ভারতের প্রস্তাবই ‘সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ’, যুদ্ধবিরতিতে সায় কিয়েভের

যা জানা জরুরি
- রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ভারতের প্রস্তাবকে চারটি উদ্যোগের মধ্যে ‘সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ’ বলে বর্ণনা করলেন ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা।
- জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর এবং কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তাকে একই যুদ্ধবিরতির আওতায় আনতে চায় কিয়েভ।
- ভারতের প্রস্তাবে ভরসা রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে ভারত, তুরস্ক, মিশর ও আমেরিকার কাছ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব পেয়েছে ইউক্রেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ভারতের প্রস্তাবকে চারটি উদ্যোগের মধ্যে ‘সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ’ বলে বর্ণনা করলেন ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা। জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর এবং কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তাকে একই যুদ্ধবিরতির আওতায় আনতে চায় কিয়েভ।
ভারতের প্রস্তাবে ভরসা
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে ভারত, তুরস্ক, মিশর ও আমেরিকার কাছ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব পেয়েছে ইউক্রেন। তার মধ্যে ভারতের প্রস্তাবের পরিসরই সবচেয়ে বিস্তৃত বলে মনে করছে কিয়েভ। শুক্রবার রাজধানী কিয়েভে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমনটাই জানিয়েছেন ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা। তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছে ‘ইউরোপিয়ান প্রাভদা’।
সিবিহার মতে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ এবং কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতি—দুই বিষয়কে একই কাঠামোয় এনেছে ভারতের উদ্যোগ। শুধু তা-ই নয়, বন্দর পরিকাঠামোকেও এর আওতায় রাখতে চায় ইউক্রেন।
তাঁর বক্তব্য, জ্বালানি ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি হলে তা আংশিক নয়, সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ কোনও নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থাপনা নয়, সব ধরনের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি বন্দরগুলির নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
চার প্রস্তাব, চার লক্ষ্য
তুরস্ক ও মিশরের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতি এবং ইউক্রেনের শস্য রফতানির পথ নিরাপদ রাখা। অন্য দিকে, আমেরিকার প্রস্তাবে জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সিবিহা জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকেও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
এই পৃথক উদ্যোগগুলির তুলনায় ভারতের প্রস্তাবেই একাধিক ক্ষেত্রকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করছে কিয়েভ।
চাইছেন নিঃশর্ত বিরতি
তবে কিয়েভের ভাবনা শুধু পরিকাঠামো রক্ষার মধ্যে আটকে নেই। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রেও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বিবেচনা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন সিবিহা।
তাঁর মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং জেলেনস্কির সম্ভাব্য বৈঠক থেকে এমন কোনও সিদ্ধান্ত আসতে পারে। অর্থাৎ, জ্বালানি ও বন্দরকে হামলার বাইরে রাখার সীমিত ব্যবস্থা যেমন আলোচনায় থাকছে, তেমনই সম্মুখসমরে বৃহত্তর যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও খোলা রাখতে চাইছে কিয়েভ।
তবে এখনও কোনও চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা করেননি ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী।
পুতিনের মুখেও মোদী
সিবিহার মন্তব্যের ঠিক আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও যুদ্ধের নিষ্পত্তিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
বৃহস্পতিবার ভালদাই আলোচনা চক্রের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পুতিন জানান, তাঁর সঙ্গে প্রতিটি বৈঠকেই মোদী ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রসঙ্গ তোলেন। দুই পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য সমাধানের লক্ষ্যে মোদীর কয়েকটি ‘ভাল ভাবনা’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফলে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকা ফের সামনে এসেছে।
দিল্লির দৌত্য
কিয়েভের সঙ্গেও সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছে নয়াদিল্লি। ৩ সেপ্টেম্বর ইউক্রেন সফরে গিয়ে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জেলেনস্কি ও সিবিহার সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টা এবং কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা গুরুত্ব পায়।
এর পর ২৩ সেপ্টেম্বর জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, ভারত, মিশর ও তুরস্কের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সামুদ্রিক যুদ্ধবিরতির জন্য ইউক্রেন প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য ছিল, এ বার প্রতিক্রিয়া জানানোর দায়িত্ব রাশিয়ার।
কেন কৃষ্ণসাগর এত গুরুত্বপূর্ণ?
কৃষ্ণসাগর ঘিরে যুদ্ধবিরতির গুরুত্ব শুধু সামরিক নয়, বাণিজ্যিকও। এই পথ দিয়েই ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রফতানি হয়। যুদ্ধের মধ্যে বন্দর ও জাহাজে হামলা সেই বাণিজ্যপথকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
একই ভাবে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলাও যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। কিয়েভের বর্তমান অবস্থান থেকে তাই বোঝা যাচ্ছে, একটি ক্ষেত্রে হামলা বন্ধ রেখে অন্য ক্ষেত্রে তা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখতে চাইছে না তারা।
যুদ্ধ পঞ্চম বছরে
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে। হাজার হাজার অসামরিক মানুষের মৃত্যু, লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং বিপুল পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ সামনে এলেও যুদ্ধবিরতি এবং শান্তিচুক্তির মধ্যে এখনও বিস্তর ফারাক।
এ বার নজর মস্কোয়
ভারতের প্রস্তাবকে প্রশংসা করেছে কিয়েভ—কিন্তু প্রশংসা আর বাস্তবায়ন এক নয়। রাশিয়া সাময়িক নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বরং পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির উপর জোর দিয়েছে।
ফলে ভারতীয় উদ্যোগ কতটা এগোবে, তার বড় অংশই নির্ভর করছে মস্কোর অবস্থানের উপর। আপাতত কিয়েভ আলোচনার দরজা খোলা রাখছে। তবে তাদের শর্তও স্পষ্ট—জ্বালানি, বন্দর এবং কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা আলাদা আলাদা নয়, একই যুদ্ধবিরতির কাঠামোয় নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



