নোটিস-শুনানিতে বাধা কমিশনের পোর্টালে, সরব বাংলার ট্রাইব্যুনাল বিচারকেরা

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত আপিলের নিষ্পত্তিতে নির্বাচন কমিশনের পোর্টালই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এক ডজনের বেশি ট্রাইব্যুনাল বিচারক।
- অভিযোগ, পোর্টালে পক্ষগুলিকে নোটিস পাঠানো, অতিরিক্ত নথি গ্রহণ, ভার্চুয়াল শুনানি এবং আবেদনকারীর জন্য আদেশের কপি ডাউনলোডের যথাযথ ব্যবস্থা নেই।
- নিষ্পত্তির পরে প্রয়োজন হলেও মামলা পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ নেই।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত আপিলের নিষ্পত্তিতে নির্বাচন কমিশনের পোর্টালই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এক ডজনের বেশি ট্রাইব্যুনাল বিচারক। অভিযোগ, পোর্টালে পক্ষগুলিকে নোটিস পাঠানো, অতিরিক্ত নথি গ্রহণ, ভার্চুয়াল শুনানি এবং আবেদনকারীর জন্য আদেশের কপি ডাউনলোডের যথাযথ ব্যবস্থা নেই। নিষ্পত্তির পরে প্রয়োজন হলেও মামলা পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ নেই। কাগজে জমা আপিলের ডিজিটাল নথিভুক্তিও অনিশ্চিত। মে মাসেই একজন বিচারক নোটিসের ব্যবস্থা না থাকায় নিষ্পত্তি ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পত্রিকাটি ১ অক্টোবর কমিশন ও হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের বক্তব্য চাইলেও উত্তর পায়নি।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৮.৩১ লক্ষ আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল ১.২৬ লক্ষ। নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আবেদন ২২.২১ লক্ষ; অন্যদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপিল ১৬.১০ লক্ষ। ফলে সব আপিলকেই বাদ পড়া ভোটারের আবেদন বলা সঠিক নয়।
এই ব্যবস্থার পটভূমিও ব্যতিক্রমী। কমিশন এবং তৎকালীন রাজ্য সরকারের মধ্যে আস্থার সংকটের আবহে সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের যোগ্যতা যাচাইয়ের কাজে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের যুক্ত করেছিল। প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নথি পরীক্ষার পরে ২৭.১৬ লক্ষ নাম বাদ যায়। সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতিদের নিয়ে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ১০ মার্চ সর্বোচ্চ আদালত এই ব্যবস্থার নির্দেশ দেয়; ২০ মার্চ কমিশন ১৯টি এক সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বিজ্ঞাপিত করে। কাজ শুরু হয় ১৩ এপ্রিল।
আপিলের ধরন আলাদা করার প্রয়োজন আগেই আদালতে উঠেছিল। ২৫ আগস্ট বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি কমিশনকে জানতে চেয়েছিলেন, কোন আবেদন নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য এবং কোনটি অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতায়। তাঁর পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য ছিল, তালিকা থেকে বাদ পড়লে একজন মানুষের ভোট দেওয়ার সুযোগ সরাসরি প্রভাবিত হয়। তাই মামলার অগ্রাধিকার নির্ধারণে এই পার্থক্য বিবেচনা করা দরকার। কত আবেদন জমা পড়ল, সেই মোট সংখ্যার পাশাপাশি কেন আবেদন করা হয়েছে, সেটিও বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য জরুরি।
ট্রাইব্যুনালের কাজ নিয়ে প্রশ্ন অবশ্য নির্বাচনের আগেই উঠেছিল। এপ্রিল মাসে আবেদনকারীদের আইনজীবী দেবদত্ত কামাত সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ করেন, ট্রাইব্যুনালগুলি কার্যকরভাবে কাজ করছে না এবং আবেদনকারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও অসুবিধা হচ্ছে। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে আদালত কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির রিপোর্ট চাওয়ার কথা জানায়। তবে আইনজীবীর অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। রিপোর্ট চাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ট্রাইব্যুনালগুলির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া এবং উত্থাপিত সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখা।
