‘সত্য’ই কি অপরাধ?

যা জানা জরুরি
- ‘সতলুজ’ বিতর্কে তোলপাড় ভারত হাইলাইটস মানবাধিকারকর্মী জস্বন্ত সিং খালরার জীবন অবলম্বনে নির্মিত ‘সতলুজ’ মুক্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নিষিদ্ধ।
- পরিচালক হানি ত্রেহানের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপে ছবি আটকে দেওয়া হয়েছে; ভারতে সৃজনশীল স্বাধীনতা আজ বড় সংকটে।
- সেন্সর বোর্ড ছবিতে ১২৭টি কাটছাঁটের নির্দেশ দেয়— বাদ দিতে বলা হয় পাঞ্জাব পুলিশ, গুম-হত্যা, এমনকি জস্বন্ত সিং খালরার নামও।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
‘সতলুজ’ বিতর্কে তোলপাড় ভারত
হাইলাইটস
- মানবাধিকারকর্মী জস্বন্ত সিং খালরার জীবন অবলম্বনে নির্মিত ‘সতলুজ’ মুক্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নিষিদ্ধ।
- পরিচালক হানি ত্রেহানের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপে ছবি আটকে দেওয়া হয়েছে; ভারতে সৃজনশীল স্বাধীনতা আজ বড় সংকটে।
- সেন্সর বোর্ড ছবিতে ১২৭টি কাটছাঁটের নির্দেশ দেয়— বাদ দিতে বলা হয় পাঞ্জাব পুলিশ, গুম-হত্যা, এমনকি জস্বন্ত সিং খালরার নামও।
- সরকারের দাবি, ছবিটি একপাক্ষিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
একটি ছবি। একটি ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসকে ঘিরেই নতুন করে জ্বলে উঠেছে সেন্সরশিপের বিতর্ক।
পরিচালক হানি ত্রেহান বহুদিন ধরেই চেয়েছিলেন পাঞ্জাবের নব্বইয়ের দশকের অন্ধকার অধ্যায়কে বড় পর্দায় তুলে ধরতে। সেই সময় বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের নামে হাজার হাজার মানুষের গুম, হত্যাকাণ্ড এবং বেআইনি দাহের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। সেই ভয়াবহ অধ্যায়ের অন্যতম সাহসী কণ্ঠ ছিলেন মানবাধিকারকর্মী জস্বন্ত সিং খালরা, যিনি এই ঘটনাগুলি প্রকাশ্যে এনে শেষ পর্যন্ত নিজেই নিখোঁজ হয়ে যান।
এই বাস্তব ঘটনাকেই কেন্দ্র করে ত্রেহান নির্মাণ করেন ‘সতলুজ’। প্রথমে ছবির নাম ছিল ‘ঘাল্লুঘারা’, পরে তা বদলানো হয়। কিন্তু নাম বদলালেও ছবির ভাগ্য বদলায়নি।
মুক্তি মিলল, কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টার জন্য
পরিচালকের অভিযোগ, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ছবিটিকে আটকে রাখে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC)। শেষ পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহের বদলে একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সেন্সর ছাড়াই ছবিটি মুক্তি পায়। কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে তা সরিয়ে নেওয়া হয়।
সরকারের বক্তব্য, ছবিটি আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ছবিতে জস্বন্ত সিং খালরার চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা-গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ।
‘সৃজনশীল স্বাধীনতা আজ কাগজে-কলমে’
এই অভিজ্ঞতাকে “ডিস্টোপিয়ান” বলে বর্ণনা করেছেন হানি ত্রেহান।
তাঁর অভিযোগ, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে চলচ্চিত্র নির্মাতারা স্বাধীনভাবে গল্প বলার সুযোগ হারাচ্ছেন।
“আজ ভারতে সৃজনশীল স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। এক ধরনের গল্প বলার অনুমতি আছে, অন্য গল্প বললেই বাধা আসে। তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা সত্যিই গণতন্ত্রে বাস করছি তো?” — হানি ত্রেহান
ত্রেহানের আরও অভিযোগ, ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরলেই নির্মাতাদের সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
কেন আপত্তি সরকারের?
আশির ও নব্বইয়ের দশকে পাঞ্জাবে খালিস্তান আন্দোলন এবং তা দমনে রাষ্ট্রের ভূমিকা এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের একটি কমিটির দাবি, ‘সতলুজ’ বিচ্ছিন্নতাবাদী হিংসার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেনি। ফলে ছবিটি একপাক্ষিক বয়ান তৈরি করে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করতে পারে।
১২৭টি কাট! বাদ দিতে বলা হয়েছিল ইতিহাসও
সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন পরিচালক নিজেই।
তাঁর দাবি, সেন্সর বোর্ড ছবিতে ১২৭টি কাটছাঁট করতে বলেছিল। তালিকায় ছিল—
- পাঞ্জাব পুলিশের উল্লেখ,
- গুম-হত্যার প্রসঙ্গ,
- বেআইনি দাহস্থল,
- সরকারের নাম,
- তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখ,
- জাতীয় পতাকার দৃশ্য,
- পুলিশের নেতিবাচক চিত্রণ,
- এমনকি জস্বন্ত সিং খালরার নাম এবং তাঁর অপহরণের দৃশ্যও।
ত্রেহানের কথায়, এগুলির অধিকাংশই আদালতের নথিভুক্ত এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর নির্দেশ ছিল ত্রিলোকপুরী এলাকার নাম বদলে কাল্পনিক ‘খানপুরী’ করতে হবে। ১৯৮৪-র শিখবিরোধী দাঙ্গার অন্যতম কেন্দ্র ছিল ত্রিলোকপুরী। কেন এই পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন পরিচালক।
১,৮০০ পাতার প্রমাণও যথেষ্ট হয়নি
সেন্সর বোর্ড ছবির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
এর জবাবে আদালতের নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ, গবেষণা-সহ প্রায় ১,৮০০ পাতার তথ্য জমা দেন ত্রেহান।
পরিচালকের দাবি, পরে বোর্ডের এক সদস্য তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বলেন—
“ঘটনাগুলো সত্যি জেনে অবাক হয়েছি। কিন্তু আজকের দিনে এত জোরে সত্য কথা কে বলে?”
নিষিদ্ধ, তবু থামেনি ‘সতলুজ’
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছবির যাত্রা থামাতে পারেনি— অন্তত পরিচালকের দাবি তাই।
তাঁর কথায়, পাঞ্জাবের বিভিন্ন গ্রাম, গুরুদ্বার, স্কুল, কমিউনিটি হল এবং খোলা মাঠে এখন গোপনে ‘সতলুজ’ প্রদর্শিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও হাজার হাজার মানুষ সেই প্রদর্শনীতে যোগ দিচ্ছেন।
“এখন এই ছবি দেখা নিজেই যেন এক ধরনের প্রতিবাদ।” — হানি ত্রেহান
বিতর্কে আরও জোর
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেন্সর বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে একাধিক নির্মাতা প্রশ্ন তুলেছেন।
সমালোচকদের দাবি, সরকার, পুলিশি নির্যাতন, জাতপাত, সংখ্যালঘু বা ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ছবি তৈরি হলেই কাটছাঁট বা আটকে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত ‘সন্তোষ’, যা পুলিশের নেতিবাচক চিত্রণের অভিযোগে ভারতে মুক্তির অনুমতি পায়নি।
অন্যদিকে ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ এবং ‘দ্য কেরালা স্টোরি’-র মতো বিতর্কিত ছবিগুলি সহজেই ছাড়পত্র পাওয়ায় সেন্সর বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চলচ্চিত্র সাংবাদিক আন্না এম এম ভেট্টিকাড মনে করেন, ‘সতলুজ’ বিতর্ক বর্তমান ভারতের সেন্সরশিপ সংস্কৃতির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। তাঁর মতে, বাস্তব সামাজিক নিপীড়ন তুলে ধরলেই নির্মাতারা চাপ, ভীতি এবং আত্ম-সেন্সরের মুখে পড়ছেন।
‘আমার বাবার ইতিহাস এই ছবিতেই বেঁচে আছে’
জস্বন্ত সিং খালরার নিখোঁজ হওয়ার বার্ষিকীতে শত শত মানুষ সতলুজ নদীর তীরে জড়ো হয়ে ছবি নিষিদ্ধের প্রতিবাদ জানান। তাঁদের বিশ্বাস, খালরা-সহ বহু নিখোঁজ মানুষের দেহ ওই নদীতেই ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশি নির্যাতনে নিহত এক ব্যক্তির ছেলে রঞ্জিত সিং বলেন—
“এই ছবিটাই আমার বাবার স্মৃতির একমাত্র জীবন্ত দলিল। তাঁর শরীরে নির্যাতনের যে চিহ্ন ছিল, সেই ইতিহাস এখানে রয়েছে। ছবিটি দেখে আমি কয়েক দিন ধরে কেঁদেছি।”
একটি সিনেমাকে ঘিরে বিতর্ক হয়তো নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্নটা এখনও একই— ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্য দেখানো কি অপরাধ, নাকি সেই সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টাই আরও বড় বিতর্ক?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



