বাংলাস্ফিয়ার: এন চন্দ্রশেখরন টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে আর এক দফা থাকার দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোয় ভারতের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষমতার বিন্যাসে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। টাটা সন্সের পরবর্তী চেয়ারম্যান কে হবেন, সেই সিদ্ধান্তে এবার নোয়েল টাটার মতামতই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। টাটা ট্রাস্টগুলির চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর অবস্থান, ট্রাস্ট ও টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদে ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বিরোধী শিবিরের দুর্বল হয়ে পড়া—সব মিলিয়ে টাটা সাম্রাজ্যের অন্দরে নোয়েল এখন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

২০১২ সালে রতন টাটা অবসর নেওয়ার সময় তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে নোয়েলের নামই প্রথম সারিতে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পেয়েছিলেন সাইরাস মিস্ত্রি। ২০১৬ সালে নাটকীয় ভাবে মিস্ত্রিকে সরিয়ে দেওয়ার পরেও নোয়েলকে নিয়ে জল্পনা হয়েছিল। তখনও অবশ্য সরাসরি তাঁর হাতে গোষ্ঠীর নেতৃত্ব আসেনি। চেয়ারম্যান হয়েছিলেন টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের সফল কর্ণধার চন্দ্রশেখরন।

সৎভাই রতন টাটার মতো নোয়েল কখনও টাটা গোষ্ঠীর প্রকাশ্য মুখ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি। প্রচারবিমুখতা, সংযত আচরণ এবং নিঃশব্দে কাজ করাই তাঁর পরিচয়। কিন্তু আড়ালে থেকেই তিনি নিজের প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। টাটা গোষ্ঠীর খুচরো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্টের নেতৃত্বে ওয়েস্টসাইড এবং জুডিয়োকে জনপ্রিয় বিপণিবিতানের শৃঙ্খলে পরিণত করা তাঁর অন্যতম বড় সাফল্য। ভোল্টাস, টাটা ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন-সহ একাধিক সংস্থার পরিচালন পর্ষদেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

রতন টাটার মৃত্যুর পরে টাটা ট্রাস্টগুলির চেয়ারম্যান হওয়ার মধ্য দিয়ে নোয়েলের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ অংশীদারি এই ট্রাস্টগুলির হাতে। ফলে ট্রাস্টের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তি গোটা শিল্পগোষ্ঠীর নীতি, পরিচালনা এবং সর্বোচ্চ পদে নিয়োগে বিরাট প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। তবে এই ক্ষমতা নোয়েলের হাতে বিনা বাধায় আসেনি।

ট্রাস্টের ভিতরে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিলেন রতন টাটার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মেহলি মিস্ত্রি। প্রয়াত সাইরাস মিস্ত্রি এবং শাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠীর শাপুর মিস্ত্রির আত্মীয় মেহলিকেও একসময় রতন টাটার সম্ভাব্য উত্তরসূরি বলে মনে করা হয়েছিল। নোয়েল দায়িত্ব নেওয়ার পরে ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বদলাতে শুরু করে।

দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছয় টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদে ট্রাস্টের মনোনীত পরিচালক হিসেবে বিজয় সিংহকে পুনর্নিয়োগের প্রশ্নে। নোয়েল তাঁর পুনর্নিয়োগের পক্ষে থাকলেও মেহলি-সমর্থিত শিবির বিরোধিতা করে। অন্যদিকে, মেহলি নিজে টাটা সন্সের পর্ষদে জায়গা পেতে চেয়েছিলেন বলে খবর, যার বিরোধিতা করেন নোয়েল। শেষ পর্যন্ত গত ২৮ অক্টোবর মেহলির তিন বছরের ট্রাস্টি-পদের মেয়াদ শেষ হলে তাঁকে পুনর্নিয়োগ করা হয়নি। ৫ নভেম্বর তিনি সরে দাঁড়িয়ে জানান, বিষয়টি নিয়ে সংঘাত বাড়ালে টাটা ট্রাস্টের সুনামের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

মেহলির প্রস্থানে ট্রাস্টের ভিতরে নোয়েলের প্রধান বিরোধী শক্তির অবসান ঘটে। তার পর থেকেই তিনি নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের টাটা ট্রাস্ট এবং টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদে আনার মতো অবস্থায় পৌঁছে যান। স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্টের পর্ষদে নিজের ছেলে নেভিল টাটাকে আনার সিদ্ধান্তও সেই ক্ষমতা সুসংহত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ফলে ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থায় টাটা পরিবারের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি আরও বেড়েছে।

চন্দ্রশেখরনের সঙ্গে নোয়েলের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে ২৪ ফেব্রুয়ারির টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদের বৈঠকে। চন্দ্রশেখরনকে আরও পাঁচ বছরের জন্য তৃতীয় দফায় চেয়ারম্যান রাখার বিষয়ে ট্রাস্টিদের মধ্যে প্রাথমিক সম্মতি থাকলেও নোয়েল গোষ্ঠীর একাধিক নথিভুক্ত নয় এমন সংস্থার লোকসান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধিতে সম্মতি দেওয়ার আগে বেশ কিছু শর্তও সামনে রাখেন।

পর্ষদের চার পরিচালক তখনই ভোটাভুটির মাধ্যমে চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ বাড়াতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরন নিজেই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, টাটা সন্সে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রতন টাটার আমলের ঐতিহ্য মেনে সর্বসম্মতিতেই হওয়া উচিত। কার্যত নোয়েলের অনুমোদন ছাড়া আর এক দফা দায়িত্ব নিতে তিনি রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের দৌড় থেকে তাঁর সরে দাঁড়ানো নোয়েলের কর্তৃত্বকেই আরও স্পষ্ট করে দিল।

১৮৬৮ সালে জামশেদজি টাটার প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠীর অধীনে বর্তমানে ৩১টি সংস্থা রয়েছে। ছয়টি মহাদেশের শতাধিক দেশে ছড়িয়ে থাকা সংস্থাগুলির সম্মিলিত আয় ১৮ হাজার কোটি ডলারের বেশি এবং কর্মীসংখ্যা দশ লক্ষেরও বেশি। টাটা সন্সে শাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠীর অংশীদারি ১৮.৩ শতাংশ হলেও নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি রয়েছে টাটা ট্রাস্টগুলির কাছেই।

ফলে পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি শুধু একটি পদে নিয়োগ নয়; তা টাটা গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ অভিমুখও নির্ধারণ করবে। নোয়েল নিজে চেয়ারম্যান হবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু কে চেয়ারম্যান হবেন—সেই সিদ্ধান্তে তাঁর সম্মতিই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, চন্দ্রশেখরনের সরে যাওয়ার পরে তা নিয়ে সংশয় প্রায় নেই। নিঃশব্দে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নোয়েল টাটা এখন টাটা সাম্রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতাকেন্দ্রে।