Table of Contents
মার্কিন মামলার নিষ্পত্তি, হিন্ডেনবার্গ বিতর্ক থেকে মুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পরিকাঠামো বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে এখন যেন অনুকূল হাওয়ায় ভাসছে আদানি সাম্রাজ্য
হাইলাইটস
- মার্কিন সরকারের আনা তিনটি মামলার নিষ্পত্তি করে বড় আইনি ঝুঁকি থেকে মুক্ত হলেন গৌতম আদানি।
- ২০২৪ সালের ঘুষকাণ্ডের অভিযোগ ও মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত কার্যত শেষ।
- ২০২৩ সালের হিন্ডেনবার্গ বিতর্কের ধাক্কা কাটিয়ে আদানি গোষ্ঠীর বাজারমূল্য আবার দ্রুত বাড়ছে।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যকেন্দ্র ব্যবসায় বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা।
- মুকেশ আম্বানিকে পিছনে ফেলে ফের ভারতের শীর্ষ ধনীর আসনে আদানি।
- পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নতুন পরিকাঠামো প্রকল্পের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পালিয়ে বাঁচার এক বিস্ময়কর ইতিহাস
গৌতম আদানিকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ তাঁকে ভারতের সবচেয়ে সফল শিল্পপতিদের একজন বলেন, আবার কেউ তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপোষণ, অস্বচ্ছ ব্যবসা এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তোলেন।
তবে সমর্থক এবং সমালোচক, দুই পক্ষই সম্ভবত একটি বিষয়ে একমত হবেন যে গৌতম আদানি বারবার এমন সব পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছেন, যেগুলি অন্য কারও ব্যবসায়িক জীবন ধ্বংস করে দিতে পারত।
১৯৯৮ সালে তিনি কথিত এক অপহরণচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা পান। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের সন্ত্রাসী হামলার সময়ও প্রাণে বেঁচে যান। আর এখন তিনি আইনি ঝড়ের মধ্য থেকেও প্রায় অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছেন।
মার্কিন ঘুষকাণ্ড মামলা: কী ছিল অভিযোগ?
২০২৪ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কের ফেডারেল প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন যে আদানি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ভারতে একটি ২০০ কোটি ডলারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি পেতে ২৫ কোটি ডলারেরও বেশি ঘুষ দিয়েছিলেন।
একই সঙ্গে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) একটি পৃথক দেওয়ানি মামলাও দায়ের করে।
কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
১৮ মে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) তাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। কয়েক দিন আগে এসইসি মাত্র ১ কোটি ৮০ লক্ষ ডলারের বিনিময়ে মামলার নিষ্পত্তি করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সমঝোতার ক্ষেত্রে কোনো দোষ স্বীকারও করতে হয়নি।
এদিকে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস কেনার অভিযোগে মার্কিন অর্থ মন্ত্রকের আনা আরেকটি মামলারও নিষ্পত্তি হয়ে যায় ২৭ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার জরিমানার মাধ্যমে।
কেন ভেঙে পড়ল না মামলাগুলি?
এর পেছনে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
একটি ব্যাখ্যা হলো, মার্কিন কর্তৃপক্ষ আদালতে নিজেদের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে না বলে আশঙ্কা করেছিল।
অন্য ব্যাখ্যা আরও রাজনৈতিক।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, আদানির আইনজীবীরা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় আমেরিকায় ১,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছিলেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যবসাবান্ধব ও লেনদেনভিত্তিক নীতির সুবিধা আদানি পেয়ে থাকতে পারেন বলে অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা।
যে কারণই হোক, এই নিষ্পত্তিগুলি আদানির সামনে থাকা সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বাধাগুলির একটি সরিয়ে দিয়েছে।
হিন্ডেনবার্গের ঝড়ও থামল
এটি প্রথম নয়।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের রিপোর্ট আদানি সাম্রাজ্যকে প্রায় কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ করেছিল যে আদানি গোষ্ঠী হিসাব জালিয়াতি করছে এবং একাধিক শেল কোম্পানির মাধ্যমে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখছে।
ফলাফল ছিল ভয়াবহ।
মাত্র কয়েক সপ্তাহে আদানি গ্রুপের বাজারমূল্য প্রায় ১,৫০০ কোটি ডলার কমে যায়। একটি বড় শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনাও বাতিল করতে হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সংকটও কেটে যায়।
ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আদানির বিরুদ্ধে বড় কোনো অনিয়মের প্রমাণ খুঁজে পায়নি। অন্যদিকে ২০২৫ সালে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ নিজেই কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়।
এখন আদানির পালে অনুকূল হাওয়া
বর্তমানে আদানি গোষ্ঠীর বাজারমূল্য ২,০০০ কোটি ডলারেরও বেশি।
শুধু ২০২৬ সালের শুরু থেকেই মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
বিশেষভাবে লাভবান হতে পারে আদানি গ্রিন এনার্জি। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় ভারত এখন বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম সুবিধাভোগী হওয়ার অবস্থানে রয়েছে আদানি গোষ্ঠী।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজি
শুধু বিদ্যুৎ বা বন্দর নয়, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতিতেও বড় বাজি ধরেছেন গৌতম আদানি।
গুগলসহ একাধিক বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি করেছে তাঁর গোষ্ঠী।
আরও বড় খবর হলো, আগামী দশ বছরে নিজেদের তথ্যকেন্দ্র ব্যবসায় প্রায় ১,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে আদানি এন্টারপ্রাইজেস।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ যত বাড়বে, তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুতের চাহিদাও তত বাড়বে। সেই বাজার ধরতেই এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে আদানি গোষ্ঠী।
আম্বানির চেয়ে এগিয়ে
গৌতম আদানির উত্থান আরও চোখে পড়ছে কারণ একই সময়ে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মুকেশ আম্বানির ব্যবসা তুলনামূলকভাবে চাপের মুখে।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বাজারমূল্য ২০২৬ সালের শুরু থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে।
ইরান যুদ্ধ, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিশোধিত জ্বালানির ওপর রপ্তানি কর—সব মিলিয়ে রিলায়েন্সের মূল ব্যবসাগুলির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
ফলে এপ্রিল মাসে গৌতম আদানি আবার ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির আসনে ফিরে আসেন।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
অবশ্য সবকিছু চিরকাল অনুকূলে থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বর্তমান উন্মাদনা কমে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালী আবার স্বাভাবিকভাবে খুলে যেতে পারে। জ্বালানি বাজারও স্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
তবু বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে মনে হচ্ছে আদানি গোষ্ঠী এমন এক সময়ে নতুন গতি পেয়েছে, যখন তার বিরুদ্ধে থাকা প্রায় সব বড় বাধাই একে একে সরে যাচ্ছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন পরিকাঠামো প্রকল্প, সবুজ শক্তিতে বিনিয়োগ এবং তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই আদানি এখন নিজেকে শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে পাচ্ছেন।
আর তাই আপাতত একটি বিষয় বলা যায়—যে মানুষটিকে বহুবার কোণঠাসা মনে হয়েছিল, তিনি আবারও পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।
গৌতম আদানি হয়তো তাঁর সমালোচকদের সন্তুষ্ট করতে পারেননি। কিন্তু তিনি আরেকবার প্রমাণ করেছেন যে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা তাঁর অসাধারণ।