যাচাই’-এর নামে ওটিপি নিয়ে নাম কাটার আবেদন, ওড়িশায় বিপন্ন শত শত ভোটার

যা জানা জরুরি
- ভোটার যাচাইয়ের জন্য দেওয়া ওটিপি ব্যবহার করেই ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন!
- ওড়িশার ধামনগরে এমন অভিযোগে সাসপেন্ড হয়েছেন সহকারী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক সন্তোষকুমার নায়েক।
- সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলির নব্বই শতাংশের বেশি ছিল মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোটার যাচাইয়ের জন্য দেওয়া ওটিপি ব্যবহার করেই ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন! ওড়িশার ধামনগরে এমন অভিযোগে সাসপেন্ড হয়েছেন সহকারী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক সন্তোষকুমার নায়েক। সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলির নব্বই শতাংশের বেশি ছিল মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে।
বিএলও নিরুপমা ত্রিপাঠী অ্যাপ খুলে দেখেন, তাঁর পরিচয়ে ২২৭টি ফর্ম ৭ জমা পড়েছে। অথচ তিনি সেগুলি জমা দেননি। তাঁর অভিযোগ, যাচাইয়ের কথা বলে আধিকারিক ও তাঁর কর্মীরা ওটিপি নিয়েছিলেন। অন্য বিএলওদেরও একই অভিজ্ঞতা হয়। তাঁদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ভোটারদের প্রায় সকলের তথ্য আগেই যাচাই করা হয়েছিল; ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গেও মিলেছিল।
৪ সেপ্টেম্বর দশজন বিএলও পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অনুমতি ছাড়া আবেদন প্রক্রিয়াকরণের প্রমাণ মেলায় বিভাগীয় ব্যবস্থার অনুমোদন দেয় কমিশন। আবেদনগুলি প্রত্যাহার করা হয়েছে; সংশ্লিষ্ট ভোটারদের অধিকাংশের নাম ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘটনাটি নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ হিসেবে দেখা জরুরি; সকলের নাম শেষ পর্যন্ত বাদ গিয়েছে, এমন নয়।
ফর্ম ৭-এর গুরুত্ব এখানেই। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত এই ফর্ম দিয়ে তালিকাভুক্ত কারও নাম মুছে দেওয়ার আবেদন কিংবা নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো যায়। মৃত্যু, বয়সের অযোগ্যতা, অনুপস্থিতি বা স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া, একাধিক জায়গায় নাম থাকা এবং ভারতীয় নাগরিক না হওয়ার মতো কারণ উল্লেখের ব্যবস্থা রয়েছে। আবেদনকারীর পরিচয় এবং যাঁর বিরুদ্ধে আপত্তি, তাঁর তথ্যও দিতে হয়। ফর্মের ঘোষণায় স্পষ্ট বলা আছে, জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিলে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩১ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় শাস্তি হতে পারে। আবেদন গ্রহণের পরে একটি প্রাপ্তিস্বীকার নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে, যার সাহায্যে আবেদনকারী নিজের আবেদনের অবস্থা জানতে পারেন। অর্থাৎ এটি দায়িত্বসহকারে ব্যবহারের একটি আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্র।
ওড়িশায় ভোটার বাদ দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। এপ্রিলে জানা গিয়েছিল, এসআইআর শুরুর আগের তথ্য মেলানোর প্রক্রিয়াতেই প্রায় ৯.৮ লক্ষ নাম ভুলভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর স্বীকার করেছিল, বহু অভিযোগে দেখা যাচ্ছে ভোটার এলাকায় রয়েছেন, অথচ তাঁদের নাম বাদ পড়েছে। কোথাও বিএলও বাড়িতে যাননি, কোথাও যথাযথ যাচাই হয়নি।
সেই সময় প্রায় দু’লক্ষ ফর্ম ৭ আটকে রেখে নিবিড় যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের অন্তত অর্ধেক আপত্তির ক্ষেত্রে সরেজমিন যাচাইয়ের প্রত্যয়ন দিতে বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নোটিস দেওয়া, সন্দেহজনক দ্বৈত নামের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে পরীক্ষা এবং আপত্তিকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের নির্দেশও ছিল। ভুলভাবে বাদ পড়া নাম দ্রুত ফেরানোর কথাও জানিয়েছিল দপ্তর। অর্থাৎ সুরক্ষাবিধির প্রয়োজন প্রশাসনের কাছে আগেই স্পষ্ট হয়েছিল।
জুলাইয়ে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় প্রায় ২০.১৪ লক্ষ নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে আসে। তখন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক আর এস গোপালন জানিয়েছিলেন, নোটিস ও কারণসংবলিত আদেশ ছাড়া নাম বাদ দেওয়া যাবে না। খসড়ায় নাম না থাকলে ফর্ম ৬ জমা দিয়ে অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার কথাও জানানো হয়েছিল। এই ঘোষিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কাজের সামঞ্জস্যই এখন পরীক্ষার মুখে।
ধামনগরের ঘটনা তাই একটি বড় প্রশাসনিক প্রশ্ন সামনে আনে: ডিজিটাল ব্যবস্থায় কার পরিচয়ে কাজ হয়েছে, আর প্রকৃতপক্ষে কে কাজটি করেছেন—দুটির মিল নিশ্চিত করা হচ্ছে কীভাবে? তদন্তে আবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ, ব্যবহৃত যন্ত্র এবং অনুমোদনের ধাপ অনুসরণ করা প্রয়োজন। ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখার সঙ্গে বৈধ ভোটারের অধিকার রক্ষাও সমান জরুরি। শুধু সংশোধিত তালিকা প্রকাশেই সেই দায়িত্ব শেষ হয় না; অনিয়ম ঘটলে দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে একই পথে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা আটকানোর ব্যবস্থাও চাই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