সেই সময় আদালত স্পষ্ট করেছিল, শুধু আপিল বিচারাধীন থাকলেই বাদ পড়া ব্যক্তি ভোট দিতে পারবেন না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন মঞ্জুর হলে তাঁর নাম অতিরিক্ত ভোটার তালিকায় তুলে ভোটদানের সুযোগ দেওয়া হবে। এই শর্তের কারণে আপিলের গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্বাচনের আগে প্রতিকার পাওয়া এবং ভোট হয়ে যাওয়ার পরে প্রতিকার পাওয়ার বাস্তব ফল এক নয়। প্রথম দফার জন্য আপিল নিষ্পত্তির সীমা ছিল ২১ এপ্রিল, দ্বিতীয় দফার জন্য ২৭ এপ্রিল। ভোটগ্রহণের দিন ছিল যথাক্রমে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। ফলে নিষ্পত্তির সময়সীমার সঙ্গে ভোটদানের সুযোগ সরাসরি যুক্ত ছিল।
কমিশনের বৃহত্তর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ইসিআইনেট ব্যবস্থায় মাঠের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের কাজের সুযোগ এবং তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ ছিল সেই উদ্বেগের অন্যতম বিষয়।
পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কমিশন স্বাধীন প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞকে যুক্ত করে ইসিআইনেট পর্যালোচনার ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি এসআইআর শেষ হওয়া ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বাদ পড়ে যাওয়া যোগ্য ভোটারদের খুঁজে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির বিশেষ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছে। পুরনো ও সংশোধিত তালিকা মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনমতো বাড়িতে গিয়ে যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে। এই সংশোধনমূলক উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠের কর্মীরা প্রয়োজনীয় কাজ বাস্তবে করতে পারছেন কি না, তার ওপর।
পুনরায় নাম তোলার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি। তিনি বলেছেন, বহু বছর ভোট দেওয়া কারও নাম ভুল করে বাদ গেলে তাঁকে প্রথমবারের আবেদনকারী হিসেবে গণ্য করা অসংগত। পুরনো ভোটার নম্বর ও তালিকার তথ্য যাচাই করে নাম পুনর্বহালের আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি ‘ফর্ম ৬এক্স’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি তাঁর সুপারিশ, চালু হয়ে যাওয়া কোনও নতুন ফর্ম নয়। বর্তমানে ফর্ম ৬ নতুন ভোটারের আবেদনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
সব মিলিয়ে ঘটনাপ্রবাহের তাৎপর্য হল, ভোটার তালিকা সংশোধনের সাফল্য শুধু কত নাম পরীক্ষা বা বাদ দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে মাপা যায় না। ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের পথ কতটা সহজ এবং সময়সাপেক্ষ, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ আবেদনকারীর পক্ষে প্রতিটি দফতরের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। তিনি জানতে চাইবেন, তাঁর আবেদন কোথায় রয়েছে, পরবর্তী পদক্ষেপ কী এবং সিদ্ধান্তের কারণ কীভাবে জানা যাবে।
কার্যকর প্রতিকারের জন্য তাই কয়েকটি ফল প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন: আবেদন গ্রহণের স্বীকৃতি, শুনানির নির্ভরযোগ্য খবর, নথি জমার প্রমাণ, কারণসমেত সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তালিকা সংশোধন। প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব কার, তা স্পষ্ট থাকলে বিলম্বের কারণও চিহ্নিত করা সহজ হয়। অন্যথায় আবেদনকারী শুধু অপেক্ষা করেন, অথচ নিজের মামলার অগ্রগতি যাচাই করতে পারেন না।
বিচারকদের অভিযোগের পর এখন প্রয়োজন সংশোধনের নির্দিষ্ট হিসাব। কোন সমস্যা মিটেছে, কোনটি বাকি এবং অপেক্ষমাণ আবেদনকারীরা কবে কার্যকর প্রতিকার পাবেন—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই ব্যবস্থাটির ওপর আস্থা ফেরানোর ভিত্তি হতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



