয়া বইছে। রাজনৈতিক ভূমিকম্প হওয়ার আগে যেমন কিছু প্রাণী তা টের পায়, তেমনই ক্ষমতার কম্পন শুরু হওয়ার আগেই তিনি নতুন অবস্থান খুঁজে নিতে সক্ষম। এটি নিছক প্রতিভা নয়, এটি প্রায় অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা। যখন সাধারণ কর্মীরা এখনও দলের পতাকা আঁকড়ে ধরে থাকেন, তখন তিনি সম্ভবত নতুন পতাকার রঙের নমুনা সংগ্রহ করতে শুরু করেন।

স্মৃতিশক্তির আশ্চর্য ব্যবহার

ঋতব্রতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল নির্বাচিত স্মৃতিশক্তি। তিনি পুরনো বক্তব্য ভুলে যেতে পারেন অবিশ্বাস্য গতিতে। একসময় যে নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করেছেন, পরবর্তীকালে তাঁদের প্রশংসা করতেও কোনও অসুবিধা হয় না। আবার যাঁদের একসময় প্রশংসা করেছেন, প্রয়োজনে তাঁদের বিরুদ্ধেও সমান উৎসাহে সমালোচনা করতে পারেন।

এই ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নেই। কারণ সাধারণ মানুষকে বিব্রত করে অতীত। পেশাদার গিরগিটিকে বিব্রত করে না। তার কাছে অতীত কেবল একটি ড্রাফট সংস্করণ।

দল নয়, প্ল্যাটফর্ম

ঋতব্রতের রাজনৈতিক দর্শনের সারমর্ম সম্ভবত একটি বাক্যে ধরা যায় — “দল স্থায়ী নয়, ক্যারিয়ার স্থায়ী।” অনেক নেতা দলকে পরিবার ভাবেন, অনেক কর্মী দলকে আদর্শ ভাবেন। ঋতব্রত সম্ভবত দলকে প্ল্যাটফর্ম ভাবেন। একটি প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এলে ওঠা যায়, ট্রেন চলে গেলে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়া যায়। এতে স্টেশনের প্রতি ভালোবাসা কমে না, শুধু যাত্রাপথ বদলায়।

গিরগিটির প্রতি অবিচার

আসলে গিরগিটির সঙ্গে তুলনা করাও হয়তো গিরগিটির প্রতি অবিচার। কারণ গিরগিটি রং বদলায় আত্মরক্ষার জন্য, ঋতব্রত রং বদলান রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা রক্ষার জন্য। গিরগিটি অন্তত একই গাছে থাকে, রাজনৈতিক গিরগিটি কখনও কখনও গাছও বদলে ফেলে। তাই প্রাণীবিদ্যার বইয়ে হয়তো নতুন অধ্যায় যোগ করা দরকার — Chamaeleon Politicus Bengalensis। বাংলার এই বিশেষ প্রজাতি অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম এবং ক্ষমতার তাপমাত্রা অনুযায়ী রং পরিবর্তন করে।

বেঁচে থাকার মহাবিদ্যা

সমালোচকেরা তাঁকে সুযোগসন্ধানী বলেন, সমর্থকেরা বলেন বাস্তববাদী। কিন্তু নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের চোখে তিনি আসলে এক রাজনৈতিক জীববিজ্ঞানী। তিনি বুঝেছেন, রাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী সেই নয় যে সবচেয়ে বেশি গর্জন করে, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী সেই, যে সবচেয়ে বেশি টিকে থাকে। এই টিকে থাকার শিল্পে ঋতব্রত নিঃসন্দেহে একজন সিদ্ধহস্ত কারিগর।

বাংলার রাজনীতিতে বহু নেতা এসেছেন, বহু নেতা গিয়েছেন। কেউ স্মরণীয় হয়েছেন বক্তৃতার জন্য, কেউ আন্দোলনের জন্য, কেউ প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সম্ভবত স্মরণীয় হবেন অভিযোজন ক্ষমতার জন্য। তিনি যেন রাজনৈতিক ডারউইনবাদের জীবন্ত উদাহরণ। প্রকৃতির নিয়ম বলে, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী বাঁচে না, সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীও বাঁচে না, বেঁচে থাকে সেই প্রাণী, যে সবচেয়ে দ্রুত নিজেকে বদলাতে পারে। আর সেই তত্ত্ব যদি বঙ্গ রাজনীতিতে প্রয়োগ করা হয়, তবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে তার উজ্জ্বল গবেষণাপত্র।

রাজনীতির অভিধানে “দলবদল” একটি শব্দ। ঋতব্রতের অভিধানে সেটি একটি জীবনদর্শন। আর গিরগিটি? সে হয়তো দূর থেকে তাকিয়ে ভাবছে — “আমার এত বদনাম কেন? আমি তো মাত্র রং বদলাই, দল নয়!”

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles