দীপকের অভিযানের সুফল, গ্রামের সরকারি স্কুলে এল প্রথম কম্পিউটার

যা জানা জরুরি
- স্বাধীনতার আট দশক পরেও দেশের বহু গ্রামের সরকারি বিদ্যালয়ে জানালার কাচ, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, পানীয় জল কিংবা ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারের মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো নেই।
- মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার সন্তুক পিম্পরি গ্রামের জেলা পরিষদ পরিচালিত বিদ্যালয়টিও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
- তবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযান শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
স্বাধীনতার আট দশক পরেও দেশের বহু গ্রামের সরকারি বিদ্যালয়ে জানালার কাচ, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, পানীয় জল কিংবা ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারের মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো নেই। মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার সন্তুক পিম্পরি গ্রামের জেলা পরিষদ পরিচালিত বিদ্যালয়টিও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযান শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে। বিদ্যালয়ের মেরামতির কাজ শুরু হওয়ার পাশাপাশি পড়ুয়াদের জন্য এসেছে নতুন বেঞ্চ। এবার স্কুলটি পেয়েছে তার ইতিহাসের প্রথম কম্পিউটার।
নিজের জন্মভূমি সন্তুক পিম্পরি থেকেই স্বাধীনতা দিবসে ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানের সূচনা করেছিলেন দীপকে। তাঁর বক্তব্য, স্বাধীনতার ৮০ বছর পরেও গ্রামের সরকারি বিদ্যালয়গুলি ধারাবাহিকভাবে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। নতুন সংসদ ভবন বা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প তৈরি করা সম্ভব হলে গ্রামের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বিদ্যালয় তৈরি করা যাবে না কেন—এই প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি।
অভিযানের সূচনায় সন্তুক পিম্পরির জেলা পরিষদ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন দীপকে। সেখানে ভাঙা জানালা, বসার উপযুক্ত বেঞ্চের অভাব, বন্ধ হয়ে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা, অপরিষ্কার ও জলহীন শৌচাগার-সহ একাধিক সমস্যা তাঁর নজরে পড়ে। বিদ্যালয়ের দুরবস্থার ছবি এবং ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও পঞ্চায়েতের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
দীপকে লিখেছিলেন, স্বাধীনতার আট দশক পরেও সরকারি বিদ্যালয়ে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা না থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। একই সঙ্গে তিনি জানান, গ্রামের সরপঞ্চের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং পঞ্চায়েত এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যাগুলি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। তাঁর কথায়, মানুষ একজোট হয়ে সক্রিয় হলে পরিবর্তন সম্ভব।
তার পরেই বিদ্যালয়ের মেরামতির কাজ শুরু হয়। সন্তুক পিম্পরির সরপঞ্চ বিজয় পুরী জানান, দীপকে বিদ্যালয়ে এসে পরিকাঠামোগত ঘাটতিগুলি চিহ্নিত করেছিলেন। ভাঙা জানালা বদলানো, নতুন জানালার কাঠামো বসানো এবং অকেজো সিসিটিভি ক্যামেরা ফের চালু করার কাজ শুরু হয়েছে। শৌচাগারে যাতে চব্বিশ ঘণ্টা জলের ব্যবস্থা থাকে, সেই উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যেই বিদ্যালয়ে পৌঁছেছে নতুন বেঞ্চ। মঙ্গলবার ফের স্কুলে গিয়ে পড়ুয়াদের বেঞ্চে বসতে দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন দীপকে। সমাজমাধ্যমে সেই মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করে তিনি লেখেন, তাঁর গ্রামের শিশুরা স্কুলে বেঞ্চ পেয়েছে—এটি তাঁর জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। এই পরিবর্তন সম্ভব করে তোলার জন্য বিদ্যালয়ের কর্মী এবং গ্রামবাসীদের ধন্যবাদও জানান তিনি।
কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজনটি হল বিদ্যালয়ের প্রথম কম্পিউটার। কম্পিউটারটি স্কুলে পৌঁছনোর ভিডিয়ো প্রকাশ করে দীপকে বলেন, সরকার ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষকেই এগিয়ে আসতে হয়। ভিডিয়োয় তাঁকে পড়ুয়াদের সঙ্গে কম্পিউটার নিয়ে কথা বলতে এবং পড়াশোনার কাজে নতুন প্রযুক্তিটি যথাযথভাবে ব্যবহারের পরামর্শ দিতে দেখা যায়।
শহরের বেসরকারি বিদ্যালয়ে যেখানে স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, কম্পিউটার গবেষণাগার ও ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবস্থা সাধারণ ঘটনা, সেখানে একটি গ্রামের সরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম কম্পিউটার আসাও বড় খবর হয়ে উঠেছে। ঘটনাটি গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্যের ছবিও স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে ছোট ও নির্দিষ্ট নাগরিক উদ্যোগ যে প্রশাসনকে নড়াচড়া করতে বাধ্য করতে পারে, সন্তুক পিম্পরির ঘটনাটি তারও উদাহরণ।
হিঙ্গোলির অন্য একটি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও দীপকের হস্তক্ষেপে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। লিম্বালা গ্রামের সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মদ্যপ অবস্থায় বিদ্যালয়ে আসা এবং শ্রেণিকক্ষে ঘুমিয়ে থাকার অভিযোগ করেছিলেন গ্রামবাসীরা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও ফল পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের দাবি।
দীপকে ওই প্রধান শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে ঘুমিয়ে থাকার একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মদ্যপ প্রধান শিক্ষকের হাতে একটি বিদ্যালয়ের দায়িত্ব থাকা শিশুদের—বিশেষ করে অল্পবয়সি ছাত্রীদের—নিরাপত্তার পক্ষে গুরুতর বিপদ। মঙ্গলবারের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তিনি গ্রামবাসীদের সঙ্গে আন্দোলনে বসবেন বলেও সতর্ক করেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া হয়। একে লিম্বালা গ্রামের মানুষের প্রথম বড় জয় বলে অভিহিত করেছেন দীপকে। তবে সেখানকার আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। বিদ্যালয়ে আরও দু’জন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত গ্রামবাসীরা প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
সিজেপি-র ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযান এখন শুধু মহারাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নেই। দলের স্বেচ্ছাসেবকেরা অসম, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে পরিকাঠামো ও পরিষেবার অবস্থা যাচাই করছেন। অভিযানের মূল লক্ষ্য, সমস্যার নথি তৈরি করে প্রশাসনের সামনে তুলে ধরা এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি করা।
সন্তুক পিম্পরির একটি কম্পিউটার হয়তো গোটা দেশের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি বদলে দেবে না। কিন্তু সেই কম্পিউটারটি রাষ্ট্রের দীর্ঘ অবহেলার বিরুদ্ধে একটি প্রতীক। সেটি দেখিয়ে দিচ্ছে—একটি বিদ্যালয়ের ভাঙা জানালা, জলহীন শৌচাগার বা বেঞ্চের অভাবকে অনিবার্য নিয়তি হিসেবে মেনে না নিলে, পরিবর্তনের সূচনা অন্তত করা যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



