মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার আর্জিতে সোমবার বিপক্ষের বক্তব্য না শুনে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে রাজি হল না সুপ্রিম কোর্ট। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এককভাবে নিয়েছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে আগে নির্বাচন কমিশন এবং অন্য বিবাদীদের বক্তব্য জানা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে আদালত।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ এই আবেদনে কেন্দ্রীয় সরকার, ভারতের নির্বাচন কমিশন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, দুই নির্বাচন কমিশনার ড. সুখবীর সিং সান্ধু ও ড. বিবেক জোশি, উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নাকে নোটিস দিয়েছে।

একটি প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত আপত্তি উপেক্ষা করে এসআইআর সংক্রান্ত ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের নামে এককভাবে নিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।

আবেদনকারী রাকেশ কুমার সিংয়ের হয়ে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং বলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সংক্রান্ত আইনের অধীনে নিয়োগপদ্ধতির বৈধতা নিয়ে মামলা বৃহত্তর বেঞ্চে বিচারাধীন থাকলেও এখন কিছু অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, “এখন প্রত্যেক নাগরিক নিজের ভোটাধিকার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।”

তিনি ওই আইনের ১৮ ধারার উল্লেখ করেন। এই ধারা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত যথাসম্ভব সর্বসম্মতিক্রমে নিতে হবে। সর্বসম্মতি না হলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী।

সিং ওই আইনের ১৬ ধারারও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য করা কাজের ক্ষেত্রে এই ধারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে আইনি দায়মুক্তি দেয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও এমন সুরক্ষা পান না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অবিলম্বে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সাসপেন্ড করার অন্তর্বর্তী নির্দেশ চেয়ে সিং বলেন, “আমরা এমন এক গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। আগে নির্বাচন কমিশনের প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা বজায় রেখেই নির্বাচন হত। কিন্তু আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সম্পূর্ণভাবে আইনি কাঠামোর বিপরীতে গিয়ে কাজ করছেন।”

বেঞ্চ জানায়, আদৌ কোনও আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, আগে তা নির্ধারণ করতে হবে। জবাবে সিং বলেন, “আদালতকে কিছু অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতেই হবে, নইলে দেশে আগুন জ্বলবে।”

বেঞ্চের বক্তব্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সাসপেন্ড করলে নির্বাচন কমিশনের কাজ থমকে যাবে। আদালত প্রশ্ন করে, “নির্বাচন পরিচালনা করবেন কে?” সিং প্রস্তাব দেন, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

বেঞ্চ আবারও জানায়, কোনও নির্দেশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাব জানতে হবে। তখন সিং বলেন, অন্তত এই নির্দেশ দেওয়া হোক যে নির্বাচন কমিশন কেবল সর্বসম্মতিক্রমে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, “একটি বাধ্যতামূলক আইন রয়েছে। আমরা আশা করি, তাঁরা সেটি মেনে চলবেন। কোনও লঙ্ঘন হলে আমরা তা বাতিল করব।”

সিং পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আপনারা কত কিছু বাতিল করতে পারবেন? আপনারা তো একটি নির্বাচন বা একটি নির্বাচিত সরকারকে বাতিল করতে পারবেন না।”

তাঁর অভিযোগ, এককভাবে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির কারণে ভোটার তালিকাটিই ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিচারপতি বাগচী তখন প্রশ্ন করেন, বিবাদীদের বক্তব্য না শুনে আদালত কি এমন নির্দেশ দিতে পারে?

তিনি বলেন, “নথিতে যদি দেখা যায়, কোনও সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল না বা এ ধরনের অন্য কোনও ত্রুটি ছিল, তা হলে আমরা সেই সিদ্ধান্তগুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেব এবং বলব, সেগুলি আইনপ্রদত্ত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্য পক্ষকে না শুনেই কি আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হয়েছিল? আমরা আশা করি, তাঁরা স্পষ্ট ও স্বচ্ছভাবে জবাব দেবেন।”

সিং দাবি করেন, নির্বাচন কমিশনের প্রেস বিজ্ঞপ্তিই কার্যত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, শুধু সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে আদালত নির্দেশ দিতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত বেঞ্চ আবেদনটির ভিত্তিতে নোটিস জারি করে। একই ধরনের প্রতিকার চেয়ে আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর দায়ের করা সংশ্লিষ্ট আবেদনেও নোটিস দিয়েছে আদালত। ওই মামলায় সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী।

প্রসঙ্গত, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশির আপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশনের নামে এককভাবে প্রায় ১৪টি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আবেদনগুলি করা হয়েছে। আবেদনগুলিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে এসআইআরের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ওই দুই নির্বাচন কমিশনার অন্তত ১৪টি আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন।

রাকেশ কুমার সিংয়ের আবেদনে অন্যান্য দাবির সঙ্গে এই ঘোষণাও চাওয়া হয়েছে যে নির্বাচন কমিশন একটি বহু-সদস্যবিশিষ্ট সংস্থা হওয়ায় তার সিদ্ধান্ত কোনও একজন সদস্য এককভাবে নিতে পারেন না। বিতর্কিত পদক্ষেপগুলি সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো মেনে করা হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য কমিশনের মূল নথিপত্র পরীক্ষা করার আবেদনও জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রতিকার হিসেবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার আর্জি রয়েছে।

অন্য আবেদনটি করেছেন আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী। এককভাবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা ১৪টি সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন অথবা বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের আবেদন করেছেন। প্রস্তাবিত তদন্তে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

এই তদন্তের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ইসিআইনেট ও ইআরওনেট ডেটাবেসের ফরেনসিক অডিট করার আবেদন জানানো হয়েছে। এসআইআর চলাকালে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে এই নামগুলি বাদ দেওয়া হয়েছিল, তা-ও তদন্ত করে দেখার আর্জি রয়েছে।

আবেদনকারী বিশেষভাবে দাবি করেছেন, সরকারি কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে জ্ঞানেশ কুমার, সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্না এবং দায়ী বলে চিহ্নিত অন্য আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত ও ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হোক। এ ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২ ধারা প্রয়োগের দাবি জানানো হয়েছে। ওই ধারায় ভোটার তালিকা প্রস্তুত, সংশোধন বা ত্রুটি সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট সরকারি কর্তব্য লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

আবেদনকারীর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অনুমোদন ছাড়া ফর্ম ৬ পরিবর্তন, ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা, ইসিআইনেট ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগ্য ভোটারদের নাম ফেরাতে ব্যর্থতা এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের নামে ১৬ লক্ষ ১০ হাজার আপিল দায়ের করা।